Monday, January 25, 2021

এমন শীত যেন ক্যাম্পাসে আর না আসে

গতবার শীতের শেষবেলায় বন্ধ হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর বছর ঘুরে আবারও শীত এসেছে। কিন্তু ক্যাম্পাস খুলেনি। আর তাই ঘরে বসেই শীতের সময়ের ক্যাম্পাসের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

এমসিজে নিউজের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে শীতের সময়ের ক্যাম্পাসের স্মৃতিচারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়টির নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আসমা আক্তার মুক্তা বলেন, ক্যাম্পাসে দুইটা শীতের সিজন পার করেছি,আমার কাছে মনে হয়েছে ক্যাম্পাসে শীতের ঋতুর কাছে বাকি ঋতু হার মানে। কুয়াশা ঘেরা ভিসি টং, মামা হোটেল, কাঁঠালতলা, মুক্তমঞ্চ, শহীদ মিনারের পুরো রাস্তা জুড়েই কুয়াশা যেন বাসা বাঁধতো।

এর মধ্যেই সকালবেলা হুটহাট বন্ধুরা মিলে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। কখনো ব্যাডমিন্টন, কিংবা ওয়ার্ম আপের জন্য সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠা এভাবে শীতের প্রত্যেকটা সকাল কাটতো।

তবে সন্ধ্যাটা আরও বেশি মজার ছিল, শীত হলে কি হবে সবাই সেটা উপভোগ করার জন্য গরম জামা গায়ে দিয়ে ঠিকই বের হবে। চিতই পিঠা কিংবা এক কাপ রং চা হোক অথবা আড্ডার নাম করে হোক, বের হওয়া কখনো মিস হয় না।

এমন শীত যেন ক্যাম্পাসে আর না আসে
কুয়াশার চাদরে মোড়ানো ক্যাম্পাস; ছবি: চাই মং মার্মা

আর ক্যাম্পাসে শীত আসা মানে আর কিছু হোক না হোক বারবিকিউটা মাস্ট। আর তার জন্য কত কি প্ল্যান করা,একটা শীতের সন্ধ্যায় পার্টি করার এসব খন্ড খন্ড মূহুর্ত ঠিক এই বছরটা বাসায় থেকে অনেক বেশি মনে পড়ছে।

ক্যাম্পাসে চারটি শীতের মৌসুম কাটানোর অনুভূতি ব্যক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান পলাশ বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতকাল শব্দটাই রোমাঞ্চকর।

আমার মনে হয় কুমিল্লার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়েও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শীতটা একটু বেশিই পড়ে। করোনা মহামারীর বন্ধের কারণে ক্যাম্পাসে শীতকালটা উপভোগ করতে পারছি না, এটা মনে পড়লেই খুব ব্যথিত হই।

শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন মাঝরাতে রাস্তায় সাধারণত কাউকেই দেখা যায় না। কিন্তু সেই তীব্র শীতের মাঝরাতেও পাগলাটে কিছু বন্ধু/ছোটভাইদের সাথে টং এর চা খেতে চলে যাওয়াটা খুব মিস করি।

তাছাড়া ক্যাম্পাস এলাকায় রাস্তার পাশের ঝুপড়ি ঘরে যেসব শীতকালীন পিঠা বানিয়ে বিক্রি করা হয় সেগুলা একপ্রকার অমৃত, বাড়িতে/বাসায় যদিও শীতকালীন পিঠা-পুলির অভাব হবে না, তবুও ক্যাম্পাসের ঐ ঝুপড়ি ঘরের কিনে খাওয়া পিঠা টা খুব মিস করবো।

সঙ্গী পেলে রাতভর ব্যাডমিন্টন খেলাটাও খুব মিস করি। গত চারটা শীতকালের মধ্যে এবারই প্রথম এরকম হচ্ছে। খুব করে চাই যে, আর যতবছরই ক্যাম্পাসে থাকি, এরকম কোনো শীতকাল যেন আর না আসে।

এমন শীত যেন ক্যাম্পাসে আর না আসে
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে উঠার প্বার্শ রাস্তা; ছবি: চাই মং মার্মা

কুমিল্লা শহর থেকে শীতকে উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসে সকালে ক্লাস করতে আসার স্মৃতিচারণ করে ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী রাবেয়া বাসরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শীতের ছোঁয়া কিছুটা অন্যরকম। ক্যাম্পাসের শীতকালে ঠান্ডা আবহাওয়ার প্রকৃতিটা আসলে অন্যরকম সৌন্দর্যমণ্ডিত।

ক্যাম্পাসে শীতকাল মানে কনকনে শীতে আরামের ঘুম হারাম করে সকাল ৮টার বাস ধরা অতঃপর ঘুমকাতুরে চোখে ক্লাস করা। তবে শীতকাল সবচেয়ে মজার পার্ট হল ঠান্ডা আবহাওয়ায় একসাথে বার্বিকিউ পার্টি,চড়ুইভাতি করে নিজেদের মাঝে অন্যরকমভাবে মেতো উঠা।

শীতকাল আসলে প্রার্থনায় একটা দোয়া সবসময় থাকতো আল্লাহ আর যাই হোক ৯টায় যাতে ক্লাস না পড়ে। কিন্তু নিয়তির কি আজব পরিহাস! এখন প্রার্থনায় ৯টার ক্লাস না পড়ার বদলে আসে ক্যাম্পাস খোলার আর্তনাদ।

২০১৬ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শীত মৌসুম কাটানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো.তরিকুল ইসলাম বলেন, ২০১৬ সাল থেকে প্রত্যেকটা শীত ক্যাম্পাসেই কাটিয়েছি কিন্তু এবার মহামারি করোনা ভাইরাসের কারনে ক্যাম্পাসে শীতের আমেজটা উপভোগ করা হচ্ছে না।

শীতের ক্যাম্পাসে কথা যদি বলি তাহলে প্রথমেই বলতে হয় যে শীতের সকালে সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার ছিল আরামের ঘুম ছেড়ে ক্লাসে যাওয়া। অনেক সময় ক্লাসে লেইট করে যেতাম আবার অনেক সময় মিস হয়ে যেতো,ব্যাপারটা বড্ড মিস করি এখন।

ক্যাম্পাসে শীতের উষ্ণতা উপভোগ করতাম কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের ঘাসের গালিচায় বসে রোদের আলিঙ্গন মেখে কখনো বা কেন্দ্রীর শহীদ মিনারে; কিন্তু করোনার কারনে এসব হয়ে উঠছে না, বিষয়গুলো বেশ মিস করি।

আর দিন শেষে যখন সন্ধ্যা নেমে আসতো তখন শীতের চাদরে ঘেরা ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক কর্মীদের আনাগোনাও বেড়ে যেত, সবাই সবার সংগঠন নিয়ে অনেক রাত অব্দি গান করতো, প্লাটফর্ম কিংবা প্রতিবর্তনের সদস্যরা এক সাথে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে গানে মেতে উঠতো।

ডিবেটিং সোসাইটির সদস্যরা শীতের সন্ধ্যায় ১০৫ নাম্বার রুমে যুক্তির ঝড় তোলে রাতে নবী মামা কিংবা ভিসির টং এ আবার চায়ের কাপে ঝড় তুলতো, আমি থাকতাম তাদের মাঝে অন্যতম একজন হয়ে। এ ব্যাপারগুলো বড্ড মিস করি।

শীতে ক্যাম্পাসের নানা স্মৃতি তুলে ধরে ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ রাসেল বলেন,গত চারটি শীতে ক্যাম্পাসে রয়েছে নানান স্মৃতি। সকাল বেলা শহরের স্বাভাবিক চিত্র দেখেই ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। ক্যাম্পাসে পৌঁছা মাত্রই কুয়াশার চাদরে মোড়ানো চিত্র গ্রামের শীতের অবয়ব চোখের সামনে ভেসে উঠে।

ক্লাসের ফাঁকেই রোদ পোহানোর পাশাপাশি ফ্যাকাল্টির ছাদে কিংবা ক্যাম্পাসের চত্বরগুলোতে প্রাণখুলে আড্ডার সময় গুলো খুব মিস করি। আবার নানান ফ্যাশনের শীতের ড্রেস নিয়ে বন্ধুদের সাথে খোশগল্প মিস করি।

মিস করব শীতকালের ডিপার্টমেন্টাল ট্যুর, যেখানে সিনিয়র জুনিয়রদের আনন্দের হাট বসত। শীতকালে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নানান আয়োজনে ক্যাম্পাসকে মাতিয়ে রাখলেও এবার হয়ত অনেকটা নিভৃতেই কেটে যাবে।

সর্বশেষ

Leave a Reply