Thursday, December 3, 2020

‘চারুলতা’র অমল থাকবে অমলিন

মামুন চৌধুরী

ছোটবেলায় প্রচুর সিনেমা দেখতেন। দেখতে দেখতে সিনেমার চরিত্রগুলোর প্রেমেও পড়তেন। তবে বেশি দেখতেন বাইরের দেশের সিনেমা। বাংলা সিনেমা নিয়ে একটু উন্নাসিকতা ছিল। সিনেমা যে এখানে হয় তা তিনি বিশ্বাসই করতেন না।

তবে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র পর বিশ্বাস করতে লাগলেন, হ্যা বোধ হয় কিছু একটা হচ্ছে। সেই হতে যাওয়া নতুন শিল্পের মহীরুহ হয়ে উঠলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

সিটি কলেজের ফাইনাল ইয়ারে পরিচয় হয় বাংলা নাট্যজগতের ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব শিশির ভাদুড়ির সঙ্গে। সাহিত্যের ছাত্র আর অভিনয় ভাল লাগা সৌমিত্র সেদিন শিশিরের প্রতিভায় মুগ্ধ হন।

তার মনে হল, শিল্পের সমস্ত গুন বোধ হয় এই লোকটার মাঝে আছে। দু’জন অসম বয়সী মানুষের মধ্যে তৈরি হয় বোঝাপড়া। সেই থেকে শুরু হল থিয়েটারে অভিনয়ের যাত্রা।

ততদিনে বাংলা সিনেমায় বেশ পরিবর্তন হচ্ছিল। সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’ করে বক্স অফিস টফিস না দেখে শিল্পই দেখতে লাগলেন। ‘অপরাজিত’ সিনেমার জন্য অপুকে খুঁজছেন।

বন্ধুর বন্ধু সৌমিত্রকে সত্যজিৎ রায়ের নিকট নিয়ে গেলেন। গল্পের তুলনায় তার বয়স বেশি হওয়ায় সে যাত্রায় বাদ পড়লেন। অপুর সংসার করার সময় ডাক পড়ল সৌমিত্রের।

বিভূতিভূষণের যে শিশু দিদির চোখে অবাক দুনিয়াকে দেখছিল, সে তখন সদ্য তরুণ। জীবনসংগ্রাম শুরু করেছে, পাকেচক্রে বিয়েটাও সেরে ফেলেছে।

বাঙালি মননে অমরত্ব পেয়েছে অপু আর তার কিশোরী পত্নীর সদ্য ফোটা রোমান্স। তারপর স্ত্রীর মৃত্যু, ছেলেকে কোলে বসিয়ে অচিনপুরের দিকে যাত্রা। এ চমৎকার চরিত্র সৌমিত্র ছাড়া আর কে ফুটিয়ে তুলতে পারত!

সত্যজিৎ সৌমিত্রের হাবভাব সব বুঝতেন ঠিক তেমনি সৌমিত্রও বুঝতেন সত্যজিৎ কি চায়। দু’জনের মানস পিতা-পুত্রের সম্পর্ক কখনো অভিভাবকতুল্য, কখনো বন্ধুত্বসুলভ।

'চারুলতা'র অমল থাকবে অমলিন
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে সৌমিত্র

দু’জনের বোঝাপড়া এতটাই নিখুঁত যে, সত্যজিৎ একবার বলেছিলেন সৌমিত্রের আওয়াজ বড্ড পাতলা। সেই থেকে উচ্চারণে সময় দিতে লাগলেন। এত পরিশ্রম করলেন যে পরে নিজেই হয়ে উঠলেন বাচিকশিল্পী। তার স্পষ্ট আর রসালো বাংলা উচ্চারণ বাঙালি দীর্ঘদিন স্মরণ করবে।

সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’তে চার যুবকের রোমাঞ্চকর গল্প। সেখানে সৌমিত্র যেন বাঙালি পুরুষের সার্থক দৃষ্টান্ত।

লাজুক হাসি, উচ্ছ্বাস, চশমার গ্ল্যামার কিংবা পোশাকের তারুন্য সব মিলিয়ে এ যেন সৌমিত্র ছাড়া সম্ভবই নয়। আমাদের ববিতার সাথে করলেন ‘অশনি সংকেত’। পাঞ্জাবি আর ধুতিতে সৌমিত্র যেন বিভূতিভূষণেরই উপন্যাসের নায়ক।

হাস্য রসাত্মক ‘বসন্তবিলাপে’ অপর্না সেনের সাথে হওয়া ঝগড়া আর প্রেম না করার ওয়াদা করে বন্ধুদের লুকিয়ে প্রেম করা কিংবা ‘হীরক রাজার দেশে’ আদর্শ মাস্টারের ভূমিকায় অভিনয় বা সুচিত্রা সেনের সাথে করা ‘সাত পাকে বাধা’য় স্বামী স্ত্রীর ভালবাসার সংসারে হঠাৎ আগত মনোমালিন্য থেকে বিরহ বাঙালিকে নিশ্চয় কাঁদিয়েছিল।

হাসি কান্নার নানা চরিত্রের মধ্যে দিয়েই সুদর্শন আর রুচিশীল শিল্পী হিসেবে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

ভাষা সংস্কৃতির প্রতি ছিল প্রগাঢ় টান। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হবার সুবাদে হোক বা ছোটবেলায় পিতা মাতার প্রশ্রয়ে বাংলা সাহিত্যের নানা বই পড়ে হোক, ভাষাকে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন।

'চারুলতা'র অমল থাকবে অমলিন
“অপুর সংসার” চলচ্চিত্রে সৌমিত্র

তিনি বলতেন, ‘আমি আমার ভাষাটা বলতে ভালবাসি। সেজন্য আমার সংলাপ বলতে এত ভালো লাগে। আমি যখন একটা বাংলা শব্দ উচ্চারণ করি, সেটা আমার কাছে তৃপ্তিকর মনে হয়। ভাষাটা আমার শরীর’।

এমন দরদ ছিল বিধায় বাঙালির মণিকোঠায় নিজেকে নিয়ে যেতে পেরেছেন। যেটা আজকালকার শিল্পীদের মাঝে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ যোগসূত্র না থাকলেও প্রতিষ্ঠান,প্রচলিত ধ্যান-ধারনার বিরোধী ছিলেন। মার্ক্সবাদের প্রতি একটু সহানুভূতি হয়তো ছিল।

১৯৭০ সালে ভারত সরকার পদ্মশ্রী দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। পরে বলেছিলেন, ওই সময়টায় সরকার চলচ্চিত্রের জন্য কিছুই করেনি। তাই আলাদা করে ব্যক্তি হিসেবে পুরস্কার নিতে চাননি।

একবার এক সাক্ষাৎকারে সৌমিত্রকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র আর সৌমিত্রের দৃষ্টিতে সেরা অভিনেতা কে হতে পারে উত্তমকুমার না সৌমিত্র।

তিনি বলেছিলেন, উত্তম কুমার! তাঁর তুলনা হয় না। কি সহজ স্বীকারোক্তি! তপন সিংহের ‘ঝিন্দের বন্দী’তে উত্তম ও সৌমিত্র একত্রে অভিনয় করেন।

খল চরিত্রে সৌমিত্রের অভিনয়ে নেই কোন অতিনাটকীয়তা, আছে প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপন। ভিলেন চরিত্রে নিয়ে আসলেন নতুনত্ব।

সৌমিত্রের কথা বললে সত্যজিৎ অবারিতভাবে চলে আসে। যদিও সৌমিত্র দুইশয়ের মত সিনেমায় অভিনয় করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের ২৭ টি সিনেমার ১৪ টিতেই কাজ করেছেন সৌমিত্র।

মৃনাল সেন,তপন সিংহ, তরুন মজুমদার সহ তখনকার নামকরা পরিচালকদের সাথে তিনি সমানতালে কাজ করেছেন।

সৌমিত্র মানে মঞ্চাভিনয়, আবৃত্তি, কবিতাচর্চা, সাহিত্যসৃষ্টি সবমিলিয়ে এক সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব। সত্যজিৎ বলতেন তার চলচ্চিত্র জীবনের নিখুঁত সিনেমা হল ‘চারুলতা’।

সে চারুলতার অমল যেমন করে চারুর একাকীত্ব যন্ত্রনা ভুলিয়ে দিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন, তেমনি বাঙালি সিনে দর্শকদের রুচিশীল,শাণিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সিনেমা উপহার দিয়ে আজ আমাদের মাঝ থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলেন সৌমিত্র।

তবে বাঙালি তাকে মনে রাখবে যতদিন বাংলা সিনেমা, বাংলা ভাষা কিংবা বাঙালি হারিয়ে না যায়।

সর্বশেষ

তানিনের পাশে ‘জাগ্রত মানবিকতা’

ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তানিন মেহেদীর চিকিৎসার জন্য অর্থ সহযোগিতা প্রদান করেছে জাগ্রত মানবিকতা (Humanity Alive)।বুধবার (...

এমন শীত যেন ক্যাম্পাসে আর না আসে

গতবার শীতের শেষবেলায় বন্ধ হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর বছর ঘুরে আবারও শীত এসেছে। কিন্তু ক্যাম্পাস খুলেনি। আর তাই ঘরে বসেই শীতের সময়ের ক্যাম্পাসের স্মৃতি...

কুবিতে চূড়ান্ত পরীক্ষার দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ

ক্যাম্পাস ডেস্কচূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে এবার প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়ে অবস্থান কর্মসূচী ও বিক্ষোভ করেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। ২ ডিসেম্বর (বুধবার)...

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচন আয়োজন না করার অনুরোধ

ক্যাম্পাস ডেস্ক চলমান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন্ন শিক্ষক সমিতি নির্বাচন আয়োজন না করার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। গতকাল...

সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা

দেশের ১৯টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই গুচ্ছের অধীনে মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান এ...

Leave a Reply