জুড়ে গেলো পুরো দেশ


বঙ্গোপসাগরের অববাহিকার বদ্বীপ বাংলাদেশে আবহমানকাল ধরে যোগাযোগ ছিল নৌ নির্ভর। নৌপথে দেশের যাতায়াতের মূল রুট তৈরি করে দিয়েছে এই দেশের বুক চিরে বয়ে চলা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। তবে, আধুনিক বাংলাদেশে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দিন দিন উন্নত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ।

রাজধানী ঢাকার সাথে সারাদেশের যোগাযোগ সহজ করতে কালে কালে তৈরি হয়েছে নানা মহাসড়ক। মেঘনা আর যমুনার বুকে দাঁড়িয়েছে বড় বড় সব সেতু। দেশের উত্তরাঞ্চল, পূর্বাঞ্চলে এসেছে অর্থনৈতিক গতি।

স্বাধীনতার পর পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলেও দীর্ঘদিন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদকে রাজধানী ও দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের থেকে সড়কপথে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল প্রমত্তা পদ্মা। নদীর আগ্রাসী ধরণ আর আর্থিক ব্যয়ের হিসেব মেলাতে না পেরে পদ্মার উপর সেতুর কথা ভাবতেই পারেনি অনেক সরকার। তবে সেই দিন ঘুচেছে এবার। আগ্রাসী পদ্মার বুকে দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র টপকে  নিজেদের অর্থে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাঙালির গর্বের পদ্মা সেতু। একসাথে জুড়ে গেছে পুরো দেশ।

শনিবার (২৫ জুন) বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সড়ক পথের শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১১টা ৪০ মিনিটে টোলপ্লাজার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে টোল দিয়ে মাওয়া প্রান্তে উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচন করেন।   

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলার মানুষের গর্বের ‘পদ্মা সেতুর শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এ সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ পরার্শক, ঠিকাদার, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, শ্রমিক, নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। ধন্যবাদ জানাই পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তের অধিবাসীদের যাদের জমিজমা ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের এই ত্যাগ ও সহযোগিতা জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।’

নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত জানানোর পর বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, সে কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের মানুষকে স্যালুট জানাই।’

বেলা ১১টা ২৩ মিনিটে মাওয়া প্রান্ত থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর পৌনে ১২টায় জাজিরা পয়েন্টে পৌঁছে সেতু ও ম্যুরাল-২ এর উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন তিনি।

জুড়ে গেলো পুরো দেশ
পদ্মা সেতু উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: প্রথম আলো।

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে খুলে গেল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অপরাপর অংশের জন্য সংযোগ, যোগাযোগ ও সম্ভাবনার দুয়ার। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণের রেল, গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ ঘটিয়েছে।

আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও পদ্মা সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) মোটরযান চুক্তির বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে এই সেতুর ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, সেতুর দুই ধারে রেল সংযোগ, ট্রান্সএশিয়ান হাইওয়ে ও রেল সংযোগ এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে পদ্মা সেতু।

জুড়ে গেলো পুরো দেশ
পদ্মা সেতু। ছবি: প্রথম আলো।

এই সেতু উদ্বোধনকে সামনে রেখে শনিবার ভোর থেকেই মাওয়া-জাজিরা দুই প্রান্তেই ছিল লাখো মানুষের ঢল। মানুষের চোখেমুখে ছিল বহুদিনে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার উচ্ছ্বাস। শুধুম পদ্মাপাড়েই নয় পদ্মা সেতু বরণে মুখর ছিল সারা দেশ। দেশের সব জেলায় পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষ্যে ছিল আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন, কোথায় হয়েছে মিষ্টি বিতরণ কিংবা কনসার্ট। আয়োজন হয়েছে দেশের বাইরে নিউইয়র্ক, লন্ডন, কলকাতাতেও।

রবিবার ভোর ছয়টার পর থেকে সবার জন্য খুলে যাচ্ছে দক্ষিণের এই দুয়ার। ফেরির কষ্ট ভুলে, শান্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাবেন দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রায় তিন কোটি মানুষ।

/নোবেল

সর্বশেষ

Leave a Reply