Monday, January 25, 2021

নওয়াব ফয়জুন্নেছা: পুরুষতান্ত্রিক দম্ভে আঘাত হানা এক সাহসী নারী

কাজী আনিছ

যে সময়ে নওয়াব ফয়জুন্নেছার জন্ম, সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠী ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে পিছিয়ে। ব্রিটিশ শাসনের পর এ পশ্চাৎপদতা শুরু। ব্রিটিশেরা ধর্মকে ‘গুটি’ বানায় আর ‘ভাগ করো আর শাসন করো’ নীতিতে সৃষ্টি করে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন। ব্রিটিশ সাহচর্য আর সুযোগ-সুবিধায় এগিয়ে যায় হিন্দু সমাজ। ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে মুসলমানেরা।

যেখানে গোটা মুসলমান সমাজ পশ্চাৎপদ, সেখানে নারীর অবস্থা কী-তা সহজেই অনুমেয়। একদিকে ছিল রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা, অন্যদিকে সামাজিক কুসংস্কার। এ সময়ে নারী বিশেষ করে মুসলমান নারীদের স্বাধীন চলাফেরা, চিন্তাভাবনা প্রভৃতি বিষয় ছিল কল্পনাতীত। উপরন্তু, নারীদের সামাজিক জীবনাচরণ নির্মিত ও পরিচালিত হতো কুসংস্কার এবং কথিত রীতিনীতি ও প্রথা অনুযায়ী। বিধবাদের বিবাহ না করা, পর্দা প্রথার কঠোর প্রয়োগ, পুরুষের বহুবিবাহ প্রভৃতি নারীস্বার্থ বিরোধী বিষয় ছিল এ অঞ্চলের মুসলমান নারীদের জীবনাখ্যান।

সার্বিক উন্নতি সাধনে মুসলমানেরা সচেষ্ট হয় ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর। স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ সমাজ সংস্কারকেরা ব্রিটিশ শাসকের সাহচর্যে, আনুগত্যে এবং ক্ষেত্র বিশেষে চাপ দিয়ে মুসলমানদের অগ্রগতির প্রয়াস চালান। সমাজও কিছুটা কুসংস্কারমুক্ত হয় বটে; তবে পুরোপুরি নয়। অতীতের বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত সমাজেও বহাল থাকে। সমাজসংস্কারকেরাও এ কাঠামোর বাইরে চিন্তা করতে পারেননি। তাই, সংস্কার আন্দোলনে বরাবরের মতোই নারী ছিল উপেক্ষিত।

ঠিক এমন এক সময়ে জন্ম নওয়াব ফয়জুন্নেছার। মুসলমান পরিবারে। ১৮৩৪ সালে। হোমনাবাদ পরগণার পশ্চিমগাঁওয়ে। বর্তমান কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায়। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে ফয়জুন্নেছা তৃতীয়। মৃত্যু ১৯০৩। মোট ৬৯ বছর বেঁচেছিলেন ফয়জুন্নেছা। এ জীবদ্দশায় ফয়জুন্নেছা ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত জীবনে যেসব কার্যক্রম, জীবনযাপন ও চিন্তাভাবনা করে গেছেন, তা ওই সময়ের মুসলমান সমাজের জন্য ছিল কল্পনাতীত। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় বদ্ধ পুরুষ সমাজ সংস্কারকেরা নারী অগ্রগতির কথা তেমন না ভাবলেও, ফয়জুন্নেছা ভেবেছেন। শুধু ভাবেননি, ব্যক্তিজীবনে ওই কাঠামোতেও আঘাত করেছেন। সেই হিসেবে অন্য সমাজ সংস্কারকদের তুলনায় ফয়জুন্নেছার জীবন ও কর্ম অনন্য।

পুরুষের বহুবিবাহ প্রথার শিকার হয়েছিলেন খোদ নবাব ফয়জুন্নেছাও। তাঁর স্বামী গাজী চৌধুরী। বড় জমিদার। ফয়জুন্নেছা তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। মা আফরান্নেছা মেয়ের বিয়ের আগে হবু জামাতাকে শর্ত দিয়েছিলেন, বিয়ের পর মেয়ে তাঁর কাছেই থাকবেন, হোমনাবাদে। গাজী চৌধুরী মেনে নেন। মেনে নেওয়ার কারণও ছিল। যেকোনো ভাবেই হোক ফয়জুন্নেছাকে বিয়ে করা ছিল গাজীর ইচ্ছা। প্রস্তাব দিয়ে একসময় প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন তিনি, ফয়জুন্নেছার স্বল্প বয়সের কারণে। তখন তিনি অবিবাহিত ছিলেন। অন্যত্র বিয়ে করলেও ফয়জুন্নেছার পিছু ছাড়েননি। তাই, শর্ত মেনে বিয়ে। পাঁচ বছর পর শর্ত ভাঙলেন স্বামী। একদিন বেড়ানোর কথা বলে ফয়জুন্নেছাকে বাড়িতে তুলে নিয়ে যান। প্রতারণা বুঝতে পেরে ক্ষুব্ধ হন ফয়জুন্নেছা। নিজ বাসভূমে চলে আসেন। আর স্বামীর কাছে যাননি। স্বামীও তাঁর খোঁজ খবর রাখেননি। ফয়জুন্নেছাও স্বামীর এমন দম্ভের কাছে হার মানেননি। প্রতারণায় আত্মসমর্পণ করেননি। এমনকি মোহরানার জন্য স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও ঠুকে দিয়েছিলেন। জয়ীও হন। স্বামীর আর খোঁজ নেননি। বরং মনোনিবেশ করেন জমিদারিতে, সমাজসেবায়।
যে সমাজে স্বামীভক্তি, স্বামীসেবা, স্বামীর বাধ্য হওয়া ছিল পূণ্যের কাজ আর এসবের ব্যতিক্রম গর্হিত কাজ, সেই সময়ে ফয়জুন্নেছার এ অবস্থান ছিল ওই সমাজের গালে চরম চপেটাঘাত।

আসলে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ দেখা যাবে, ফয়জুন্নেছার অবস্থান স্বামীর বিরুদ্ধে ছিল না। বরং, যে কাঠামো তাঁর স্বামীকে নারীকে আবদ্ধ করা, ইচ্ছা খাটানো ও অনুগত করে রাখা শিখিয়েছে, ফয়জুন্নেছা তাতে আঘাত করেছেন। ফয়জুন্নেছা স্বামীকে ভালোবাসতেন। প্রথমবার স্বামীর ঘরে গিয়েছিলেন প্রতারিত হয়ে। দ্বিতীয় ও শেষবার যান স্বেচ্ছায়। স্বামীকে দেখতে। স্বামী তখন মৃত্যু শয্যায়। অর্থাৎ ফয়জুন্নেছা নিজেকে দেখেছেন আত্মসন্মানবোধসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে। স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা সমাজনির্মিত ‘চাপে পড়ে অনুগত স্ত্রী’ হিসেবে ছিল না, ছিল আত্মনির্ভরশীল, স্বাধীন ও জীবনসঙ্গী হিসেবে। মৃত্যুর সময় হয়তো স্বামী গাজী চৌধুরী স্ত্রীর মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি নিজ আচরণের জন্য ফয়জুন্নেছার কাছে ক্ষমা চান। ফয়জুন্নেছা ক্ষমা করে দেন। ভালবাসার স্মারক হিসেবে নিজের লেখা ৪১৭ পৃষ্ঠার একমাত্র উপন্যাস ‘রূপজালাল’ স্বামীর নামে উৎসর্গ করেন ফয়জুন্নেছা।

ফয়জুন্নেছার ‘নবাব’ উপাধি লাভ ছিল পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ ও পুরুষনির্মিত ভাষার ওপর আরেক কুঠারাঘাত। সমাজ সংস্কার, উন্নয়ন, দানশীলতা প্রভৃতির কারণে ইংল্যান্ডের রাণি ভিক্টোরিয়া ফয়জুন্নেছাকে ‘নবাব’ খেতাবে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেন। আপত্তি তুলেন বড় পুরুষ জমিদারেরা। যুক্তি দেখান, ‘নবাব’ তো পুংলিঙ্গ। এ উপাধি কেবল পুরুষদের। আপত্তি নিয়ে ব্যাপক দেন দরবার। সিদ্ধান্ত হয়, ‘নবাব’ নয়, ফয়জুন্নেছাকে ‘বেগম’ উপাধি দেওয়া হবে। ফয়জুন্নেছাও সাফ জানিয়ে দেন, তিনি ‘বেগম’ উপাধি গ্রহণ করবেন না। উপায়ন্তর না দেখে ফয়জুন্নেছাকে ‘নবাব’ উপাধি দেয় ব্রিটিশ শাসক। উপমহাদেশের প্রথম নারী ‘নবাব’। উপাধি দেওয়ার অনুষ্ঠানে বড় পুরুষ জমিদারদের উপস্থিতিতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করলেন, নারী বা পুরুষ বিবেচনায় নয়, একজন মানুষ হিসেবেই ‘নবাব’ উপাধি পেলেন ফয়জুন্নেছা। নিজেকে একজন ‘মানুষ’ হিসেবেই দেখেছেন ফয়জুন্নেছা। ‘নবাব’ উপাধি পেয়ে তিনি তার প্রমাণ দিলেন আর পুরুষ জমিদারদের পুরুষতান্ত্রিক মন ও মননে আঘাত হানলেন।

পর্দা প্রথার কঠোর প্রয়োগের মধ্যেও জমিদারি করে গেছেন নবাব ফয়জুন্নেছা। তিনি যে একেবারে পর্দা মানেননি তা নয়, তবে পর্দা যে নারীদের ঘরে আটকে রাখার হাতিয়ার হতে পারে না, তা তিনি বুঝিয়েছেন কৃষকপ্রজার দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাঁদের খোঁজখবর নিয়ে।

নারী জাগরণ কিংবা নারীবাদ ওই সময়ে তেমন আলোচ্য বিষয় ছিল না। তবে, নওয়াব ফয়জুন্নেছা ব্যক্তিজীবন ও পেশাজীবনে যে কাজ করে গেছেন তা এ উপমহাদেশের নারী জাগরণ ও নারীবাদের ভিত রচনা করেছে-তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। নারীদের জন্য তিনি স্কুল তৈরি করেছেন, স্বর্ণকুমারি দেবী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সখী সমিতির সদস্য হয়ে নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে কাজ করে গেছেন। শুধু নারী নয়, ছেলেদের জন্যও স্কুল করেছেন। মুসলমান সমাজের সদস্য হয়েও তিনি ছিলেন আগাগোড়া অসাম্প্রদায়িক। অন্য ধর্ম তথা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শিক্ষার অগ্রগতিতে কাজ করে গেছেন। এছাড়াও তিনি রাস্তাঘাট, মসজিদ, মাদ্রাসা ও মুসাফিরখানা নির্মাণ, খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কাজ করে গেছেন। কুমিল্লায় এখনও তাঁর বেশ কিছু কীর্তি তাঁর অবদানের স্বাক্ষী হয়ে আছে। কিছু হারিয়ে গেছে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে।

এ সমাজ বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে সমাজের অগ্রগতিতে যার এত অবদান, সেই নবাব ফয়জুন্নেছাকে নিয়ে সমাজ ও ইতিহাস ততটা সরব নয়। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার কীর্তি যতটা ব্যাপক, নবাব ফয়জুন্নেছার অবদান ইতিহাসে ততটা মলিন। অথচ বেগম রোকেয়ার প্রায় ৩৫ বছর আগে ১৮৭৩ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা নারী শিক্ষার অগ্রগতির জন্য এ অঞ্চলে ছাত্রীদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নারী শিক্ষার অগ্রগতি, সমাজ সংস্কার, সাহিত্যে অবদান প্রভৃতির মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কার করে গেছেন বেগম রোকেয়া। তারও অর্ধশতকের বেশি সময় আগে এসব সংস্কার কাজই করে গেছেন নওয়াব ফয়জুন্নেছা। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ সমাজ সংস্কারকদের আগেই তিনি শিক্ষার অগ্রগতি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন।

বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তুলনা নয়। নারীবাদ, নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণে বেগম রোকেয়ার অবদান অবিস্মরণীয়। কিন্তু যেসব কাজের জন্য সমাজ বেগম রোকেয়াকে সম্মান জানিয়েছে আর জানাচ্ছে, একই কাজের জন্য এ সমাজের উচিত ছিল আগেই নওয়াব ফয়জুন্নেছাকেও যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া। তাঁর কাজ, দর্শন, চিন্তাচেতনা প্রভৃতিকে দেশ-বিদেশে সমাদৃত করা। সমাজ সংস্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদার সর্বপ্রথম দাবিদার যদি কেউ থেকে থাকেন, তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেছা।

অথচ কুমিল্লার বাইরে অনেকেই নওয়াব ফয়জুন্নেছা সম্পর্কে জানেন না। কুমিল্লার অভ্যন্তরেও অনেকেই জানেন কি না-তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ আছে। জানানোর তেমন কোনো রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক উদ্যোগও নেই। দুয়েকটি বই ছাড়া তাঁকে নিয়ে তেমন কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। বিশদ আলোচনা কিংবা গবেষণা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অঙ্গনে সমাজ সংস্কার, সাহিত্য আলোচনা, নারী জাগরণ, নারীবাদ প্রভৃতি আলোচনায় নবাব ফয়জুন্নেছার উপস্থিতি তেমন লক্ষণীয় নয়। তাঁর নামকরণে নির্মিত স্থাপনাগুলোতে তাঁকে নিয়ে চোখে পড়ার মতো কোনো কাজ নেই। সভা, সেমিনার আর বক্তৃতায় ‘প্রথম নারী নবাব’, ‘জমিদার’ প্রভৃতি শব্দে কেবল আবদ্ধ ফয়জুন্নেছা। স্থাপনাগুলোতে দায়সাড়াগোছের ছবিতে নীরব-নির্জীব ফয়জুন্নেছা।
কারণটা হয়তো নিহিত এ সমাজের রন্ধ্রে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন দিন পেরিয়ে আমরা আধুনিক সমাজে বসবাস করছি বলে দাবি করলেও এখনও বহাল পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও কাঠামো। তাই, এ সমাজ যত সহজে বেগম রোকেয়াকে মেনে নিয়েছে, তত সহজে নওয়াব ফয়জুন্নেছাকে গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ, নওয়াব ফয়জুন্নেছা নারী শিক্ষা আর নারী জাগরণে কেবল কাজই করেননি, ব্যক্তিজীবনে পুরুষতান্ত্রিক মন, মনন ও কাঠামোতে করাঘাত করেছেন। তাই, বেগম রোকেয়ার আলোচনা সমাজের জন্য যতটা নিরাপদ, ফয়জুন্নেছার আলোচনা ততটা বিপজ্জনক। এ আধুনিক সমাজও নবাব ফয়জুন্নেছাকে দেখতে চায় একজন ‘স্বামী অনুগত স্ত্রী’ হিসেবে। স্বামীকে ছেড়ে যাওয়া, স্বামীকে ছাড়াই সুনামের সঙ্গে জমিদারি করা ও সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখা একজন ফয়জুন্নেছাকে দেখতে, চিনতে আর বুঝতে প্রস্তুত নয় এ সমাজ।

প্রস্তুত যে নয়, তার প্রমাণও আছে। ফয়জুন্নেছাকে নিয়ে দুয়েক বইতে যে কয়েক আলোচনা হয়েছে, সেখানেও তাকে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় আনার চেষ্টা করেছেন কতিপয় লেখকেরা। কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন, স্বামীসঙ্গ একজন নারীর প্রধান আরাধ্য। স্বামী বঞ্চিত হয়ে দুঃখে আর কষ্টে ছিলেন ফয়জুন্নেছা। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি ‘রূপজালাল’ উপন্যাসে। যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়, স্বামীকেই তিনি বইটি উৎসর্গ করেছেন।
মানে এ সমাজটাও পুরুষতান্ত্রিক মানসপটে ফয়জুন্নেছাকে ব্যাখ্যা করতে চায়। অথচ ‘স্বামী বঞ্চিত হয়ে কষ্টের’ কথা তিনি কখনও বলেননি, কোথাও লিখেও যাননি। ‘রূপজালাল’ উপন্যাসেও নয়। বরং, সেখানে তিনি সমাজের পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক চেহারাকে উন্মোচন করেছেন। যদি তিনি ‘স্বামী বঞ্চিত হয়ে কষ্টেই’ থাকতেন, তাহলে তার পেশাদারি জীবন তথা জমিদারিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তো। অথচ এমনটা হয়নি। বরং সুনামের সঙ্গেই আজীবন জমিদারি করে গেছেন তিনি। ফয়জুন্নেছা যদি আসলেই কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে তা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর মূলোৎপাটন ঘটাতে না পারার কষ্ট, এ কাঠামোর বাইরে স্বামীকে আনতে না পারার যন্ত্রণা। এ কাঠামোই তিনি ভাঙতে চেয়েছেন নারীদের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে তাদের আত্মনির্ভরশীল ও স্বাধীন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে। এ আধুনিক সমাজ তাই ‘কাঠামোয় আঘাতকারী সাহসী’ ফয়জুন্নেছাকে নিয়ে আলোচনা করতে নারাজ। তাঁর জীবনকাল পুরুষতান্ত্রিক খোলসে আবদ্ধ করাও সম্ভব নয়।

ফয়জুন্নেছার আলোচনা-গবেষণা তা-ই, এ কাঠামোর জন্য অস্বস্তিকর। ফয়জুন্নেছাকে নিয়ে ইতিহাস ও সমাজের নীরবতা তাই সচেতন। এ অবহেলা নির্মিত। তাই, প্রশ্ন জাগে, এক সময় আঘাতে জর্জরিত হওয়া পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ কি এখনও নওয়াব ফয়জুন্নেছার পিছু ছাড়েনি?

টীকা: লেখার কিছু কিছু জায়গায় ‘নবাব’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মূলত তথ্যঋণ অংশ উল্লেখ করা বই ও কলামগুলোর অনুকরণে ‘নবাব’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। নিজস্ব বিশ্লেষণে ‘নওয়াব’ লেখা হয়েছে।

তথ্যঋণ:
নবাব ফয়জুন্নেছা ও পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ, রওশন আরা বেগম
মহীয়সী নারী ফয়জুন্নেছা, মুহাম্মদ আবদুল জলিল
নবাব ফয়জুন্নেছা ও রূপজালাল, মোবাশ্বের আলী (রওশন আরা বেগম-এর গ্রন্থে উদ্ধৃত)
কিংবদন্তী নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী, ড. এস. এম. ইলিয়াছ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪
নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী, এশিয়ার মহীয়সী নারী, সেলিম হোসেন, দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ জুন, ২০১৫

সর্বশেষ

Leave a Reply