পুরানো বন্ধুদের খোঁজে ফেসবুকে বিজ্ঞপ্তি

সানজিদা ঋতু

‘লক্ষ্মী দত্ত গান গাইতো। কালচারালি খুব রিচ ছিলো। প্রতি সপ্তাহে নাটকের প্র‍্যাক্টিস হতো যে হলরুমে এখন তা ভেঙ্গে ফেলেছে৷ গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম কলেজে। আগেকার কিছু নেই আর। সেই পুরোনো হোস্টেল বিল্ডিংটা আছে৷ দেখে খারাপ লাগলো।


পত্রিকার এক অবহেলিত অংশ হলো নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি। জরুরি সব খবরের ভীড়ে পরম অবহেলায় কয়েক লাইনে হারিয়ে যায় প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। সেখানে থাকে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির নাম, ছবি, পোশাক, বয়স আর ঠিকানার বর্ণনা। কিন্তু যার নাম মনে নেই, চেহারা স্মৃতিপটে আবছা, আছে কেবল কয়েক যুগ আগের এক ধূসর ছবি, তাকে কী করে খুঁজে বের করা যায়?

এমনই কলেজের ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতি আর সাদাকালো ছবি নিয়ে ১৯৭৯ সালের সেই পরিচিত মুখদের খুঁজছেন রওশান আরা আফরোজ।

বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র নামক এক ফেসবুক পেইজে কলেজের বান্ধবীদের নিয়ে একটি ছবি পোস্ট করেন তিনি।

পুরানো বন্ধুদের খোঁজে ফেসবুকে বিজ্ঞপ্তি
পুরানো বন্ধুর খোঁজে রওশন আরা আফরোজের ফেসবুক বিজ্ঞপ্তি

তার পোস্টে তিনি লিখেন, ” কুমিল্লা উইমেনস কলেজের ছাত্রী আমরা। সবাই হোস্টেলেই থাকতাম। এটি ১৯৭৯ সালে হোস্টেলের সামনে তোলা একটি ছবি। এ ছবির কারো সাথে আমার যোগাযোগ নেই। অন্য কারো সাথে আছে কিনা তাও আমার জানা নেই। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের খুঁজে পাওয়ার জন্য এ গ্রুপে ছবিটা দিলাম। ওদের কাউকে খুঁজে পেলে মন ভালো হয়ে যাবে।

সবারই নাম জানা ছিল তবে এখন অনেকের নাম ভুলে গিয়েছি। সামনে বসা মেরী, বেবী, হেনা, অনেকের নাম মনে নেই ……পিছনে- পান্না, রুনি, বেবী, রুবি, আমি (চুল টেনে রাখা), মাহমুদা, ফয়জুন, অনেকের নাম মনে নেই…..। নজরে পড়লে আশা করি সবাই সাড়া দিবে।”

পুরানো বন্ধুদের খোঁজে ফেসবুকে বিজ্ঞপ্তি
আফরোজের ফেসবুকে আপলোড দেওয়া সেই ছবি, ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ছবিটি। এরপর আফরোজের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে এমসিজে নিউজ।

তবে তাকে না পাওয়া গেলেও পোস্টের নীচে মন্তব্য করতে থাকা ছবিরই একজনকে পাওয়া যায়। এমন একজন হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন হলেন ফয়জুন্নেছা। তিনি সেই পোস্টে মন্তব্য করেন যে ছবিতে সবাই তার ক্লাসমেট এবং তিনিও সবাইকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

এভাবে পুরানো মানুষদের খোঁজ পেলেন কি না জানতে চেয়ে ফয়জুন্নেছার সাথে কথা হয় এমসিজে নিউজের। কলেজের ছবিটার কথা জিজ্ঞেস করতেই বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমি এই ছবিটায় দাঁড়ানো অবস্থায় প্রথম মেয়েটি। এখান থেকে কয়েকজনের সাথে শুধু আমার যোগাযোগ আছে। ফেসবুকে বেশ কয়েকজনকে খুঁজে পেয়েছি। কারও ছেলে, কারও মেয়ে, কারও জামাতা যোগাযোগ করেছে।

১৯৭৭ সালে পয়ালগাছা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি দেন ফয়জুন্নেছা। ভালো রেজাল্ট করায় শহরের কলেজে পড়াশোনা করার ইচ্ছা থেকে ভর্তি হন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজে। তারপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করে বেশ কয়েকটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন।

ছবির সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সামনে যে চশমা পরা সে মেরি ছিল৷ মেরি ছিল খুব স্মার্ট। সে নাটক মঞ্চায়ন করতো। তখনকার দিনে শেক্সপিয়ারের নাটক মঞ্চায়ন হতো। আমাদের হলরুমে এসব হতো৷ ইনডোর গেমস হতো। ক্যারাম, ব্যাডমিন্টন কত রকম খেলা। আমাদের সাথের মেয়েরা বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হতো, ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হতো।

লক্ষ্মী দত্ত গান গাইতো। কালচারালি খুব রিচ ছিলো। প্রতি সপ্তাহে নাটকের প্র‍্যাক্টিস হতো যে হলরুমে এখন তা ভেঙ্গে ফেলেছে৷ গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম কলেজে। আগেকার কিছু নেই আর। সেই পুরোনো হোস্টেল বিল্ডিংটা আছে৷ দেখে খারাপ লাগলো।

ছবিতে থাকা পান্না নামে এক বান্ধবীর নাম উল্লেখ করে ফয়জুন্নেছা স্মৃতি হাতড়ে বলেন, পান্নার বাড়ি ছিল লাকসামের ফেনুয়া গ্রামে।

পরবর্তী সময়ে পান্নার অনুসন্ধানে এমসিজে নিউজ খোঁজ নেয় ফেনুয়া গ্রামে। সেখানকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পান্না মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে ইহলোকের মায়া ছেড়েছেন বহু বছর আগেই।

পড়ন্ত জীবনের অফুরন্ত অবসরে বাগান আর নিজের নাতিনাতনিকে নিয়ে সময় কাটানো ফয়জুন্নেছার কাছে পান্নার এ খবর পৌঁছালে টেলিফোনের ওপারে নেমে আসে নীরবতা।

ফয়জুন্নেছা নিজেও একসময় ভুগেছিলেন স্তন ক্যান্সারে। তবে সে যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফয়জুন্নেছা এখন ফোনের ওপাশে অপেক্ষায় থাকেন কেউ হয়তো ফেসবুক মন্তব্য দেখে যোগাযোগ করবে।

অতঃপর যোগাযোগের সেই ভেলায় চড়ে ফিরে যাবেন উনাশির দুরন্ত সন্ধ্যায়। তবে তাদের হারিয়ে যাওয়া সে সন্ধ্যা আর আসে না, পান্নাদের মতোই মিশে যায় রাতের আঁধারে, কালের অতলগহ্বরে।

সর্বশেষ

Leave a Reply