বলিউড চলচ্চিত্র পানিপথঃ মুসলিম শাসকদের বিকৃত উপস্থাপন!

বিনোদন ডেস্ক 

আঠারো শতকের পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত বলিউড চলচ্চিত্র পানিপথ মুক্তি পেয়েছে গত ৫ ডিসেম্বর। আর মুক্তির পর পরই চলচ্চিত্রটি সমালোচনার মুখে পড়েছে বলিউডের আফগান ভক্তদের ।

পানিপথ চলচ্চিত্রটি তৈরি হয়েছে ১৭৬১ সালের পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ নিয়ে। এ যুদ্ধটি সংগঠিত হয়েছিলো আফগান শাসক আহমাদ শাহ আবদালী ও ভারতের পশ্চিমাংশের রাজ্য মহারাষ্ট্রের মারাঠা হিন্দুদের মধ্যে৷

আফগানদের দাবী, চলচ্চিত্রটিতে এ আফগান শাসক ও আফগান জাতির প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ শাহ আবদালীকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আহমাদ শাহ আবদালী আফগানিস্তানের জনগনের কাছে জাতীয় বীর, দুররানী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, যারা মারাঠা সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছিলো।
অন্যদিকে ভারতীয়দের কাছে আহমাদ শাহ আবদালী একজন ভয়ংকর আক্রমণকারী, যার হাতে প্রাণ গিয়েছে শত শত মারাঠা সৈন্যের।

পানিপথ চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার নিয়েও আছে সমালোচনা। আহমাদ শাহ আবদালীর ছবি সম্বলিত একটি পোস্টারে প্রচার করা হয়েছে, ‘যেখানে তাঁর ছায়া পড়ে,সেখানে মৃত্যু অনিবার্য।’

তবে কেবল পানিপথই নয়, একইভাবে সমালোচনার শিকার হয়েছিলো ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত আরেক চলচ্চিত্র পদুমাবাৎ। এ চলচ্চিত্রটি আরেক আফগান শাসক আলাউদ্দিন খিলজিকে দেখানো হয়েছিলো বর্বর, অসভ্য এক শাসক হিসেবে। এছাড়া এ বছরেই মুক্তিপ্রাপ্ত ১৮৯৭ সালে সংগঠিত শিখ ও আফগানদের মধ্যে সারাগ্রাহী যুদ্ধ অবলম্বনে তৈরি কেশারি চলচ্চিত্রটিতেও আফগানদের চিত্রায়িত করা হয়েছে আক্রমণকারী হিসেবে।

এসব চলচ্চিত্র আফগানদের মনোভাব,ইতিহাসকে আঘাত করেছে বলে আল জাজিরাকে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন আফগান চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান আমিন সোব। তিনি বলেন, পানিপথ বলিউডের আরও একটি চলচ্চিত্র, যেখানে আফগান ইতিহাস ও মূল্যবোধকে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বলিউডের পানিপথ নিঃসন্দেহে একটি লাভজনক বিনিয়োগ। কেননা, এতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আগ্রহ, ইচ্ছার উপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্রটির পরিচালক এখানে ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন।

বিবিসি বাংলা

এদিকে গত সপ্তাহের রোববার আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ভারপ্রাপ্ত আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইদ্রিস জামান বলেন, পানিপথ চলচ্চিত্রটিকে ঘিরে আফগানদের ঐতিহাসিক স্পর্শকাতরতা সম্পর্কে জানাতে কাবুলের ভারতীয় দূতাবাসে যোগাযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া ছবিটি মুক্তির আগেও নয়া দিল্লীর আফগান দূতাবাস ভারতীয় সরকারের কাছে এ মর্মে চিঠি পাঠান যেন চলচ্চিত্রে আফগান শাসকদের ভুলভাবে উপস্থাপন করা না হয়।

তবে চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগে দুই ডিসেম্বর পানিপথের পরিচালক একটি সাক্ষাৎকারে অশোতোষ গোয়ারিকার আফগানদের ইতিহাস, অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে বলেন, আবদালী ভারতে বেশ কয়েকবার আক্রমণ করেছে। আমার কাছে চলচ্চিত্রটি হিন্দু-মুসলিম সংঘাত নিয়ে নয়। আমার কাছে ছবিটির উপজীব্য একজন হানাদারকে আটকানো, নিজের জন্মভূমিকে রক্ষা করা, সর্বোপরি দেশপ্রেম।

তবে আফগানিস্তানের এক ফটো সাংবাদিক জাওয়াদ ছবিটির ব্যাপারে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, চলচ্চিত্রটিতে ইসলামকে সংঘাত ও ভয়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থিত করা হয়েছে। যা মোটেই উচিত হয়নি।

বর্তমান সময়ে মানুষের ইতিহাস পড়ার সময় নাই। তারা যা দেখে তাই বিশ্বাস করে। আমি আশা করি, ভারতীয় চলচ্চিত্রকাররা পক্ষপাতী না হয়ে প্রকৃত ইতিহাসের উপর জোর দিবেন। পানিপথ চলচ্চিত্রে আবদালীকে দেখানো হয়েছে একজন চোর, ডাকাত হিসেবে। যা সত্য নয়। আমি বুঝতে পারি, ভারতীয়দের কাছে আবদালী একজন আক্রমণকারী। তবে ঘটনা যেমন ঠিক তেমনভাবেই উপস্থাপন করা জরুরি।

উল্লেখ্য, তালেবান শাসন পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে আফগানিস্তান কাবুল এক্সপ্রেস নামে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। যার কিছু কিছু অংশ আফগানিস্তানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সিহা মুসলিম হাজারার প্রতি আক্রমণাত্নক ছিলো।

 

*আল জাজিরা অবলম্বনে

/আর আই

সর্বশেষ

Leave a Reply