স্পিলবার্গের ‘দ্য টার্মিনাল’ ম্যানের মৃত্যু

১৯৮৮ থেকে ২০০৬ সাল। আইনি জটিলতায় টানা ১৮ বছর প্যারিসের একটি বিমানবন্দরেই কাটিয়ে দিয়েছেন ইরানিয়ান নাগরিক মেহরিন কারিমি নাসেরি।  ফ্রান্সের চার্লস ডি গল বিমানবন্দরের টার্মিনাল -১ এ বসবাস করা ইরানিয়ান এই টার্মিনাল ম্যান মারা গেছেন। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে টার্মিনালেই জীবনের ইতি টেনেছেন তিনি। খবর বিবিসির। 
প্যারিস বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, শনিবার দুপুরের দিকে মৃত্যু হয় ৭৬ বছর বয়সী এই নাগরিকের। পুলিশ ও চিকিৎসক দল তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও তাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়নি। 
নাসেরি ১৯৪৫ সালে ইরানের সোলেইমানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ইরানিয়ান ও মা ছিলেন ব্রিটিশ। তিনি ১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ডে পড়াশোনার উদ্দেশে ইরান ত্যাগ করেন। যখন তিনি ফিরে আসেন রেজা শাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে কারাবরণ করতে হয় এবং পাসপোর্ট ছাড়াই নির্বাসন দেওয়া হয়। 
ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছিলেন। এমনকি বেলজিয়ামে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা তাকে শরণার্থীর প্রশংসাপত্র দিয়েছিল। কিন্তু সেই কাগজপত্র সম্বলিত তাঁর ব্রিফকেসটি প্যারিসের রেল স্টেশনে চুরি হয়ে যায়। 
এমন অবস্থায় ফ্রান্সের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ফেলে কিন্তু অন্য কোনো জায়গায় সরাতে পারেনি। কারণ তাঁর কাছে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্র ছিল না। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৮ সালের আগস্টে ফ্রান্সের চার্লস ডি গলে গিয়ে হাজির হন এবং সেখানেই বাস করা শুরু করেন। 
এছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ক্রমবর্ধমান ইউরোপীয় অভিবাসন আইনের কঠোরতা তাকে বছরের পর বছর সেখানে থাকতেই বাধ্য করেছিল। 
যখন তিনি পরিশেষে তার শরণার্থীর কাগজপত্র হাতে পান তখন তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। বিমানবন্দর ছেড়ে যাওয়া নিয়ে তার অনিরাপত্তার কথাও জানান। তিনি  স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন এবং ২০০৬ সালে অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই থাকতেন এবং পরবর্তী সময়ে  প্যারিসের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতেন। 
নাসেরি পত্রিকা, ম্যাগাজিন দিয়ে ঘিরে থাকা লাল রঙের প্লাস্টিকের বেঞ্চে ঘুমাতেন এবং কর্মীদের ওয়াশরুমে গোসল করতেন। ডায়েরি লিখে, ম্যাগাজিন, অর্থনীতি পড়ে এবং ভ্রমণকারীদের পর্যবেক্ষণ করেই তার সময় কেটে যেত।
নাসেরি ২০০৪ সালে প্রকাশিত হওয়া ‘দ্য টার্মিনাল ম্যান’ নামে আত্মজীবনী লেখেন। ধীরে ধীরে তিনি যাত্রীদের মাঝে মিনি-সেলিব্রেটি হয়ে উঠেছিলেন। বিমানবন্দরের কর্মীরা তার নাম দিয়েছিল ‘লর্ড আলফ্রেড’। 
তার সাথে বিমানবন্দরে যাদের বন্ধুত্ব হয়েছিল তারা জানিয়েছেন, জানালা ছাড়া বদ্ধ জায়গায় বসবাস তার মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলেছিল। নব্বইয়ের দশকে বিমানবন্দরের চিকিৎসকেরাও তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তারা নাসেরিকে  জীবাশ্ম হিসেবেও বর্ণনা করেছিলেন।
লম্বা পাতলা চুল, বসে যাওয়া চোখ। দুর্বল ফাঁপা গালে বেঞ্চে পাইপ দিয়ে ধূমপান করতে করতে ১৯৯৯ সালে দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেছিলেন, ‘পরিশেষে আমাকে বিমানবন্দরটি ছেড়ে যেতে হবে। কিন্তু আমি এখনও আমার পাসপোর্ট অথবা ট্রানজিট ভিসার জন্যে অপেক্ষা করছি।’
বিখ্যাত আমেরিকান পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘দ্য টার্মিনাল’ ছবিটি ইরানিয়ান এই নাগরিকের জীবন নিয়েই বানানো। ছবিটির মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন টম হ্যাংকস। এছাড়া ফরাসি চলচ্চিত্র ‘লস্ট ইন ট্রানজিট’ ও ‘ফ্লাইট’ নামের অপেরা দুটিও তৈরি হয়েছিল এ ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই। 
দেড় যুগ টার্মিনালে কাটিয়ে দেওয়া নাসেরি মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগেই চার্লস ডি গলে বসবাসের জন্যে ফিরে আসেন। শনিবার সেখানেই মৃত্যু হয় এই টার্মিনাল ম্যানের। 

/রাফি

সর্বশেষ

Leave a Reply