মাছের আঁশে, টাকা আসে

ইসরাত জাহান স্বর্না ও রোকসানা খানম

নিচে গোমতি নদী, রাস্তায় মাছের আঁশ আর উত্তপ্ত রোদ। জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি নির্জন-নিস্তব্ধ একটি গ্রামে মাছের আঁশ শুকাতে দেওয়া হয়। রোদের আলোতে শুকাতে দেওয়া আঁশগুলো দূর থেকেই ঝলমলে রূপালি আলো ছড়াচ্ছিল। এই মাছের আঁশ শুকিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছেন কুমিল্লার ঝাঁকুনিপাড়া গ্র্রামের এক ব্যবসায়ী মাহাবুব আলম ।

মাছের আঁশ রপ্তানি করা হয় জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপিন্স এর মত দেশগুলোয়। মাছের আঁশ থেকে নেইলপলিশ, লিপস্টিক, মেকআপ ও ব্রাশ , গহনা, গাড়ির রং, ফুড সাপ্লিমেন্ট এমনকি ওষুধও তৈরি হয়।

মাছের আঁশে, টাকা আসে
শুকাতে দেওয়া মাছের আঁশ। (ছবি: ঝাঁকুনিপাড়া গ্রাম থেকে তোলা।)

 

যেভাবে শুকানো হয়

রোদের তীব্র আলো আর অসহনীয় গরম দেখে মুঠোফোন চেক করে দেখা গেল তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জানা গেল এমন তাপমাত্রায় আঁশ শুকাতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। মাছ কাটার পর আঁশগুলোকে আলাদা করে পানিতে ধুয়ে শুকাতে দেওয়া হয়।

শুকানোর দায়িত্বে ছিলেন কলেজছাত্র আতিকুল ইসলাম (১৮)। তার কাছ থেকে জানা গেল, দুর্গন্ধের কষ্ট এড়াতে লোকালয় থেকে কিছুটা দূরে মাছের আঁশগুলো শুকানো হয়। আগে রাজগঞ্জ বাজারের দোকানের ছাদে শুকানো হত। বর্তমানে ব্যবসার পরিধি বড় হওয়ায় কাঁচামালগুলো গোমতীর পাড়ে শুকানো হয়। আতিকুল জানান, কর্মচারীরা কাজের সময় আঁশকে বলে থাকেন মাছের ‘আমিষ‘।

সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ

ঝাঁকুনিপাড়ার পাশেই সাংরাইশ গ্রামে মাছের আঁশের গোডাউন। এখান থেকেই আঁশগুলো বিদেশে রপ্তানি হয়। গোডাউনে রুমের সংখ্যা তিনটি। এক রুমে প্যাকেজিং করা হয়। বাকি দুই রুমের একটিতে কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা আর অন্যটিতে গাড়ি রাখা হয়।

রাজগঞ্জ বাজারে মাছ কাটা ও সংগৃহীত আঁশগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বাজারের যে অংশে মাছ কাটা হয় সেখানে ছিল ভ্যাপসা গরম, দুর্গন্ধ, আর কাঁদা। মাহাবুব আলমের নাম বলতেই এক মাছ বিক্রেতা ‘মাহাবুব মৎস্য আড়ৎ’ দেখিয়ে দিলেন। সেখানে আতিককেও পাওয়া গেল। কেউ মাছ কাটছে, কেউ মাছ পরিষ্কার করছে, কেউ আঁশগুলোকে একপাশে রেখে দিচ্ছে আর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাহাবুব আলম। আঁশ রপ্তানির বিষয়ে মাহাবুব আলম বলেন, ‘১৫ বছর যাবত এই কাজ করতেছি। আগে মাছ কাটার কাজ করতাম।‘

তিনি বলেন, মাছের আঁশ সর্ম্পকে প্রথম জানতে পারি ঢাকা থেকে আগত এসহাক বেপারী নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে। আশঁগুলো শুকিয়ে পরিষ্কার করে দিলে কেজিতে ৪০০ টাকা করে দিবেন বলে জানিয়েছিলেন। মাহাবুব প্রথমদিনে ১০ কেজি শুকিয়ে পেয়েছিলেন ৪০০ টাকা। এরপর বিনামূল্যে খাওয়া-দাওয়াসহ ১০ হাজার টাকা বেতনে ৬ জন কর্মচারী নিয়োগ দেন।

 

মাছের আঁশে, টাকা আসে
(রাজগঞ্জ বাজারে মাহাবুব আলমসহ অন্যান্য কর্মচারীরা)

মাহাবুব আলম থেকে জানা যায়, কুমিল্লা শহরের রাজগঞ্জ বাজার, টমছম ব্রিজ, পদুয়ার বাজার ও ক্যান্টনমেন্ট বাজার থেকে মাছের আঁশগুলো সংগ্রহ করা হয়। মাছের আড়ৎ গুলোতে বছর প্রতি ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে রাখা হয়। তিনি প্রতি বছর প্রায় ২০ টনের মতো কাঁচামাল রপ্তানি করেন।

১৫ দিন, ১ মাস অথবা ২ মাস পর পর আঁশগুলো রপ্তানি করা হয়। তিনি বলেন, প্রতিমাসে লাভ হয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে জানা যায়, মাছের আঁশে কেজিপ্রতি বাংলাদেশী টাকায় ৭০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করা যায়।

মাহাবুব আলম আরও বলেন, বর্তমানে কর্মচারীর সংখ্যা ১৬ জন। এর মধ্যে প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যে ৬ জন নিয়োজিত আছেন তাদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার সুবিধাসহ বেতন ১০-১২ হাজার টাকা। আর মাছ কাটার কাজ করেন ১০ জন, যারা মাছ কাটার পরিমাণের উপর নির্ভর করে দৈনিক ৩০০-৪০০ অথবা ৫০০ টাকা পায়।
কর্মচারী হাসান (১৯) বলেন, ‘৭-৮ বছর ধরে ওনার আন্ডারে কাজ করি। দিনে ৩০০ অথবা ৫০০ টাকা পাই‘। আরেক কর্মচারী শাহজাদ (১৭) বলেন, ৪ বছর ধরে তিনি মাছ কাটার কাজ করেন। আগে পড়াশোনা করতেন। তিনি প্রতিমাসে বেতন পান ১০ হাজার টাকা।

আতিক ইসলাম বলেন, ‘পড়াশোনা করার পাশাপাশি এই কাজটা করতে পারি। খাওয়া-দাওয়া ফ্রিসহ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেতনে, ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কাজ করে বাকিটা সময় পড়াশোনা করতে পারি।’
কথা হয়েছিলো পাশের দোকানের এক মাছ বিক্রেতা লিটনের সাথেও। তিনি বলেন, আগে তারা মাছের আঁশগুলো ফেলে দিতেন। এখন এগুলো বিক্রি করে অতিরিক্ত টাকা উপার্জন করতে পারেন।

কুমিল্লার মৎস্য অধিদপ্তরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘ এটা একটা ভালো উদ্যোগ। কারণ এই মাছের আঁশগুলো যদি না শুকানো হতো তাহলে পরিবেশে দুর্গন্ধ ছড়াতো।’

বাংলাদেশের যে আঁশ আগে যেখানে সেখানে পড়ে থাকতো, কোন কাজে লাগতো না, এখন সেটাকে শুকিয়ে প্রকিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এই ব্যবসার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বেকার যুবকেরা যদি এই কাজটা না করতো তাহলে তারা সামাজিক অপরাধ-অপকর্মেও জড়িয়ে যেতে পারতো।

অন্য কেউ যদি এ কাজে এগিয়ে আসতে চায় তাহলে তার পরিশ্রম করার মন-মানসিকতা থাকতে হবে। কিছুটা দক্ষতা অর্জন করতে হবে এ কাজে । কেউ যদি এ বিষয়ে আগ্রহী হয় তাহলে মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।

 

সর্বশেষ

Leave a Reply