Monday, January 25, 2021

বিদায় “ঈশ্বরের হাত”

ফাতেমা রিন্স

ফুটবল মাঠ থেকে অবসর নিয়েছিলেন ১৯৯৪ সালে গ্রীসের বিপক্ষে খেলে। আর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ৬০ বছর বয়সে জীবনের মাঠ থেকে অবসর নিলেন “ঈশ্বরের হাত” খ্যাত সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন দিয়াগো ম্যারাডোনা।

ম্যারোডানার এ বিদায়ে আর্জেন্টিনায় ঘোষণা করা হয়েছে তিনদিনের শোক।

১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সে জন্মগ্রহন করা ম্যারাডোনা খেলা শুরু করেছিলেন মাত্র ১০ বছর বয়সে, আর্জেন্টজিনার জুনিয়র টিমে। তবে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ফুটবলের অসাধারণ নৈপুন্য দেখিয়ে জায়গা করে নেন সিনিয়রদের টিমে।

আর জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল ১৯৭৭ সালে হাঙ্গেরীর সাথে প্রীতি ম্যাচে,৬৫ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে। তবে এ বদলি খেলোয়াড়টিই একদিন হয়ে গেছিলো আর্জেন্টিনার ফুটবলের প্রাণভোমরা।

জাতীয় দলের পাশাপাশি ম্যারাডোনা খেলেছেন ১৯৮১ সালে আর্জেন্টাইন ক্লাব বোকা জুনিয়রসে। তবে মাত্র এক মৌসুম। কিন্তু তাতেই করেছিলেন বাজিমাত! মনোমুগ্ধকর এক সলো গোলে প্রতিপক্ষ রিভার প্লেটকে হারিয়ে নিজ ক্লাবকে করান মৌসুম সেরা৷

এরপর নিজ দেশের ক্লাব ছেড়ে ১৯৮২ সালে সবচেয়ে বেশি রেকর্ড ফি ৫ মিলিয়ন ইউরোতে বার্সায় যোগ দেন তিনি। কাতালানদের জন্য তার সর্বোচ্চটা দেওয়ার পথে বাধ সাধে ইনজুরি। ১৯৮৩ সালে বিলবাও এর সাথে এক ম্যাচে ইনজুরিতে পড়েন তিনি। তাতেই বার্সার সাথে ভাগ্যের সিকে ছিড়ে তাঁর।

বিদায় "ঈশ্বরের হাত"
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তরুণ ম্যারাডোনা; ছবি: দ্যা গার্ডিয়ান

ইনজুরি থেকে ফিরে ১৯৮৪ সালে যোগ দেন ইতালীয়ান ক্লাব নাপোলিতে। নাপোলিতে যোগ দেওয়ার ২ বছর মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে নিজের জাত চেনান তিনি।

এই বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ডের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালে বহুল বিতর্কিত হাতের সাহায্যে শতাব্দীর সেরা এক গোল করে ইতিহাসের পাতায় অন্যরকমভাবে নাম লিখিয়ে নিয়েছেন তিনি। যাকে তিনি নিজেই “ঈশ্বরের হাত” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এই ম্যাচে ২-১ গোলে জিতে যায় আর্জেন্টিনা। আর প্রকৃত অর্থেই সেবার ফুটবল ঈশ্বরের হাত ধরে বিশ্বকাপ ট্রফির স্বাদ নেয় দেশটি।

বিতর্কিত এই গোলকে নিয়ে ইংল্যান্ডের টেরি বুচার ২০০৮ সালে বলেছিলেন, “আমি তাকে কখনো ক্ষমা করবো না। এটা কখনোই ভালো নয় যে, এমনভাবে আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যাবো।”

তবে শুধু নিজে দেশ আর্জেন্টিনাতেই যে তিনি সাফল্য পেয়েছেন তা নয়, ক্লাব পর্যায়েও পেয়েছেন বহু সাফল্য।

ফুটবল ক্লাব নাপোলিকে ১৯৮৭ সালে প্রথম এবং ১৯৯০ সালে দ্বিতীয় বারের মতো তিনি সিরি আ লীগ টাইটেল এনে দেন। তাছাড়া ১৯৮৭ সালে ইতালিয়ান কাপ ও ১৯৯১ সালে উয়েফা কাপও নাপোলির ঘরে আসে এই ” ঈশ্বরের হাত” ধরেই।

তবে চাঁদের কলংকের দাগ যেন ম্যারাডোনারও ছিলো। সে কারনেই বোধ হয় নাপোলিতে খেলার ৭ বছরের মাথায় ১৯৯১ সালে মাদকাসক্ত হওয়ার অপরাধে ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ায় নাপোলি ছাড়তে হয় তাঁকে।

১৯৮৬ এর পর ১৯৯০ এবং ১৯৯৪ সালে আরও দুটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। ১৯৯০ সালে তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা রানার্স আপ হয় এবং ১৯৯৪ সালে গ্রীসের বিপক্ষে খেলার মাধ্যমে দেশের হয়ে শেষ খেলা খেলেন তিনি। জাতীয় দলের জার্সি খুললেও ক্লাবের হয়ে খেলে গিয়েছিলেন ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত।

ফুটবল ছাড়লেও ফুটবলের সঙ্গে সখ্যতার ইতি ঘটাননি। ২০১০ ফুটবল বিশ্বকাপে ছিলেন তারকা বহুল আর্জেন্টাইন ফুটবল দলের কোচ৷ তবে সে যাত্রা খুব একটা সুখকর হয়নি তাঁর। কোয়ার্টার ফাইনালেই থেমে যায় মেসিদের জয়রথ।

সাথে শেষ হয় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গের এ সম্পর্কটাও। এরপর নিজ দেশের, দেশের বাইরের নানা ক্লাবে কোচিং করালেও থিতু হননি কোথাও।

আর এবার তো থিতু হলেন না জীবন নামের ফুটবল মাঠেই। গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সতর্ক গোলকিপারকে ফাঁকি দেওয়ার মতোই বিশ্বজুড়ে লাখো ভক্তের চোখকে এড়িয়ে জীবনের স্কোরলাইনটা ষাটের ঘরে আটকে দিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন এ ফুটবল মাঠের ওপারে।

সর্বশেষ

Leave a Reply