সাংবাদিক হেনস্তার প্রতিবাদে ফেসবুকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলামকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় সচিবালয়ে আটকে রেখে হেনস্তা করা এবং পরে শাহবাগ থানায় মামলা, পুলিশে সোপর্দের ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও দেশের সচেতন নাগরিকরা।

এ ঘটনায় নির্যাতনকারীদের বিচার চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান তার ফেসবুক লিখেছেন, রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে ৫ ঘন্টা আটক রেখে নির্যাতন করার অধিকার কে দিল? নির্যাতনকারীদের বিচার চাই। এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

একই বিভাগের আরেক শিক্ষক অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন তাঁর ফেসবুকে ওয়ালে লিখেছেন, ঘুরে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই, রোজিনা আমাদের স্বর, আমাদেরই গলা চেপে ধরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ লিখেন, রোজিনা ইসলাম কোন নথির খবর বের করতে চেয়েছিলেন বলে কর্তারা এতো ক্ষিপ্ত? সাংবাদিকতার ওপর এতো নির্যাতন, এতো অপমান? সেই নথি তো এখন জনসমক্ষে আনাই প্রথম কাজ হওয়া দরকার।মন্ত্রণালয়ের কর্ম-অপকর্ম-কুকর্ম যদি জনস্বার্থে প্রকাশ দরকার হয়, আর তা যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে সরকার গোপন রাখেও তবুও তা জনগণের নজরে আনার কাজই সাংবাদিকতা। অনুমতিপ্রাপ্ত তথ্যই যদি সব খবর হয় তাহলে সরকারি প্রেসনোটই তো যথেষ্ট, আর মিডিয়ার কী দরকার? দেখা যাচ্ছে যতো দুর্নীতি, অনিয়মের খবর প্রকাশিত হচ্ছে তত সরকারের বাহিনী উপবাহিনী আইন ও বেআইন দিয়ে টুটি চিপে ধরতে চেষ্টা করছে। কিন্তু লাভ নাই। সব গোপন প্রকাশ হবে। রোজিনা এ সংক্রান্ত যত প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সেগুলো এখন আরও প্রচার করতে হবে।

ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান খালেদ মুহীউদ্দিন লিখেছেন, আমার বিরুদ্ধেও মামলা দেন। রোজিনার বিরুদ্ধে যে কারণে মামলা দিছেন, ওই কারণে আমার বিরুদ্ধেও মামলা দেন। নথি আমিও চুরি করছি। সদাশয় সরকার, মনে রাইখেন আমারে বা আমগরে নথি দেওনের বা দেখানোর সাহস আপনের নাই। খালি নথি দিয়া রিপোর্ট হয় না, আপনেরেই জিগাইতাম পরে যে এই কামডা কেন করছেন? আরও মনে রাইখেন রাষ্ট্রের বা মানুষের ক্ষতি করার কোনো সুযোগ আমাগো মত নথি চোরগো নাই। আপনারা যারা নথির কারবার করেন তাগো আছে। মনে আছে মেডেলের সোনা বা রূপপুরেরর বালিশ? ওপেন চ্যালেঞ্জ দিলাম, যুক্তি দিয়া দেখান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিবের কাছে এমন কোন নথি আছে যা প্রকাশ হইলে এই দেশের বা দেশের মানুষের ক্ষতি হইব?

আরও পড়ুন:

কি ছিলো নথিতে? বড় কোনো দুর্নীতি?

রোজিনাকে হেনস্তা অন্য সাংবাদিকদের জন্য সুস্পষ্ট বার্তা

ডেইলি স্টারের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক শরীফুল হাসান লিখেন, কোন আইনে একজন সরকারি কর্মকর্তা একজন সিনিয়র সাংবাদিকের গলা চেপে ধরেন? ছবি আর ভিডিও গুলো দেখে মনে হল তারা কোন ডাকাত ধরেছেন। অথচ রোজিনা আপা একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক। কথা হলো একজন সিনিয়র সাংবাদিককে তিনি যদি এভাবে গলা চেপে ধরতে পারেন জনগণকে কী করবেন? এই অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। মুক্তি চাই রোজিনা আপার।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম লিখেছেন, সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের ‘অপরাধ’ তিনি স্বাস্থ্য খাতের গোপন নথি’র ছবি তুলেছেন। জানি না কী এমন তথ্য আছে এই গোপন নথিতে! তবে তিনি কী ধরনের গোপন নথি প্রকাশ করতে পারেন, তার কিছু আভাস পাবেন, তার সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টগুলো দেখলে! এর আগেও তিনি বহু সাড়া জাগানো অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছেন। পেয়েছেন অনেক জাতীয় পুরস্কারও। সম্প্রতি স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একের পর এক অনুসন্ধানী রিপোর্ট করছেন। আজ যেন সেসব রিপোর্টেরও ‘পুরস্কার’ পেলেন! সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে আটকে রেখে হয়রানির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।


এটিএন নিউজের বার্তা প্রধান মুন্নী সাহা তাঁর স্ট্যাটাসে লিখেন, কার গলা চাপলেন??? মনে রাখুন। রোজিনারা একা নন… গলা চাপলেও ভালো সাংবাদিকতা গলা ছাড়ে। আরো জোড়ে।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন লিখেছেন, সাংবাদিকতার পেশাগত কর্তব্যরত অনুসন্ধানী সাংবাদিক ‘প্রথম আলো’র রোজিনা ইসলামকে এক্ষণই মুক্তি দিন। এটা খুব অ্যালার্মিং। তাঁকে সচিবালয়ের একটা ঘরে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে হাসপাতালে না নিয়ে শাহবাগ থানায় নিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। উনি আমাদের ভালো সাংবাদিকদের একজন। তাঁর সম্মানজনক মুক্তি চাই।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী আনিছ লিখেছেন, সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে চরমভাবে হেনস্থা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অপরাধ করেছে, তার পারমিশন না নিয়ে তার ছবি তোলা হয়েছে, ভিডিও করা হয়েছে। এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই৷ প্রয়োজনে মাঠে নামতে প্রস্তুত। আমি সবাইকে এ প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক শেখ আদনান ফাহাদ লিখেছেন, ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে ক্লাসে বাংলাদেশের যে সাংবাদিকের নাম সবচেয়ে বেশি বলি তিনি রোজিনা ইসলাম। প্রায় পুরো ঘটনা আমি এখন জানি, শুধু নথিটা কী ছিল সেটি নিশ্চিত নই। জেনে শুনে আমার পুরো সাপোর্ট রোজিনা আপার প্রতি রইল। আমি বিশ্বাস করি একজন সচিবের গোপন নথি মানেই রাষ্ট্রের গোপন নথি নয়। কারণ অতীতে রোজিনা আপা সচিবদের অনেক দুর্নীতি সামনে এনেছেন। এই ঘটনায় কী নথি আপা হস্তগত করেছিলেন সেটি আমি কিছুটা আঁচ করতে পারলেও বিস্তারিত জানি না। করোনাকালে স্বাস্থ্যখাতে সরকার বা একটি মন্ত্রণালয় কী করছে সেটি জানতে সাংবাদিকতা করতে হবে কেন?

সচিবালয় থেকে ব্রিফ করেই সেটি জানানো উচিত। স্বাস্থ্যখাতে আমলাদের দুর্নীতি সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানে। আমলা মানে এডমিন ক্যাডার শুধু নয়। এখন রোজিনা আপার সাথে যা করা হল সেটি কি সচিবের দফতর অন্যভাবে ডিল করতে পারত না? এভাবে আটকে রেখে, জোর করে উনাকে সার্চ করে কেন একজন নারী সচিব একজন সাংবাদিককে চাপে ফেলে, চেপে ধরে অসুস্থ করে ফেলবে? এরউপর জিডি করে থানায় নিয়ে যাবে? এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সচিবালয় পক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না, বলা যায় সঠিকভাবে হ্যান্ডল করতে পারল না। ফলে মানুষ রোজিনা আপার প্রতিই সাপোর্ট জানাচ্ছে। আমিও রোজিনা আপার মুক্তি দাবি করছি।

কল্লোল মোস্তফা লিখেছেন, সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট এর ৩ ও ৫ ধারা এবং দন্ডবিধি ৩৭৯ (চুরি) ও ৪১১ (চুরির মালামাল গ্রহণ করা) এর ধারায় মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবালয়ের কি এমন তথ্য রোজিনা ইসলাম সংগ্রহ করেছিলেন যার জন্য সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গ ও চুরির অভিযোগ করা হলো? সরকারি নথির তথ্য জানা জনগণের অধিকার। সরকারি দপ্তর থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করাকে চুরি বলে মামলা করা জঘণ্য কাজ। বাংলাদেশে অনুসন্ধানি সাংবাদিকতা করা যে কত কঠিন হয়ে গেছে, এই ঘটনা তার একটা দৃষ্টান্ত।রোজিনা ইসলামকে মুক্তি দিতে হবে এবং তিনি যে নথির তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে চুরির অভিযোগের আটক হলেন সেই নথি এখন হুবহু প্রকাশ করার দাবি তোলা জরুরি।

স্ট্যাম্পফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক তপন মাহমুদ লিপন লিখেছেন, বাংলাদেশ রোজিনা ইসলাম মাপের রিপোর্টার খুব কম আছেন। মাত্র কদিন আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ নিয়ে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির রিপোর্ট করেছিলেন তিনি। সেই মন্ত্রনালয়ে আজ তাকে ৫ ঘন্টা আটকে রাখার পর কিছু ডকুমেন্টর ছবি তোলার অভিযোগ এনে মামলা করার চেষ্টা চলছে।ওই ফাইলেও নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা বের হলে অনেকের দুর্নীতি বের হয়ে আসতো। রোজিনা আপার নামে মামলা করার আগে ওই ফাইল জনসমক্ষে নিয়ে আসুন। দেখান না কিসের ছবি তুলেছিলো? দুর্নীতির তথ্য জনস্বার্থে যে কোনভাবে তুলে আনা সাংবাদিকের কাজ। এটা করতে পারাই তার সাফল্য ! রোজিনা আপাকে হেনেস্থা করে ফাঁসানোর চেষ্টা যারা করছেন, তাদের জন্য নিন্দা! তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি! আর এক্টা কথা, সময় আসবে, রোজিনা আপাকে সামলাতে পারবেন তো? অসৎ দুর্নীতিবাজরা সাবধান!

সময় টিভির বার্তা প্রধান তুষার আবদুল্লাহ লিখেছেন , সচিবালয় বা দফতরে রিপোর্টিং করেছি যারা, খবর সংগ্রহের বিস্ময়কর কৌশল আমাদের জানা ।যারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তারা এতে অপরাধ দেখতে পারেন । দেশের প্রভাবশালী ও দক্ষ আমলাদের টেবিল থেকে কতো কাগজ সরিয়েছি । রিপোর্ট প্রকাশ পেলে ভৎসনা নয়, পেয়েছি বাহবা। যা ঘটছে তা যোগ্যতার অবনমনের উদাহরণ মাত্র।

/হুমায়রা

সর্বশেষ

Leave a Reply