‘সেই অসমাপ্ত আলাপ আর শেষ হলো না স্যার’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ একজন ‘শ্রেষ্ঠ’ শিক্ষককে হারালো৷ ‘শ্রেষ্ঠ’ এই অর্থে রাশীদ মাহমুদ স্যারের কোর্সে নৃবিজ্ঞানকে যেভাবে বুঝেছি, অন্য শিক্ষকদের কোর্সে তা এতোটা পারিনি। হয়তো এটা আমারই অপারগতা৷

মনে পড়লো, বিগত দশকের শুরুর দিকে সেই প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা শিক্ষকের মুখ, ভার্সেটাইল, সুদর্শন। প্রথম বর্ষেই স্যারের একটা কোর্স পেলেও কিছুদিন পর সে কোর্স অন্য কাউকে দে য়া হয়।

এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা। অনার্স চতুর্থ বর্ষে এসে স্যার আমাদের লিঙ্গুইস্টিক অ্যানথ্রপোলজি কোর্স নেবেন। সাকুল্যে নয়জন মাত্র কোর্সটা নিলাম৷ দশ জনের নিচে হলে কোর্স কন্টিনিউ করা যাবে না, অফিস আদেশ। তবুও আমাদের আগ্রহ দেখে স্যার কোর্সটা নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।

মনে পড়ে, শেষ বিকেলের সেই প্রচ্ছন্ন আলোয় কলা ভবনের ৩০৫৪ নম্বর কক্ষে স্যার আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন নৃবিজ্ঞানের নতুন এক দিগন্তের সঙ্গে। আমরা স্যারের ক্লাস শুরুর আগে সাউন্ড বক্সে গান ছাড়তাম।

একটা ক্লাসও যে উৎসব মুখর হতে পারে, একটা ক্লাসের জন্যেও যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা যায় সেই প্রথম শিখেছিলাম। নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রতি এক প্রকার বিতৃষ্ণাই ছিল৷

বলতে দ্বিধা নেই, একমাত্র রাশীদ স্যারের জন্য সেই আগ্রহ আবার জন্মেছিল। স্যার ও বখতিয়ার আহমেদ ভাইয়ের একটা যৌথ লেখা থেকে উদ্ভুদ্ধ হয়েই অনার্স ও মাস্টার্সে মনোগ্রাফ ও থিসিস করলাম ‘বাংলাভাষায় নারীকে উপস্থাপনে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও ভাষাগত নিপীড়ন নিয়ে’।

গত বছরের ০৯ মার্চ স্যার আমার ‘নারীবাদ ও আমাদের ভ্রান্তিবিলাস’ শীর্ষক একটা লেখা পড়ে মেসেজে লিখেছিলেন, তোমার ” নারীবাদ ও আমাদের ভ্রান্তিবিলাস ” লেখাটি পড়লাম। আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি তোমার লেখায় এটি পরিস্কার যে, নারীবাদ ও নারীবাদের ব্যবহার- দুটোকে গুলিয়ে ফেললে হবে না।

আমারও কথা একই। নারীবাদ একটি অসম্ভব সুন্দর মতবাদ। কিন্তু অধিকাংশেরই সম্যক ধারণা না থাকায় কারও যেমন গাত্রদাহ হচ্ছে, আবার কেউ এটাকে নিজের স্বার্থপরতা জায়েজে কাজে লাগাচ্ছেন।

নতুবা কবির সুমন বেগম রোকেয়াকে নিয়ে লেখা গানে কেন বলবেন যে, “শালীনতা থাক, অবরোধ যাক”।

একই কথা কিন্তু যে কোন ভালো মতবাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইসলাম ধর্ম আর ইসলাম ধর্মের ব্যবহার যেমন এক নয় তেমনি হিন্দু ধর্ম ও তার ব্যবহার এক নয়, এক নয় মার্ক্সবাদ ও তার ব্যবহার।

কিছু উগ্রবাদীর অপব্যবহারে ধর্ম যেমন তার সৌন্দর্য হারায় না ঠিক তেমনি স্তালিনের কারণে মার্ক্সবাদ হারায় না তার মৌলিকত্ব।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়বে কারা। মতবাদে বিশ্বাসীরা। কিন্তু, দুঃখের সাথে লক্ষ্য করি যে, নারীবাদে বিশ্বাসীরা গাত্রদাহবাদীদের বিরুদ্ধে লড়লেও, স্বার্থপরতা জায়েজকারীদের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ নন।

আমরা কি নারীবাদের এলিটিস্ট ব্যবহার নিয়ে কোন আলোচনা দেখি? কর্পোরেট ব্যবহার নিয়ে তেমন কোন প্রতিবাদ করি? সুমনের গানের ইঙ্গিত ধরে বলি, অশালীন ব্যবহার নিয়ে কথা বলি? বলি না।

কারণ, খুব সুকৌশলে বাজার মৌলবাদ নারীবাদের সাম্য, মুক্তি ইত্যাদি মতাদর্শকে গৌণ করে “প্রগতি” নামক একটি এজেন্ডা যুক্ত করে দিয়েছে। ফলে, প্রগতি বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হবার ভয়ে আমরা উপরিউক্ত অপব্যবহারগুলো নিয়ে নীরব থাকি।

ব্ল্যাক ফেমিনিস্টরা কিন্তু চোখে আঙুল দিয়ে নারীবাদের সাদামুখী ব্যবহারের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এরপর, ক্রিটিক্যাল এনগেজমেন্ট যেন থমকে দাঁড়ালো।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখতাম আমাদের মফস্বলের বন্ধুরা হলে সিট পাওয়ার আগ পর্যন্ত চাচা বা মামার বাসায় থাকতো। চাচারা বা মামারা তখন সিদ্ধান্তের মালিক, ফলে চাচীদের বা মামীদের (যদিও তারা কারও ফুফু বা খালা) আত্মীয়দের জন্য জায়গা সংকুচিত।

বিশ্বাস করবে কিনা জানি না। এখন আমার শিক্ষার্থীদের দেখি ফুফু বা খালার বাসায় থাকছে। ফুফা বা খালুর (যদিও তারা কারও চাচা বা মামা) আত্মীয়দের জায়গা সংকুচিত।

অর্থাৎ, পুরুষ যে ঘৃণ্য, স্বার্থপর সংকোচনের নীতি এতকাল পরিগ্রহ করে এসেছে, আজ কিছু নারী তাঁর অধুনালব্ধ ক্ষমতার সেই একই ব্যবহার করছে। মুদ্রার  এপিঠ-ওপিঠ। জানি না, এসব নিয়ে সবাই মিলে কথা বলা যাবে কিনা।

কর্পোরেট অপব্যবহারের একটি নমুনা নিচে দিলাম। এপেক্স নারী দিবসে একটি ভিডিও দিয়েছে। সেই প্রচেষ্টাকে অসম্মান করে এক গাত্রদাহবাদী একটি কমেন্ট করেছে।

এপেক্সের অটোরেসপন্স সিস্টেম ওই ব্যাটাকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছে!!! প্রস্তাব হচ্ছে, নারীবাদে বিশ্বাসীদের এই কর্পোরেট অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। আমি জ্ঞানজগতে সংশ্লিষ্টদের কথা বলছি না, আপামর বিশ্বাসীদের কথা বলছি।ভালো থেকো।

এরপর দীর্ঘ আলাপ হলো ওই একই বছরের সেপ্টেম্বরে৷ প্রায় আধা ঘন্টার সে আলাপে উঠে এলো কতো কিছু। কতো পরিকল্পনার কথা জানালেন। জানালেন কতো ইচ্ছের কথা।

আজ এইতো একটু আগে ফেসবুক মারফত জানলাম স্যার চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো খুব। এমন প্রাণবন্ত একজন মানুষের মৃত্যুর সংবাদে শূন্য হয়ে যাচ্ছি।

যোগাযোগ নিভে যাওয়া এ সময়ে, এই ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক সময়ে সেই অসমাপ্ত আলাপ আর শেষ হলো না স্যার।

হয়তো কোনো একদিন, অন্য কোনো জীবনে, মহাকালের অসীমে বিশ্বব্রহ্মান্ডের সাথে মিলে যেতে যেতে আবার দেখা হবে আমাদের। আবার জমবে মেলা ৩০৫৪ নম্বর কক্ষে জীবনের বিপুল আয়োজনে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশিদ মাহমুদ আজ সাতক্ষীরায় স্ট্রোক করে মারা গেছেন। তিনি সেখানে গবেষণার মাঠ পর্যায়ের কাজ করছিলেন। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেসবুকে লেখাটা লিখেছেন তাঁর প্রাক্তন শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী রাব্বী আহমেদ।

সর্বশেষ

1 COMMENT

  1. unpredictable and unrecoverable loss and unrepairable pain for the family members, relatives, colleagues, students friends, society, country and the nation!!!!

Leave a Reply