Monday, January 25, 2021

হিউমার, সংলাপ, কাহিনী কোথায় নেই হুমায়ূন!

জুবায়ের আহাম্মেদ

“আমি এ সমস্ত রোগ-ব্যাধি-অসুখকে জীবনে কোনোদিনই পাত্তা দেইনি। এখনো দিচ্ছি না। যেটা হওয়ার, হবেই। এটা নিয়ে হা-হুতাশ করে দুনিয়া মাতানোর তো কিছু নাই, আমি কিছু মাতাচ্ছি না। আমার ধারণা, আমি ভালোই আছি। আবার আমেরিকায় ফেরত যাব।”
.
কে জানতো হাসিমুখে ফেরত যাবার কথা বলে লোকটা চিরদিনের জন্য চলে যাবে? মৃত্যু নিয়ে অনেকে অনেক কিছু লিখেছে। হুমায়ুন আহমেদের মত কজন লিখেছে?
“চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়” এই লেখাটা লিখতে একজন মানুষকে খুব শক্ত হৃদয়ের হতে হয়।

একজন মানুষকে “বড়জোর আর দুই বছর বাঁচবেন” এটা শুনে বেশ শক্তপোক্ত ধাক্কা খেতে হয়।
কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ বলেই কিনা, এসব গায়ে লাগেনি। বারবার মৃত্যু নিয়ে ভেবেছেন।

এইসব দিনরাত্রি থেকে জীবনের শেষ দিন… সবসময় জানতে চেয়েছেন “মানুষের আয়ু কেন মাত্র ৭০/৮০ বছর?”
.
জন্ম তার ১৯৪৮ সালের এই দিনে নেত্রকোণা জেলায়। বাড়ির বড় ছেলে। বাবা মা নাম রাখলেন কাজল। পুরো নাম হুমায়ূন আহমেদ। ছাত্র হিসেবে বেশ মেধাবীই বলা চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগ থেকে চমৎকার রেজাল্ট করে বেরিয়েছেন।

অনেকটা রূপকথার মত নাটকীয়তা শেষে বিয়ে করেছেন গুলতেকিন নামের একজন মায়াময় নারীকে। ছিলেন নিজ বিভাগেরই শিক্ষক হয়ে। এরপর তার জীবন এভাবে চলে গেলে আজ হয়ত এভাবে লিখতে পারতাম না।

পিএইচডি নেবার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলেন। পিএইচডি-ধারী শিক্ষক থেকে এর পরের যাত্রা একেবারেই অন্যরকম। বলা চলে স্বাধীন বাংলাদেশের মুকুটহীন সাহিত্য সম্রাটের জীবন।

শুরুটা নন্দিত নরকে উপন্যাস দিয়ে। এরপর থেকে কলমের যাত্রা আর থামেনি। খুব বেশি অর্থবিত্ত ছিল না। দুই মেয়ে টিভি দেখতে যেতো পাশের বাড়িতে। মেয়ের টিভি দেখার জন্য সেবা প্রকাশনীতে অনুবাদ আর নাটক লেখার শুরু।

“এইসব দিনরাত্রি” নাটক যখন দেশে তুমুল জনপ্রিয়, তখনই আচমকা বন্ধ করে দেয়া হলো। কারণ ততদিনে মেয়ের বায়না মেটানোর টাকা চলে এসেছে। তাতে কে রাগ করলো, কে অভিমানী হলো হুমায়ূন আহমেদ ফিরেও দেখলেন না।

এরপর হিমু, মিসির আলী কিংবা শুভ্র। উপন্যাসের জগতে রাজত্ব করেছেন বিভিন্ন বেশে। লিখেছেন “এইসব দিনরাত্রী”, ” বহুব্রীহি” কিংবা “কোথাও কেউ নেই” এর মত কালজয়ী সব নাটক।

বন্ধু আনিস সাবেত আজীবন সিনেমা বানাবেন চিন্তা করতে করতে একসময় মারাই গেলেন। হূমায়ুন আহমেদ ভাবলেন প্রয়াত বন্ধুর স্বপ্ন পূরণ করবেন। মাঝরাতে আচমকা মেয়েকে ডেকে বললেন, “মা, আমি সিনেমা বানাবো।”

এরপর আনাড়ি হুমায়ূন আহমেদ তৈরি করলেন আগুনের পরশমণি। কাহিনী, পরিচালনা দুটোই তার। হাতে এলো জাতীয় চলচ্চিত্রের পুরষ্কার।

রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের পর ওপাড়ে যদি সবচেয়ে জাদুকরী ক্ষমতার মানুষটা হন সত্যজিৎ রায়, এপাড়ের জন্য তাহলে হয়ত সেটা হুমায়ূন আহমেদ এবং জহির রায়হান।

চলচ্চিত্র, নাটক, সিরিজ সব তো দেখলেন… কেউ কি কখনো বলতে পারবে, কেবল নাটকের একটি চরিত্রের জন্য রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে? হ্যাঁ! পারবেন। সেটাও ঐ হুমায়ূন আহমেদের কল্যাণে। হালের নাট্য নির্মাতাদের এই মানুষটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, নাটকটা পর্দার হলেও সেটা বাস্তবেও সত্য হতে পারে।

এদেশের তরুণদের রাত জেগে যিনি জোছনা দেখতে শিখিয়েছেন। চিনিয়েছেন খালি পায়ে হাঁটার আনন্দ কিংবা বর্ষার মুগ্ধতা।

আর সবকিছু ভুলেই যান, বর্তমানে বাংলাদেশের কেউ হয়ত বলতেই পারবেন না, তিনি হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়েননি। মিসির আলি, হিমু, শুভ্র, আনিস, রূপা, বাকের ভাই, মুনা… প্রত্যেকেই আমাদের অতি আপনজন।

বর্তমান বাংলাদেশের যত লেখকই থাকুন না কেন, তাদের সবাইকে কোথাও না কোথাও মোহের মত আটকে রেখেছেন এই মানুষটা। নতুন বই খুললেই আজও মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদ অনেকটা এভাবেই লিখতেন।

হিউমার? সংলাপ? কাহিনি? চরিত্র? যেটাই বিশ্লেষণ করা হোক, হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। তবে হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় জাদুটা সম্ভবত আমরাই।

যারা আজও বইমেলায় গিয়ে তাকে খুঁজি। কোন একটা স্টলের শীর্ষে তার ছবি দেখে একবার হলেও আক্ষেপ করে বলি, ইশ! এই মানুষটা আজ আর নেই।

বাংলাদেশের এবং বাংলা সাহিত্যের এই কিংবদন্তী মানুষটির জন্মদিন আজ। রসায়নের যে মানুষটা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন নিজের আলোয়, গড়ে দিয়েছেন এক অন্য ভুবন।

তাকে নিয়ে কথা শেষ করবো। তারই স্কুল জীবনের একটা কবিতা দিয়ে, “Let the earth move/ Let the sun shine/ Let them to prove/ All are in a lie.”

সর্বশেষ

Leave a Reply