শিক্ষার্থীর চুল কেটে দেওয়া; অতীত ও বর্তমান

সময়টা তখন প্রাইমারি স্কুলের। একজন অতি প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। নাম ছিল নিধু স্যার। স্যার প্রতি রবিবার আমাদের সবার নখ দেখতেন, ছোট আছে কি না। চুল দেখতেন বড় হয়েছে কি না, এবং পরিপাটি কি না। মাথায় তেল দেওয়া আছে কি না, নাকি উষ্কখুষ্ক।

এসব ঠিক না থাকলে তার শাসন করার ধরনটা ছিল ভিন্ন। আমাদের মাথার সাথে তার মাথায় বেশ সজোরে একটা ঠুনি দিতেন। আমাদের মাথা তো তখন এতটা শক্ত না। আমরা বেশ ব্যথা পেতাম। আর ঠুনি খাওয়ার ভয়ে আম্মুর কাছ থেকে শুক্রবার হলেই নখ কেটে নিতাম।

সেই থেকে প্রতি শুক্রবার নখ কাটার অভ্যাসটা এখনও আছে। কয়েকবার এমন হয়েছে যে, ভুলে মাথায় তেল না দিয়ে স্কুলে চলে গেছি। ঠুনি খাওয়ার ভয়ে আবার বাড়ি ফিরে মাথায় তেল মেখে তারপর আবার স্কুলে গেছি। আমার সেই শিক্ষক আমার কাছে আজও সবচেয়ে বেশি প্রিয়।

প্রাইমারি স্কুল ছেড়ে এরপর মাধ্যমিকে ভর্তি হলাম। এই সময়টাতে কিছুটা দুরন্তপনা, দুষ্টমি ও আবেগের সংমিশ্রণ থাকে সবার মধ্যে। আমার মধ্যেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। মনে হত যদি ফ্লিমি স্টাইল করে চুল কাটতে পারতাম, যদি একটু জিন্স প্যান্ট পরে ইয়ো ইয়ো ভাব নিতে পারতাম!

একদিন একটু স্টাইল করে চুল কেটে ভয়ে ভয়ে বাসায় গেলাম। বাসায় পৌঁছানোর পর আব্বু বললো আজ তোর বাসায় ঢোকা নিষেধ, এমনকি বাসায় ভাত বন্ধ। আমি সেলুনে গিয়ে একদম ছোট করে চারদিকে সমান করে চুল কেটে আসলাম। আব্বু তখন আমাকে আদর করে খাওয়ায়ে দিল।

মাধ্যমিকে একজন প্রিয় শিক্ষকের নাম বি ডি বিশ্বাস। স্যার আমাকে আদর করে জানোয়ার বলে সম্বোধন করতেন। আমারও খুব ভাল লাগতো। এই যেমন, ‘এই জানোয়ার এত সহজ ম্যাথটা পারলি না কেন! এই জানোয়ার স্কুলে আসতে দেরি করলি কেন!’ স্যারের কাছে তার বাসায় সকালে ম্যাথ প্রাইভেট পড়তাম। প্রতিদিন কমপক্ষে ৮/১০ বার জানোয়ার কথাটা স্যারের মুখে না শুনলে ভালো লাগতো না।

বেশ কিছুদিন চুল না কাটার কারণে চুলগুলো একটু বড় আর এলোমেলো দেখাচ্ছিল। স্যার বললেন, এই জানোয়ার তোর চুল এত বড় কেন! চুল না কেটে আমার বাসায় আর আসবি না। পরদিন চুল না কেটে আবার গেলাম স্যারের বাসায়। ম্যাথ সমাধান করছি, এর মধ্যে হঠাৎ কাঁচির ঘ্যাচাং শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথার সামনের চুল নাই হয়ে গেল।

এরপর দ্বিতীয় ঘ্যাচাংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে স্যার, আমিও হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কাঁচির পোচটা ঠিক হাতের উপর দিয়ে গেল। রক্তে ভেসে গেল স্যারের বারান্দা।

স্যার আমাকে নিজে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেন এবং বললেন সারা জীবন মনে থাকবে আজকের দিনটা, আর কখনও চুল বড় রাখতে পারবি না। আমার হাতে সেই কাটা দাগটা এখনও আছে। স্যারের সাথে দেখা হলেই দেখতে চায় দাগটা কেমন হয়েছে। তখন অবধি এখনও তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক।

চুল কেটে দেওয়া সেই শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত

‘লুঙ্গি পরে’ পরীক্ষা দিতে বসা শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার

এতো কেবল দুটো ঘটনা মাত্র, এমনটি আরও রয়েছে অনেক। আগের প্রজন্মের সবারই কম বেশি আছে এমন অভিজ্ঞতা। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এমনটি প্রাথমিক বা মাধ্যমিকেও শিক্ষকরা করতে পারেন না, বা করেন না। সেটার নানাবিধ যৌক্তিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। স্তর ও সময় ভেদে শিক্ষাদান ও শাসনের সামঞ্জস্যতা থাকা জরুরি।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের শাসন করার প্রক্রিয়া এক নয়। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক মধুর সম্পর্ক। ছাত্র ও শিক্ষক উভয়ের আত্নমর্যাদা যথাযথ বজায় থাকাটা এই মধুর সম্পর্কের নিয়ামক।

ভাল থাকুক আমার সকল প্রিয় শিক্ষক। আমি শিক্ষকের সব শাসনকে সবসময় আশীর্বাদ হিসেবে নিয়েছি। আর এটা আমার বাবা মায়ের শিক্ষা।

লিখেছেন: জনি আলম, শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বশেষ

Leave a Reply