‘যাকে বেশি ভালবাসবে, তাকে বিয়ে করবে না কোনোদিন’

  • খুজিস্তা নূর ই নাহরিন
আজ তোমার ৫৮ তম জন্মদিন। কিন্তু ১০ বছর আগে ৪৮ বছর বয়সেই তো সময় তোমার জন্য থেমে গেছে, তাই সময় যতই বাড়ুক বয়স বাড়বে না আর ।
যতবারই তোমার কথা ভাবি মনে হয় কি ভীষণ মন্দ কপাল নিয়েই না জন্মেছিলে তুমি। মাত্র ৪ বছর বয়সে পিতৃহারা পুত্রের হৃদয়ে একজন পিতার ভালোবাসার জন্য, মাথার উপর স্নেহের সুশীতল ছায়ার জন্য ভিতরে ভিতরে কি ভীষণ আর্তনাদই না ছিল তোমার। অথচ অন্য সবাই তোমার ছায়ায় থাকতে চাইতো।
আপাদমস্তক সেলফলেস মানুষ অথচ তোমার সরল বিশ্বাসের সাথে কেবলই প্রতারণা, বেইমানী ।
জীবিত টিংকুকে নিয়ে এতো টানাটানি অথচ মৃত্যুর পর আজ কোথাও কেউ নেই।
সবসময় বলতে,’ ‘আমার জন্ম কেবল স্ত্রী, সন্তান, সংসারের জন্য তো নয় মানুষের জন্য অনেক কাজ পরে আছে।’
আজ কোথায় সেই মানুষ ?
এপির মৃত্যুকে ঘিরে কি দুঃসহ যন্ত্রণা আর অপরাধবোধই না তোমায় তাড়িয়ে বেরিয়েছে আজীবন। কত রাত ঘুম ভেঙ্গে কেবলই নিষ্পাপ শিশুর মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না । অসহায় আমি সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র।
মৃত্যু অতি সন্নিকটে জেনে ছোট্ট দুই সন্তানকে একা ডেকে বলে গেলে, ‘যাকে বেশী ভালবাসবে তাঁকে বিয়ে করবে না কোনদিন।’
বড়টার বয়স তখন ১৫ ছোটটার ৮ । চরম নৈরাশ্য হতাশা অসহায়ত্ব বুঝার বয়স তখনও হয়নি ওদের। লজ্জা দ্বিধায় ওরা হাসপাতালের রুম থেকে বেড় হয়ে আমার সাথে চোখ মিলাতে পারছিল না।চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল না জানি কি ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছে।
অভিমানী ছেলেটা বলে উঠল, ‘আব্বু তোমাকে ভালোবাসেনি আম্মু।’ আমি বললাম সংসার করার জন্য এতো বেশী ভালোবাসা বাসির প্রয়োজন নেই দুজনের মাঝে বুঝাপড়াটাই আসল। তাছাড়া ভালোবাসারও রকম ফের আছে। তোমাদের বাবা আমাকেও ভালোবাসে সেই ভালোবাসা হচ্ছে আস্থা, বিশ্বাস আর নির্ভরতার।
এই বোকা লোকটা জানলই না আমি কত সুন্দর করে কথা বলতে পারি। বিয়ের ১৪ বছর পর যখন দাম্পত্য নিয়ে আমার সমস্ত কৌতূহল, চাওয়া-পাওয়া, হিসেব নিকেশ শেষ করে নিজের ক্যারিয়ার বেবসা আর কেবলই সন্তান নিয়ে ব্যস্ততা, তখন একদিন হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি যা বল তাই সত্য হয়, তোমার এই বুদ্ধিমত্তার উৎস কি বা কে ?’
হেসেই আমার লুটোপুটি হওয়ার অবস্থা ! ১৪ বছর পর আসছে খোঁজ নিতে, আমাকে বুঝতে, আমাকে জানতে ???
সেই হাসিতে ভর্ৎসনা নাকি তিরস্কার ছিল জানা নেই ।
টিংকু ভীষণ লজ্জা পেলো, সলজ্জ হাসিতে চোখ সরিয়ে নিয়ে অপরাধবোধ নাকি অপারগতাকে আড়াল করলো। শুরু থেকেই তুমুল আড্ডা প্রিয়, বন্ধু বৎসল, কাজের মাঝে ডুবে থাকা, ভীষণ ব্যস্ততায় নিজেদের মধ্যে কথা না বলতে বলতে একসময় আমিও কথা বলার আগ্রহটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনের ভাব আদান প্রদানের জন্য সবসময় কথা বলারও বোধ হয় প্রয়োজন পরে না, আমার নীরবতা, তাকানো, চোখের ভাষা কিংবা হাসি দেখেই ও’ আমাকে বুঝে নিতো ।
আর কি নিয়েই বা কথা বলবো তাঁর সাথে, সপ্তাহের ৪ দিন থাকে চট্টগ্রামে বাকি তিনদিন ঢাকায়। রাত ১২ টায় বাসায় ফিরে মোবাইল ফোনে কথা বলতেই থাকে। কোনোদিন আগে ফিরলে ঘরভর্তি লোকজন। ভোরে ঘুম থেকে উঠার আগেই মানুষ এসে ভরপুর। সকালের নাস্তার টেবিলে আমি সে ছাড়াও অন্য চেয়ারগুলো পূর্ণ।
পুরো ঘরের দায়িত্ব, মেহমান, বাচ্চাদের পড়াশুনা, অসুখ, লালন-পালন,খেলা-ধুলা, আবদার সবই একা আমার সাথে। সে জানতো এসবে কোন ঝুট-ঝামেলাই নেই। কারণ এসব নিয়ে কোন অনুযোগ বা অভিযোগ তাঁকে শুনতে হত না কোনোদিন ।
অন্য কেউ যখন এসব নিয়ে কথা বলত সে ভীষণ আহত হতো, আমায় তাঁদের জীবনের কষ্টের কথা বলত আর আমি হাসতে থাকতাম। সেই হাসিতে বিদ্রূপ মিশ্রিত প্রশ্ন থাকত হয়তোবা নতুবা পরে আর বলতো না। (প্রশ্নঃ তুমি এসব শুনা বা কথা বলারও সময় পাও, কি করে ?)
সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুজনের দাম্পত্যে অনেক জায়গায় আপোষ করে মানিয়ে নিতে হয়। দাম্পত্য মানে কেবল সুখের বিছানা নয় সেখানে মতানৈক্য থাকে বৈরিতা থাকে। দুজন একরকম মানুষের মাঝে চরম মিল নতুবা সংঘর্ষ। আবার ক্ষেত্র বিশেষ বৈসাদৃশ্যও আকর্ষণ বাড়ায়।
দুই বাচ্চা, সংসার আর অফিসকে ঘিরে নিজের জগত গড়ে নেই ।মাঝে মাঝে ডায়রি লিখি। নিজের সাথে নিজের আলাপন, এই লেখাই আমার সঙ্গী, আমার আনন্দের উৎস।
মাঝে মধ্যে তাঁর সহজ সরল স্বীকারোক্তি, ‘রাজনীতির জন্য কেবলই এই বিয়ে আর সংসার।’
আমার চরম ক্ষোভ, ‘অভাগা আমিই কেন ?’ কিন্তু মুখে কিছু বলি না, সময়টাকে, একাকীত্বটাকে উপভোগ করি।
এমন স্ত্রী-সন্তান-সংসারের জন্য মানুষের তৃষ্ণা থাকে অথচ বেচারা বুঝতেও পারলো না সে কতোটা ভাগ্যবান ছিল ।
এতো রূপ, এতো মেধা, এতো উচ্ছল, উদ্যমতা, নির্ভীক, প্রচণ্ড সাহস আর প্রাণশক্তি নিয়ে জন্মেছিলে অথচ সবচেয়ে আসল ‘সময়’ টাই তো পেলে না।
এতো ব্যস্ততা, এতো আয় উপার্জন এসবের লাভবান সন্তান তো নয় তবে কারা ?
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বস্ত এবং ভরসার মানুষ কথিত পুত্র ‘কালা’ এখন কোথায় আছে ?
আমার বিয়ের পর পরেই যেদিন আমাদের বিছানায় টিংকুর বুকে জড়িয়ে ধরা ‘কালা’ কে দেখেছিলাম ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। টিংকু আমায় বুঝিয়ে বলেছিল ছোট্ট বয়সে মাতৃ পিতৃহীন কালা তাঁর সমবয়সী হলেও সন্তানতুল্য, তাঁর ভীষণ আদরের। ৪ মাস পর কালাও বিয়ে করে।
মৃত্যুর আগে টিংকুর হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছিল, ‘কালা যা বলবে তাই শুনতে হবে।’
প্রতিজ্ঞার কথা রেখেছি। সব টাকা নেওয়া শেষ করার পর কালা টিংকুর নিজের সন্তানদের সবখান থেকে ব্লক করে দিয়েছে, সৌজন্য বোধে ন্যূনতম যোগাযোগ রাখারও প্রয়োজন অনুভব করেনি।
তবে প্রতি পদে বুঝি টিংকুর কৃত ভালো কাজগুলো ‘দোয়া’ হয়ে তাঁর সন্তানদের সঙ্গে আছে, তাঁদের আশ্রয় দিচ্ছে।
চেষ্টা করেছি সন্তানদের পিতার অভাব ঘুচিয়ে দিতে কিন্তু কি করে সম্ভব ! দুই সন্তানের হৃদয়েই পিতার জন্য হাহাকার, শূন্যতা আজীবনই বয়ে বেড়াতে হবে।
প্রতিটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত। আমার ভাগ্য আর ভবিষ্যৎ একমাত্র তিনিই জানেন, তাই আমাকে জীবন যুদ্ধে একাকী লড়ার জন্য তৈরী করে নিয়েছেন।
আর টিংকুর জন্য পূর্ব নির্ধারিত সময় কেবলই ৪৮ বছর। সেই সময়টুকুই সে পেয়েছে, আমাদের কান্না আহাজারির কোন মানে নেই।
বাবার মৃত্যুর পর ছোট্ট শ্রেয়াকে যখন একজন জিজ্ঞেস করছিল ‘তোমাদের মন খারাপ লাগে না বাবার জন্য?’ প্রত্যুৎপন্নমতি শ্রেয়া উত্তর করেছিল ‘তোমার বাবা মারা গেলে তখন বুঝতে পারবে।’
বুঝে নিয়েছিলাম স্বল্পভাষী, বিলাপ হীন আমি মূলত তাঁদের হতাশ করেছি।
পিতার মৃত্যু নিয়ে অতিরিক্ত কান্নাকাটি মানে কোমলমতি সন্তানদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করা। তা ছাড়া দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, শোক দেখাতে হবে কেন ?
সর্বাবস্থায় বলি ভালো আছি । কৃতজ্ঞতা তাঁর সমস্ত কিছুর প্রতি।
প্রতিটি জন্মই শুভ, হোক তা ক্ষণিকের তরে। প্রতিটি জন্মের পেছনে কোন না কোন উদ্দেশ্য থাকে। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে সেই উদ্দেশ্যের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তুমি স্রস্টার কাছে ফিরে গেছো ।
ওপারে ভালো থেকো প্রিয় টিংকু।
শুভ জন্মদিন।

খুজিস্তা নূর ই নাহরিন পূর্ব পশ্চিম অনলাইন মাধ্যমের সাবেক সম্পাদক। তাঁর অনুমতি নিয়ে লেখাটি প্রকাশ করা হলো।

সর্বশেষ

Leave a Reply