ইউক্রেনের ডায়েরি: ‘ভাবতে পারিনি বেঁচে ফিরবো’

আমার মেয়ে পুতুল ও খেলনাগুলো দিয়ে তার ব্যাকপ্যাক ভর্তি করেছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘সামিরা, কী করছো তুমি?’ জবাবে সে বলেছিল, ‘মম, আমার এগুলোকে প্রয়োজন।’

৩৫ বছর বয়সী জাখিদা এদিলোভা, ক্রিমিয়ান তাতার ও জাতিতে মুসলিম সংখ্যালঘু। পেশায় তিনি একজন ভাষা শিক্ষক ও একটি রাজনৈতিক টকশোর প্রযোজক। বসবাস করতেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে।
১৯৪৪ সালে জোসেফ স্ট্যালিনের আদেশে জাখিদা এদিলোভাদের নিজ মাতৃভূমি ক্রিমিয়ান উপদ্বীপ থেকে উজবেকিস্তানে জোরপূর্বক নির্বাসিত করা হয়েছিল।
 নির্বাসন শেষে ১৯৯৩ সালে জাখিদা তার পরিবারসহ ইউক্রেনের ক্রিমিয়ায় ফিরে আসে৷ কিন্তু  ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে চলে যায় ক্রিমিয়া৷ তারপর তাকে এবং তার মেয়েকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কিয়েভে। সেখানে একবছর পর জাখিদার মা এসে যখন আবার নতুন করে গোছাতে শুরু করেছে সব, তখনই তারা আবার রাশান সৈন্যদের অস্ত্রের মুখে জীবন বাঁচাতে অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুমে কখনো আবার করিডোরে আশ্রয় নিয়েছে৷
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় থেকে জাখিদা তার সাথে একটি ডায়েরি রাখেন। সেখানে তিনি লিপিবদ্ধ করছেন যুদ্ধের প্রতিটি দিনের বর্ণনা। আল জাজিরার সৌজন্যে সে বর্ণনার কিছু অংশ অনুবাদ করেছেন সারওয়ার রাফি।

দশম দিন: শনিবার, ৫ মার্চ, ২০২২
‘এটাই চলে যাওয়ার সময়’
ভোর ৫.৪৫ মিনিট। আমি খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠেছিলাম। কারণ কিয়েভে কীভাবে আমি মানিয়ে নিচ্ছি এবং কী করার পরিকল্পনা করছি এ নিয়ে শিকাগোভিত্তিক একটা সংবাদ সংস্থায় আমার লাইভ সাক্ষাৎকার ছিল। যাই হোক, যখন আমি ঘুম থেকে উঠি তখনই সবকিছুর পরিবর্তন ঘটে গেল। টেলিগ্রামসহ অন্যান্য চ্যানেলগুলোতে আমি বিভিন্ন সংবাদ অনুসরণ  করি।
এগুলোর মধ্যে একটিতে একজন পুলিশ কর্মকর্তা তার দৃষ্টিতে বলছিল, তার মতে কিয়েভের বাসিন্দাদের চলে যাওয়া উচিত। তিনি বারবার সর্তক করছিলেন, যদি আক্রান্ত হয় তবে শহরটি ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়বে। তখন এর বাসিন্দারা যেকোনো সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
তখনই দোকানগুলোতে কিভাবে কিছুই না থাকতে পারে এবং আমার মায়ের যখন চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন পড়বে তখনই বা কী ঘটতে পারে এ নিয়ে আমি ভাবছিলাম। শহরটি যদি ভারী গোলাবর্ষণের মুখোমুখি হয়, তবে কিভাবেই বা আমরা শহরটি ত্যাগ করবো?
আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরোটা দিন হতাশায়, কেঁদে কাটিয়েছিলাম। ছেড়ে যাওয়া নিয়ে আমি খুবই নিরাশ ও রাগান্বিত ছিলাম। কিন্তু এসব কিছুর মাঝে আমার মেয়ে, মা ও নিজেকে নিয়েও ভাবার প্রয়োজন ছিল।
অনলাইনে আমি এক মনোবিদের সাথে  কথা বলেছিলাম। সে আমাকে বলেছিল, আমি থাকি অথবা চলে যাই আমাকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি জানতাম, আমাকে কী করতে হবে। এটাই উপযুক্ত সময় চলে যাওয়ার।
নয়টা বাজে। আমার ইউক্রেনীয়ান বান্ধবী এবং তার স্বামী-যারা কি না আক্রমণের শুরু থেকেই ডেনমার্কে আটকে আছে- তারা আমাকে বার্তা পাঠাল, তাদের সাথে গিয়ে থাকতে। আমার বহু বন্ধু যারা ইউক্রেনের বাইরে ছিল, তারা আমাকে ও আমার পরিবারকে আতিথেয়তা জানাল।
কিন্তু এখনকার জন্যে, আমাকে পোল্যান্ডে যেতে হবে এবং একবার সেখানে পৌঁছালে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারবো, যে সেখানেই আমরা থাকবো নাকি অন্য কোথাও চলে যাব।
এগারোতম দিন: রোববার, ৬ মার্চ ২০২২
‘ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, আমরা পদদলিত হব অথবা আলাদা হয়ে যাব’
সকাল দশটা। আমার মা এবং মেয়ে ঘুম থেকে উঠলো। আমার ৭৫ বয়সী মা খুব কাঁদতে থাকলো। তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন কিছু একটা চলছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আমি কোনো কিছুর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।
আমি তাকে বললাম আমাদের জলদি ত্যাগ করা প্রয়োজন, কিন্তু তিনি তা চাননি। তিনি আমাকে বললেন তিনি এতই বৃদ্ধ যে, তার চলাফেরা করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার এবং আরও বললেন যে তার কিছুই হবে না।
আমি তাকে বললাম আমি তাকে আমাকে সাথে যেতে জোর করছি না। কিন্তু আমি আমার মেয়ের প্রতি দায়িত্বশীল এবং এজন্যে আমাকে যেতেই হবে।
আমি আধঘণ্টার মধ্যে তৈরি হতে বললাম যদি সে আমাদের সাথে যেতে চায়। আমি খুবই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম যে তিনি হয়তো এখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারেন, কিন্তু তিনি তা করেননি।
আমরা তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে নিলাম। যখন রাশিয়া ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে নিল, তখন আমার মাতৃভূমি থেকে জবরদস্তিতে বিতাড়িত হওয়ার পর, আমি কোনো আবেগ ছাড়াই শিখে গিয়েছিলাম আমাকে কোন জিনিসগুলো গুছিয়ে নিতে হবে। আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো নিয়েছিলাম।
আমার কাজের জন্যে ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাঙ্ক, কাপড়চোপড়, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, আন্ডারওয়্যার, কাপড়চোপড় এবং নথিপত্রগুলো। আমি আমার এগারো বছর বয়সী মেয়ে সামিরার জন্যে একটা স্যুটকেস গুছিয়ে দিয়েছিলাম।
আমার মেয়ে পুতুল ও খেলনাগুলো দিয়ে তার ব্যাকপ্যাক ভর্তি করেছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘সামিরা, কী করছো তুমি?’ জবাবে সে বলেছিল, ‘মম, আমার এগুলোকে প্রয়োজন।’
দুপুর দুইটা বাজে। আমরা কিয়েভের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনে পৌঁছালাম। সেখানে বহু মানুষ ছিল। আমি রীতিমতো আবিষ্কার করলাম, কিয়েভ থেকে লভিভের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যেই দুটো ট্রেন ছেড়ে চলে গেছে৷ আমরা ট্রেনগুলোকে মিস করে ফেলেছি তা বুঝতে পেরে খুবই হতাশায় পড়ে গিয়েছিলাম। মানুষেরা সেখানে অপেক্ষা করছিল আর বলছিল, বিকাল পাঁচটা বাজে আরেকটি ট্রেন আসতে পারে।
কিন্তু তখনই ঘোষণা শুনলাম যে অন্যান্য ট্রেনগুলোও পশ্চিমের উদ্দেশ্যে ছেড়ে চলে গেছে। সেখানে মানুষের এত ভীড় ছিল যে আমি তাদের সাথে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ, আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, যদি যোগ দিই তবে হয়তো আমরা পদদলিত হয়ে যাবো অথবা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাব। মানুষেরা চিৎকার করছিল এবং অভিশাপ দিচ্ছিল।
এর কিছুক্ষণ পর, প্ল্যাটফর্ম ৮ থেকে লভিভের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার জন্যে একটি ট্রেনের অপ্রত্যাশিতভাবে ঘোষণা এলো।
আমরা তিনজন সেই প্ল্যাটফর্মের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং জলদিই লাগেজগুলোকে টেনে এনে ট্রেনে গিয়ে উঠলাম। আমরা খুবই ভাগ্যবান ছিলাম ট্রেনে আসন পেয়ে। কারণ প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উপস্থিতিতে ট্রেনটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
যখন ট্রেনটি যাত্রা শুরু করলো, তখন আমার হৃদয় ব্যথিত হয়ে উঠলো। আমি কারো দিকে তাকাতে চাইনি। ক্রিমিয়ার পর আমার বাড়ি কিয়েভ আমি ছেড়ে যেতে চাইনি। আমার মেয়ে ও মা আমাকে নিয়ে চিন্তায় ছিলেন। একঘণ্টা পর আমি হাসতে চেষ্টা করলাম , তারা একটু স্বস্তি পেল। আমাদের কামরায় বহু শিশু ছিল।
আমাদের পাশে বসা মহিলাটি খুব কাঁপছিলেন। তিনি ইরপিন থেকে এসেছিলেন, যেখান সেদিন বহু বেসামরিক লোক নিহত হয়েছিল। সে আমাদের বললো, ‘আমি কখনোই ভাবতে পারিনি বেঁচে ফিরতে পারবো।’

সর্বশেষ

Leave a Reply