খুলেই বন্ধ করে দেওয়া হলো আফগান মেয়েদের স্কুল

আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো খোলার কয়েকঘন্টার মাথায় পুনরায় বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির তালেবান সরকার। বুধবার তালিবান সরকারের মুখপাত্র ইনামুল্লাহ সামাঙ্গানি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অপরদিকে মেয়েদের স্কুল বন্ধের বিষয়ে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র আজিজ আহমেদ রায়ান বলছেন, আমাদের এই বিষয়ে মন্তব্য করার অনুমতি নেই।
তালেবান সরকারের হঠাৎ মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের এমন নির্দেশ আফগান নাগরিকদের মনে হতাশা ও সংশয়ের সৃষ্টি করেছে।
এর আগে বার্তা সংস্থা এএফপির একটি দল রাজধানী কাবুলের জারঘোনা উচ্চবিদ্যালয়ে মেয়েদের স্কুলে ফেরা নিয়ে চিত্রগ্রহণ করছিল, তখনই একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের বলেন, ক্লাস শেষ। এরপর তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো স্কুলে ফেরা মেয়েরা অশ্রুসিক্ত নয়নে বই খাতা গুছিয়ে বাড়ির পথ ধরে৷
মেয়েদের এভাবে বাড়ি ফেরা নিয়ে কাবুলের ওমরা খান গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা পালওয়াশা বলেন, আমি আমার শিক্ষার্থীদের কাঁদতে দেখছি। তারা এভাবে বাড়ি ফিরতে অনিচ্ছুক। তিনি আরও বলেন, আপনার শিক্ষার্থীরা কাঁদছে, এটা দেখা খুব বেদনাদায়ক।
এদিকে স্কুল বন্ধের এমন নোটিশকে ‘বিরক্তিকর’ বলে অভিহিত করে টুইট করেছেন জাতিসংঘের দূত ডেবোরা লিয়ন্স। টুইটে তিনি বলেন, যদি মেয়েদের স্কুল বন্ধের বিষয়টি সত্যি হয়, তাহলে এর কারণ কি হতে পারে?
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে তালেবানরা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন কোভিড -১৯ মহামারীর কারণে স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে কেবলমাত্র ছেলে এবং কিশোরীদের দুই মাস পরে আবার ক্লাস শুরু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
যদিও আশংকা করা হচ্ছিল, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে তালেবান সরকার যেভাবে মেয়েদের সব আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ করে দিয়েছিল, এবারও তাই করবে৷
এদিকে আফগানিস্তানের নতুন তালেবান শাসককে সহায়তা এবং স্বীকৃতির বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার উপরে জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি দেশ এবং সংস্থা দেশটির শিক্ষকদের বেতন দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে।
আফগানিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে বাধাগুলো কোথায়?
মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলগুলো হুট করে বন্ধ করে দিলেও দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, স্কুলগুলো পুনরায় চালু করাটা সর্বদাই সরকারী উদ্দেশ্য ছিল এবং তালেবানরা আন্তর্জাতিক চাপের কাছে মাথাও নত করেনি।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রায়ান গতকাল মঙ্গলবার এএফপিকে বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের দায়িত্বের অংশ হিসেবে আমরা এটা করছি।
যদিও তালেবান সরকার চাচ্ছে, তাদের ১২ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুল করতে এবং সেগুলো ইসলামিক নীতি অনুসারে চালাতে৷
অপরদিকে তালেবানরা নারীদের উপর বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ইতোমধ্যে নারীদের অনেক সরকারি চাকরি থেকে নিষিদ্ধ করেছে। তাদের পোশাক ঠিক করে দিচ্ছে, শহরের বাইরে একা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইতোমধ্যে তারা বেশ কয়েকজন নারী অধিকার কর্মীকে আটকও করেছে।
আবার আফগানিস্তানে মেয়েদের স্কুলগুলো পুনরায় যদি চালু হয়, তবুও মেয়েদের শিক্ষায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে বাধা রয়ে গেছে। কারণ, অনেক পরিবার তালেবানদের সন্দেহ করে এবং তাদের মেয়েদের বাইরে যেতে দিতে অনিচ্ছুক।
তাহলে আফগানদের ভবিষ্যৎ কি হবে?
দারিদ্র্য বা সংঘাতের কবলে আফগান শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবছর শেষ করতে না পারা একটি সাধারণ ব্যাপার।
আফগানিস্তানে শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে সাহার ফেতরাৎ নামে একজন গবেষক বলেন, আপনি এবং আপনার পরিবার কেন আপনার পড়াশোনার জন্য বিশাল ত্যাগ স্বীকার করবে, যদি আপনি যে ক্যারিয়ারের স্বপ্ন দেখেছিলেন তা নাই করতে পারেন?
এদিকে শিক্ষাখাতে শিক্ষক সংকটে পড়েছে দেশটি৷ দেশটির শিক্ষা মন্ত্রনালয় বলছে, তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া হাজার হাজার আফগান নাগরিকদের মধ্যে অনেক শিক্ষকও রয়েছেন।
এই অবস্থায় দেশটির হাজার হাজার শিক্ষকের প্রয়োজন। আর এ সমস্যা সমাধানে অস্থায়ী ভিত্তিতে নতুন শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র।

 

/রাসেল

সর্বশেষ

Leave a Reply