সারাবিশ্বের মুসলিমদের জন্য রমজান শুধু ইবাদতের মাস নয়, এটি আনন্দ এবং সৌহার্দ্যেরও মাস। এই সময় আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্কও দৃঢ় হয়। রমজানের মূল শিক্ষা হলো সংযম, সহমর্মিতা ও মানবিকতা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ইফতার। সারাদিন রোজা রাখার পর একসঙ্গে বসে ইফতার করার মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতা আরও গভীর হয়।
রমজানে ইফতার শুধু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ এবং প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা সংগঠনগুলো ইফতারের আয়োজন করে থাকে। এসব ইফতার মাহফিলে আমন্ত্রিত হন বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীরা। সনাতনী কিংবা অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও মুসলিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইফতারের আনন্দ ভাগ করে নিতে আসেন। একসঙ্গে ইফতার করতে গিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামির অদৃশ্য দেয়াল দূর হয়, আর তৈরি হয় পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি।
ইফতার মানুষের হৃদয়ে ঐক্যের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, মনে করিয়ে দেয়- প্রকৃত শক্তি বিভক্তিতে নয়, বরং একতাতেই রয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা শেয়ার করেছেন এই ঐক্যের অনুভূতি ও ইফতার সম্পর্কিত তাদের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা।
ইফতার শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, বরং এটি সব ধর্মের মানুষের জন্যও এক বিশেষ সময়। রমজান মাসে যখন ইফতারের সময় আসে, তখন সবার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। আমি যখন ইফতারের দাওয়াত পাই, সত্যিই খুব ভালো লাগে- বিশেষ করে, যখন দেখি বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসাথে বসে খাবার খাচ্ছে। মনে হয়, এটাই তো প্রকৃত সম্প্রীতি!
- ডওয়াংনুং মার্মা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।
ইফতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন, যা ভ্রাতৃত্ববোধকে শক্তিশালী করে। ইফতারের সময় মুসলমানরা একসাথে মিলিত হয়ে খাবার গ্রহণ করে, যা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এটি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সাহায্যের মনোভাব তৈরি করে। আমরা সব ধর্মের বন্ধু মিলে একসাথে ইফতার করি। আমার ‘১০ টাকায় ইফতার’ আয়োজনে সনাতন ধর্মের বন্ধুরাও অংশগ্রহণ করে, এবং তাদের উদ্যোগ ও উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি।
- কাজী মিরাজ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ।
আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই রমজান মাসে ইফতারে অংশ নেয়। এটি মানুষের মধ্যে এক অনন্য ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে এবং পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলে। ধর্মকে অন্তরে ধারণ করেও আমরা মানুষ হিসেবে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠি। আমি আমার বিভাগ ও রুমমেটদের সাথে ইফতারে অংশ নিয়েছি, আর প্রতিবারই মনে হয়েছে- আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো আমরা মানুষ।
- লিটন দেব, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগ।
ইফতার এমন একটি সময়, যা বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে একত্রিত করে এবং সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে রমজান এলেই বন্ধুরা আমাদের ইফতারের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। কিছু দিন আগে সেন্ট্রাল ফিল্ডে আমরা বন্ধুরা একসঙ্গে ইফতার করলাম, সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার নিয়ে এসেছিল। আযান দেওয়ার পর একসাথে ইফতার ছিল করা একটি সুন্দর এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
- নিলয় বড়ুয়া, অর্থনীতি বিভাগ।
একসাথে বসে ইফতার করলে বন্ধুত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। তবে যেহেতু এটি একটি ধর্মীয় রীতি, তাই সরাসরি অন্য ধর্মের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয় বলে মনে হয় না। বরং এখানে আমি মানুষের মানবিকতাকেই দেখি। ইফতারের সময় যদি কারও কাছে খাবার না থাকে, অন্যরা তাকে খাবার ও পানি অফার করে। ভ্রমণের সময় আমাকেও অনেকবার এভাবে ইফতার অফার করা হয়েছিল, যা সত্যিই হৃদয়ছোঁয়া অভিজ্ঞতা।
- শেইন গনসালভেস, মার্কেটিং বিভাগ।
ইফতার মাহফিলের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এই ঐতিহ্য ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে, যা সমাজে শান্তি ও সহমর্মিতার ভিত্তি গড়ে তোলে।
এফকে/কাজী সানজিদা কাঁকন