কবিতা কেবল প্রনয়ের ছন্দ নয় বরং প্রতিবাদেরও এক শক্তিশালী অস্ত্র। সাহিত্যের প্রাচীনতম সদস্য কবিতা। যুগ যুগ ধরে কবিদের শব্দের শক্তি ও সাহসের এক অনন্য নির্ভরতা হয়ে উঠেছে। অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁদের অটল প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল কবিতা এবং শেষে বরণ করতে হয়েছিল মৃত্যুকে, এমন উদাহরণও ইতিহাসে বিরল নয়।
ইউনেস্কো কতৃক ১৯৯৯ সালে ২১ মার্চকে বিশ্ব কবিতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়- বিশ্বব্যাপী কবিতা পাঠ, রচনা, প্রকাশনা ও শিক্ষাকে উৎসাহিত করা। ইউনেস্কোর অধিবেশনে দিবসটি ঘোষণা করার সময় বলা হয়েছিল, ‘কবিতা দিবস বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কবিতা আন্দোলনগুলোকে নতুন করে স্বীকৃতি ও গতি দান করবে।’
কবিতাকে বিশেষ করে স্বরণ করার জন্য এই দিন হোক অত্যাচারিত কন্ঠস্বর বাজেয়াপ্ত করার পক্ষে। কারণ কিছু কিছু কবিতার শব্দ শক্তি ও প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। তাতে থাকুক প্রেম অথবা শান্তির বার্তা কিংবা বিদ্রোহের ঘোষণা।
ফিলিস্তিনিদের জাতীয় কবি মাহমুদ দরবেশ, যিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী কবি। ১৯৪৮ সালের আগ্রাসনে নিজ গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তিনি উদ্বাস্তু জীবনযাপন শুরু করেন। তাঁর কবিতায় ফিলিস্তিনিদের জনজীবনের দুঃখ, ব্যথা ও স্বাধীনতার প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। দরবেশের লেখা কবিতা “আইডেন্টিটি কার্ড” অনুবাদ করতে গিয়ে বোঝা যায়, প্রতিটি শব্দ যেন একেকটা স্ফুলিঙ্গ, ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ, আত্মপরিচয়ের ও স্বাধিকার ঘোষণা।
‘পরিচয়পত্র’
লিখে রাখুন,
আমি একজন আরব,
পঞ্চাশ হাজার-এটাই আমার পরিচয়পত্রের নম্বর।
আমার আটটি সন্তান রয়েছে,
আর এই গ্রীষ্মের পর জন্ম হবে নবমজনের।
এতে এত রাগের কী আছে?
লিখে রাখুন-
আমি একজন আরব।
আমি খেটে খাওয়া মানুষ, আমার মতোই সহযোদ্ধাদের সঙ্গে খনিতে কাজ করি।
আমার আটটি সন্তানের জন্য সংগ্রহ করি রুটি, কাপড় আর শিক্ষা-
পাথরের বুক চিরে।
আমি কারও করুণা চাই না,
আপনার দরজায় মাথা নত করি না।
এতে এত রাগের কী আছে?
লিখে রাখুন-
আমি একজন আরব।
আমি কেবলই একটি নাম, যার কোনো পদবি নেই।
আমি ধৈর্য ধরে আছি এমন এক দেশে,
যেখানে ক্রোধ ঝড়ের মতো তাণ্ডব চালায়।
আমার শিকড় এই মাটিতে, সময়ের জন্মের আগেই,
যুগের উত্থানেরও আগে,
সাইপ্রাস আর জলপাই গাছের পূর্বে,
এমনকি আগাছার বিস্তারেরও আগে।
আমার পিতা ছিলেন লাঙলধারী কৃষকের সন্তান,
কোনো অভিজাত বংশের নন।
আমার দাদাও ছিলেন কৃষক,
সম্ভ্রান্ত কোনো পরিবারের উত্তরাধিকারী নন।
আমার ঘর পাহারাদারের কুঁড়ে,
যা কাঠ আর খড় দিয়ে তৈরি।
আপনি কি এতে সন্তুষ্ট?
আমি সেই পদবী বিহীন নাম।
লিখে রাখুন-
আমি একজন আরব।
আমার চুল কালো,
আমার চোখ বাদামি।
আমার পরিচয়ের চিহ্ন?
আমার মাথায় কেফিয়াহ্ আর ইকাল,
যার স্পর্শে আগুন জ্বলে ওঠে।
আমার ঠিকানা?
একটি দূরবর্তী গ্রাম, যার রাস্তার কোনো নাম নেই।
গ্রামের সব পুরুষ কাজ করে মাঠে আর খনিতে।
এতে এত রাগের কী আছে?
লিখে রাখুন-
আমি একজন আরব।
আপনারা কেড়ে নিয়েছেন আমার পূর্বপুরুষের বাগান,
দখল করেছেন আমার চাষের জমি,
যেখানে আমি ও আমার সন্তানরা কাজ করতাম।
আমাদের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখেননি,
কেবল এই পাথরগুলো ছাড়া।
তাহলে কি এবার রাষ্ট্র এগুলোও নিয়ে নেবে,
যেমনটা শোনা যাচ্ছে?
তাই বলছি,
নথির প্রথম পাতায় লিখে রাখুন:
আমি কাউকে ঘৃণা করি না,
আমি কারও অধিকার লঙ্ঘন করি না।
কিন্তু যদি আমি ক্ষুধার্ত হয়ে যাই,
তাহলে দখলদারের মাংসই হবে আমার খাদ্য!
সতর্ক থাকুন!
আবারও বলছি, সতর্ক থাকুন!
আমার ক্ষুধার,
আর আমার ক্রোধ থেকে।
আই/কিফায়াত উল হক