শাহনাজ রহমতুল্লাহ, নামটা যতটা পরিচিত নয়, তার চেয়ে তাঁর গাওয়া গানগুলো অনেক বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয়। ‘একতারা তুই দেশের কথা বল,’ ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁ,’ ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ,’ ‘জয় বাংলা বাংলার জয়,’ ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’- এই গানগুলো শোনে নি এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে কয়েকজন ক্ষণজন্মা সঙ্গীত শিল্পী তাঁদের নিজস্ব গায়কীত্বে বাংলার সংগীত জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের মধ্যে শাহনাজ রহমতুল্লাহ অন্যতম একজন।
সংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা জন্মগত। বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন খ্যাতনামা সুরকার ও সংগীত পরিচালক, আরেক ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান প্রেসিডেন্সি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন, যা তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি। পরবর্তী সময়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯০) ও একুশে পদক (১৯৯২) লাভ করেন। ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত বাংলা গানের জগতে ছিল তাঁর দাপুটে পদচারণা। দেশাত্মবোধক, আধুনিক, চলচ্চিত্রের গান- সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
তবে এত সাফল্যের পরও একসময় তিনি সংগীত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সবসময় মা হতে চেয়েছিলাম, আর যখন মা হলাম, তখন পরিবারেই জীবনের প্রকৃত সুখ খুঁজে পেয়েছি।’ এরপর একসময় তিনি স্বামীর সঙ্গে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান এবং আর কখনো গান গাওয়ার আগ্রহ দেখাননি। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভক্তদের বিস্মিত করলেও, তিনি ছিলেন অবিচল।
তাঁর সংগীতজীবন শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তেই থেমে থাকেনি, বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তাঁর গানকে নানা সময়ে উপেক্ষার শিকার করেছে। বিশেষ করে “প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ” গানটি রাজনৈতিক কারণে একসময় কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যায়, যা মূলত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে বিভিন্ন সরকার তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। এমনকি বিএনপিও তাঁকে উপযুক্ত সম্মান দিতে পারেনি বলে মত প্রকাশ করেন অনেকে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফুল মালেক আকাশ মনে করেন, ‘শাহনাজ রহমতুল্লাহ শুধু বাংলাদেশের সংগীত জগতেই নন, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাঁর কণ্ঠ ছড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিভক্তির ঊর্ধ্বে উঠে এমন গুণী শিল্পীদের যথাযথ সম্মান দেওয়া উচিত।’
কিংবদন্তি শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ সম্পর্কে বাংলা অ্যাকাডেমির কর্মকর্তা ও কবি মতিন রায়হান বলেন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ শুধুমাত্র একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলা সংগীতের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। ক্লাসিক ঘরানার এমন কণ্ঠশিল্পী কোনো ভূখণ্ডে কালেভদ্রে জন্ম নেন, আর বাঙালির সৌভাগ্য যে তারা তাঁকে পেয়েছে। দেশের গানে তাঁর কণ্ঠ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা তুলনাহীন। তাঁর অনন্য গায়কী ও কণ্ঠের মাধুর্য সহজেই শ্রোতাকে মুগ্ধ করে। বিশেষ করে, যখন তিনি গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা “একতারা তুই দেশের কথা বল” গেয়ে ওঠেন, তখন হৃদয়-মন দেশপ্রেমের গভীর আবেগে ভেসে যায়। নিঃসন্দেহে, তিনি ছিলেন ক্লাসিক ধারার এক ব্যতিক্রমী শিল্পী, যাঁর সুরের জাদু চিরকাল বাঙালির মনে বেঁচে থাকবে।
২০১৯ সালের ২৩ মার্চ, কিংবদন্তি শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৬৭ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর মৃত্যুতে সংগীতজগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা অপূরণীয়। তবে তাঁর গান, তাঁর সুর আজও বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে। যুগে যুগে সৃষ্টিশীল মানুষরা নানা কারণে অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি কখনো ম্লান হয়নি। শাহনাজ রহমতুল্লাহও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর গানের প্রতিটি সুর, প্রতিটি কথা আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছুঁয়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, তাঁর গানের কথাতেই যেন তাঁর অস্তিত্ব স্থায়ী হয়ে উঠেছে: “যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়, সে হারালো কোথায়…” তবে সত্যি বলতে, তিনি হারিয়ে যাননি। তাঁর সুর ও গান চিরকাল বেঁচে থাকবে বাংলার মাটি, মানুষ এবং হৃদয়ের গহীনে, যা কখনো ভোলা সম্ভব নয়।
/ ইব্রাহিম ভূঁইয়া