নাট্য দিবস—নাট্যকলার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের একটি উজ্জ্বল দিন। প্রতিবছর ২৭ মার্চ পালিত এ দিনটি যেন নাটকের গভীরতা ও শক্তির প্রতি এক নতজানু অভিবাদন এবং সংশ্লিষ্ট মানুষদের প্রতি সম্মান জানানোর একটি মাধ্যমও। বিশ্ব নাট্য দিবসের মাধ্যমে নাটকের শাশ্বত মহিমায় সমাজ, সংস্কৃতি, জীবনবোধে প্রভাবক ভূমিকার উপলব্ধি ঘটে। এটি শুধুমাত্র নাট্যশিল্পের উপস্থিতির জানান নয় বরং মানবীয় অনুভূতির সূক্ষ্ম রূপায়ন ও মানুষের অস্তিত্বের গভীরতা অন্বেষণের দিনও বটে।
নাট্যকলার ইতিহাস অতি প্রাচীন, এর শেকড় গেঁথে আছে মানব সভ্যতার সূচনালগ্নে। নাটক প্রাচীন গ্রীসে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিকতা থেকে উদ্ভূত। তখন দর্শকদের কাছে যাত্রা ও নাট্য উপস্থাপন করতে গিয়ে পুরোহিতরা মানবজীবনের চিরন্তন সংকট, প্রেম, যন্ত্রণা ও সংগ্রামের জয়গান ফুটিয়ে তুলতেন। প্লেটো, অ্যারিস্টটল, সোপোক্লেস ও ইউরিপিডিসের মতো মহান নাট্যকারেরা নাটকের দর্শনকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের লেখা গ্রীক ট্র্যাজেডিতে কল্পনা ও বাস্তবের এক দুর্লভ মেলবন্ধন ছিল।
বিশ্বজুড়ে এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম নাট্যকলা। ইউরোপে রেনেসাঁসের পর শেক্সপিয়রের মতো নাট্যকাররা সমাজ ও মানবমনের জটিলতা তুলে ধরে নাটকে নতুন মাত্রা যোগ করেন। আধুনিক যুগে নাটক বিনোদন ও সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে নাট্যশিল্পের সূত্রপাত ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে হলেও স্বাধীনতার পর এটি নতুন গতি পায়। সত্তরের দশকে সালাহউদ্দিন জাকী, মামুনুর রশীদ ও সেলিম আল দীন নাটকের নতুন ভাষাশৈলী নির্মাণ করেন। প্রযুক্তির অগ্রগতির মাধ্যমে এখন নাটকের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, যা তরুণদের নাট্যচর্চায় আরও আগ্রহী করবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র নাট্যসংগঠন ‘থিয়েটার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়’ ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রেক্ষাপটে নাট্যপ্রদর্শন করে শিক্ষার্থীদের নাটকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে আসছে। এ দিনটিকে কেন্দ্র করে নাট্যকলা, মঞ্চ ও থিয়েটার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কয়েকজন নাট্যকর্মী তাদের অভিজ্ঞতা নিংড়ে কিছু অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
“মঞ্চের প্রতিটি বিষয়ের সাথে আমাদের গভীর আবেগ জড়িয়ে আছে। মঞ্চ আমাদের আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। থিয়েটারের শ্রেষ্ঠ উপহার হলো, থিয়েটার একজন নাট্যশিল্পীকে সৎসাহসী করে গড়ে তোলে। যার প্রমাণ-স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ন্যায়ের পক্ষে থিয়েটার কর্মীদের অবস্থান। নাটক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যা মানুষকে নতুন দৃষ্টিকোণ দেয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে থিয়েটারকেও আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। অতীতের মতো, শিল্পীরাই সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।” -মোহন চক্রবর্তী।
“থিয়েটার এ-দেশে ব্যাকফুটে থাকা একটি সেক্টর। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে সংগঠনের মাধ্যমে কিছু মানুষ চেষ্টা করছে নাট্যশিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখতে। নাটকের পাঠচক্র থেকে মঞ্চায়ণ পর্যন্ত থাকে অক্লান্ত পরিশ্রম। আমরা নাটক শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতাম দর্শকের হাততালিতে। আমার কাছে থিয়েটার ছিল খালি পায়ে ৪৫ মিনিট ভেজা বেদিতে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রিয় নাটকটি দেখার জন্যে চরিত্রে না থেকে ব্যাকস্টেজে কাজ করা। ক্যাম্পাস ছেড়েছি ৩ বছরের বেশি সময়, তবুও থিয়েটার যেন আমার কাছে ক্যাম্পাসে যাওয়ার অন্যতম এক অভিপ্রায়। -আনিকা আফরোজা দিশা।
“নাটক শুধুমাত্র বিনোদন নয়, এটি সমাজের দর্পন হিসেবে কাজ করে এবং চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় ন্যায়-অন্যায় ও সমাজের শোষনের ইতিহাস। নাট্যকর্মীরা যে কঠিন কাজটি করেন তা হলো নিজের মধ্যে অন্য একটি চরিত্রকে লালন করে ফুটিয়ে তোলা। টিমওয়ার্ক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কাজটি আমরা খুব সহজেই করি। তবে বর্তমানে বাংলা মঞ্চনাটকের আকাশে দূর্যোগের ঘনঘটা। প্রায়ই শোনা যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে নাটক মঞ্চায়ন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যা দেশ ও জাতির জন্য অশনি সংকেত। এইদিনের প্রার্থনা এদেশে স্বাধীনভাবে মঞ্চ-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটুক।” -ইশতিয়াক আহমেদ।
“মঞ্চনাটক একটা আবেগের জায়গা। নাট্যশিল্প আমাদের শেখায় কীভাবে একটা টিম তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনে আপ্রাণ থাকে। গ্রীনরুমের পরিবেশ আমাদের জীবনে ধীরস্থিরতার গুরুত্ব শেখায়। নাটক হলো দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি যেখানে একসাথে কাজ করতে করতে আমরা হয়ে উঠি পরিবার। নাটকের মঞ্চ, গ্রীনরুম, ফ্লোর হয়ে ওঠে আমাদের জীবন আর চরিত্র ও সংলাপ যেন সেই জীবনের প্রতিবিম্ব। নাট্যজগতের ভবিষ্যৎ আরও মসৃণ হোক। নাটক উপস্থাপনে যেকোনো বাঁধা কাটিয়ে সমাজ সংস্কারে মঞ্চনাটক এগিয়ে যাক, বিশ্ব নাট্য দিবসে এটাই চাওয়া”। -গুলশান পারভীন সুইটি।
শুধু নাট্যকর্মীদের জন্য নয়, দিনটি সাধারণ মানুষের জন্যেও এক আধ্যাত্মিক উৎসব। নাটক সেই শিল্প যা মঞ্চে, পর্দায়, কাগজে জীবনের আভাস দেয়। সেই জীবনের প্রতিটি রূপ—বিষণ্নতা, হাসি, দুঃখ, আক্রোশ—সবই আমাদের ভেতরে নতুন আলো জ্বেলে দেয়। একজন অভিনেতা, লেখক, পরিচালক কিংবা দর্শক—সবাই যেন এক অদৃশ্য সুরে বাঁধা। এই দিনটি নাট্যকলার দ্যোতনা, তাৎপর্য ও একনিষ্ঠতা তুলে ধরে এবং সংশ্লিষ্ট মানুষদের অন্তরাত্মায় এক মহৎ অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে।
এফকে/ আমেনা ইকরা