চাঁদ রাত এলেই একটা প্রশ্ন ওঠে-হেনা কোথায়? এই হেনা কিন্তু ‘বাপ্পারাজের হেনা’ নয়, বরং প্রকৃত অর্থে মেহেদী। নারীদের সাজসজ্জার অংশ হিসেবে মেহেদীর গুরুত্ব বহুকাল আগে থেকেই রয়েছে। এটি মূলত গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের গাছ, যার পাতা গুঁড়ো করে তৈরি করা হয় রঙ।
মেহেদীর ব্যবহার কত পুরোনো, তার সঠিক তথ্য নেই, তবে ইতিহাস বলে, মিসরীয়রা খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ বছর আগে মমি সংরক্ষণে মেহেদীর রঙ ব্যবহার করত। ভারত, পারস্য ও আরব সংস্কৃতিতে এর প্রচলন সুপ্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে। পরবর্তীতে মুসলমানদের হাত ধরেই মেহেদীর ব্যবহার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এটি হাত রাঙানোর পাশাপাশি চুল ও দাড়ি রাঙাতে ব্যবহৃত হয়। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাড়িতে মেহেদীর ব্যবহারের উল্লেখ ছিল বলে এটি মুসলিমদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিয়ে, ঈদ, পূজা বা যে কোনো উৎসবে মেহেদী এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে চাঁদ রাতের আমেজ যেন মেহেদী ছাড়া অসম্পূর্ণ। নারী ও শিশুদের জন্য এটি একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে। মেহেদীর রঙের সঙ্গেই উৎসবের আনন্দ মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
এই প্রসঙ্গে আমিনা কবির শ্রেষ্ঠার কাছে জানতে চাইলে তিনি মেহেদী নিয়ে নিজ অনূভুতি তুলে ধরেন বলেন- “প্রতি বছর ঈদে মেহেদী দেওয়া এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে আমার জীবনের। ক্লাস ফাইভ থেকে নিজেই মেহেদী দিচ্ছি, তার আগে আম্মুই দিতেন। বাবাকে যে কত জ্বালিয়েছি মেহেদীর জন্য! একটা আনলে পছন্দ হয় না, আবার বদলাতে হয়। নাম বলে দিলেও কখনো সেটা ঠিকঠাক না পেয়ে পুরো শহর চষে বেড়াতেন, তবু হাতে তুলে দিতেন আমার পছন্দের মেহেদী। এবার শ্রেষ্ঠা একটু দুঃখ নিয়েই বলেন-“একদিন হয়তো বিয়ে হবে, নতুন জীবন শুরু হবে। তখন বাবা আর মেহেদী কিনে হাতে তুলে দেবে না, হয়তো অন্য কেউ দেবে। কিন্তু বাবার এনে দেওয়া মেহেদীর সেই অনুভূতি কি কখনো ফিরে আসবে?” মেহেদীর সঙ্গে এমন মূল্যবান অনুভূতি ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে কম-বেশি সকল নারীর।
কালের বিবর্তনে মেহেদী শুধু উৎসবের অনুষঙ্গ নয়, এটি একটি শিল্পেও পরিণত হয়েছে। মেহেদী ডিজাইনের ক্ষেত্রে নানা ধরণের নতুনত্ব এসেছে। হাতভর্তি নকশা করা মেহেদী এখন সৌন্দর্য ও ফ্যাশন স্টেটমেন্টে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই এখন মেহেদী আর্টিস্টদের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন বিউটি পার্লার, ওয়েডিং ইভেন্ট, এমনকি অনলাইন ভিত্তিতেও মেহেদী ডিজাইন করার একটি লাভজনক পেশা গড়ে উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে মারিয়া মূর্ছালিনকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি অকপটে বলেন, “আমার স্কুলের এক ফ্রেন্ড লেখাপড়ার পাশাপাশি মেহেদী ডিজাইনকে পেশা হিসেবে নিয়েছে এবং দারুণ সাড়াও পাচ্ছে। শখের কাজ প্রফেশন হিসেবে নেওয়ার বিষয়টা ভালো লাগার মতো। তাছাড়া এই কাজের চাহিদাও দিনদিন বাড়ছে”
মেহেদী উৎসবকে রঙিন করে তোলে। ঈদের আগের রাতে যখন বাতাসে আনন্দের উচ্ছ্বাস থাকে, তখন হাতে মেহেদীর ছোঁয়া উৎসবের রঙকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। তাই চাঁদ রাত এলেই একটা প্রশ্ন-হেনা কোথায়? কারণ উৎসবের রঙ মেহেদী ছাড়া অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
এফকে/ কিফায়াত উল হক