ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে উৎসবের এক অপূর্ব মিলনমেলা। বছর ঘুরে রমজান এলে দিন যত গড়ায়, ততই ঈদের উৎসবমুখর আনন্দ ও আমেজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঈদকে ঘিরে পরিকল্পনা ফেলে আসা শৈশব, কৈশোরের ঈদের স্মৃতিকে রোমন্থন করে। শৈশবের সেই আমেজ আমাদের কাছে এক তুলনাহীন আবেগ। শৈশবের ঈদ আনন্দের যে রঙ, যে উচ্ছ্বাস-তা বড় হওয়ার পর ক্রমশ ফিকে হতে থাকে। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই উচ্ছ্বাসের রঙ বদলালেও স্মৃতির পাতায় ঈদের আনন্দ আজও অমলিন।
ঈদ কার্ড: শৈশবের ঈদ ছিল ঈদ কার্ডের রঙিন জগৎ। তখন শুভেচ্ছা বিনিময়ের মূল মাধ্যম ছিল ঈদকার্ড। ঈদের আগে পাড়ার মোড়ে মোড়ে বসত ঈদ কার্ডের দোকান। একটাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামের ঈদ কার্ড পাওয়া যেত। চকচকে কার্ডগুলোর গায়ে ঝলমলে রঙে লেখা ‘ঈদ মোবারক’। পাশে থাকত আরবি/উর্দু স্টাইলে বাঁকানো নকশা ও জরি মাখানো কারুকাজ। স্টিকার, ভিউ কার্ড বা মিউজিক কার্ড ঈদের আনন্দকে দ্বিগুণ করে তুলত। বর্তমানে ঈদ শুভেচ্ছা পাঠানোর মাধ্যম বদলালেও শৈশবের সেই ঈদ কার্ডের স্মৃতি এখনও মনে গেঁথে আছে নস্টালজিয়ার রঙে।
চাঁদরাতের ঈদ আনন্দ: চাঁদ দেখা ছিল এক আনন্দময় উৎসব। ২৯ রমজান বিকেল থেকেই সবার উৎকণ্ঠা—সন্ধ্যা নামতেই সবাই ছাদ, উঠোন কিংবা খোলা মাঠে জড়ো হতো, দৃষ্টি থাকত পশ্চিম আকাশে। চাঁদের আভাস পেলে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ত আনন্দধ্বনি—”চাঁদ উঠেছে!” সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হতো উৎসবের আমেজ। ঘরভর্তি কাজিনদের হৈ-হুল্লোড়, গল্পআড্ডায় জমতো চাঁদরাত। একপাশে মেহেদী উৎসব অন্যপাশে টিভির পর্দায় অনবরত বাজত নজরুলের অমর সৃষ্টি—”ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ!” বাবারা ব্যস্ত বাজারসদাইয়ে, মায়েরা ঘর সাজানো আর রান্নার আয়োজনে—সব মিলিয়ে ঈদের আসল আনন্দ শুরু হতো চাঁদরাতেই।
নতুন জামা ও ঈদ সালামী: ঈদের অন্যতম আকর্ষণ নতুন জামা নিয়ে চলতো সীমাহীন উচ্ছ্বাস। নতুন জামা সবার চোখের আড়ালে যত্ন করে তুলে রাখা, মাঝেমধ্যে লুকিয়ে খুলে দেখা, হাত বুলানো তারপর ভাঁজ করে রেখে দেওয়া—এ যেন অন্যরকম আনন্দ! ঈদের সকালে গ্রামের পুকুরে ঝাঁপিয়ে গোসলের পর নতুন জামা পরে সুগন্ধি মেখে ঈদগাহের পথে যাত্রা। নামাজ শেষে কোলাকুলি, কুশল বিনিময় আর ঈদ মোবারক বলার ধুম পড়ে যেত। সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত হলো সালামি সংগ্রহ। বড়দের সালাম করে চকচকে নতুন নোট পাওয়ার আনন্দই শিশুদের ঈদ। জনে জনে সালাম করে সালামি সংগ্রহের আনন্দ কেবল ঈদেই পাওয়া যায়! তবে ডিজিটাল সময়েও সালামির রেওয়াজ থেমে নেই। বিকাশ ২০২১ সালে ঈদ গ্রিটিংস কার্ডের ফিচার যুক্ত করে। ঈদ কার্ড এখন ডিজিটাল বার্তায়, স্টিকারে স্থানান্তর হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে ঈদ আনন্দের রীতিনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। আগের চর্চাগুলো ফিকে হয়ে নতুন প্রচলনের আবির্ভাব হয়েছে। তবু থেমে নেই ঈদ আনন্দের অনুষঙ্গ। শৈশবের সাথে বড়োবেলার ঈদের তফাৎ প্রসঙ্গে সানজিদা হাবিব বন্যা বলেন, “শৈশবে ঈদ মানেই ছিল ছোট ঈদ আর বড় ঈদের উৎসব, যার প্রস্তুতি শুরু হতো স্টেশনারি দোকানে আনাগোনা ও টাকা জমানোর মাধ্যমে। স্কুল ছুটির আগের দিন সহপাঠীদের মাঝে ঈদকার্ড বিতরণ ছিলো ঈদের আগেই আরেক আনন্দ। চাঁদরাতে কাজিনদের সঙ্গে মেহেদি দেওয়া, ঈদের সকালে মেলায় ঘোরা—এসব ছিলো আনন্দের অপরিহার্য অংশ। এখন আর আগের মতো গ্রামে যাওয়া হয় না, সবাই ব্যস্ত, তবে চাঁদরাতে নিজেই মেহেদি দেই এবং বিকাশে সালামি নিই। নতুন জামা পরে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেই এখনকার ঈদ কেটে যায়।”
ঈদের মূল আনন্দ ঠিক কোথায় এবং শৈশবের ঈদের কোন বিষয়গুলো মিস করেন জানতে চাইলে সাফিয়াল মুজনাবিন রাতুল বলেন, “আমাদের শৈশবের ঈদ ছিল চাঁদরাতের আনন্দ, বন্ধুরা মিলে আতশ ফাটানো, ঈদ কার্ড কিনে বিলি করা। নতুন জামার ঘ্রাণ, আম্মুর হাতের সেমাই, আর আব্বুর সঙ্গে ঈদের নামাজে যাওয়াই ছিল ঈদের মানে। গ্রামে ঘুরে ঘুরে সালামি আদায় করে বিকেল থেকে টিভির বিশেষ নাটক দেখা, আর রাত শেষে ক্লান্ত শরীরে হাসিমুখে ঘুমিয়ে পড়ার ঈদই ছিল জীবনের সেরা ঈদ, শৈশবের ঈদ।”
আই/সাঈদ আহমেদ রিফাত