“বাবার হাতের আঙুল ধরে প্রথম জলে নামা, কোমর জলে ভিজিয়েছিলাম আমার রঙিন জামা”—কবি মীনাক্ষী দাসের এই পঙক্তিটি যেন আমাদের অনেকেরই শৈশবস্মৃতি হয়ে ওঠে। বাবারা গল্প লেখেন না, কিন্তু তাঁদের জীবনটাই হয়ে থাকে এক অনুপম উপন্যাস—যার প্রতিটি অধ্যায় জুড়ে থাকে দায়, ত্যাগ আর নিঃশব্দ সংগ্রাম।
বিশ্ব বাবা দিবস ঠিক এমনই এক উপলক্ষ, যেখানে কৃতজ্ঞতার ভাষা খোঁজা হয় সেই মানুষটির জন্য, যাঁকে আমরা প্রতিদিন চাই, অথচ কিন্তু বলে উঠি না—”বাবা, তোমাকে ভালোবাসি।”
বিশ্ব বাবা দিবসের সূচনা ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায়, এক খনি দুর্ঘটনায় নিহত বাবাদের স্মরণে। পরবর্তীতে এই ভাবনাকে আরও পূর্ণতা দেন সনোরা স্মার্ট ডড। তাঁর বাবা উইলিয়াম স্মার্ট ছিলেন একজন যুদ্ধফেরত সৈনিক, যিনি একাই ছয় সন্তানকে বড় করে তোলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই সনোরা অনুভব করেন, মা দিবস যেমন আছে, তেমনি বাবাদেরও থাকা উচিত একটি নিজস্ব দিন। সেই ভাবনার পথ ধরে আজ পৃথিবীর বহু দেশে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার পালন করা হয় বাবা দিবস।
এই দিনটি যত না আনুষ্ঠানিক, তার চেয়ে ঢের বেশি আবেগময়। সন্তানদের মনে এদিন ভেসে ওঠে সেই দৃশ্যগুলো, যেগুলো বাবা কখনও বলেননি, লিখেও যাননি—তবে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন চুপচাপ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদনান আলমের গল্পটা যেমন। চার ভাইয়ের মধ্যে ছোট হওয়ায় বাবার সঙ্গে তাঁর সখ্যটাও ছিল অন্যরকম। আদনানের চোখে আব্বার জীবনটা ছিল নানা অভিজ্ঞতা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণতায় ভরা। আমার কাছে বাবা মানে ছিলেন একজন গল্পকার—যিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বললেও শোনার আগ্রহ কখনো কমতো না, বরং শুনেই যেতাম।
আপাদমস্তক সাধারণ এই মানুষটি আমাকে সবসময় সমাজ, ইতিহাস ও ধর্মের রেফারেন্স দিয়ে বাস্তবতা বুঝাতেন। আব্বার একটা কথা এখনও মনে পড়ে। ভর্তি পরীক্ষার সময় যখন হতাশ হয়ে পড়েছিলাম, তখন তিনি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন, ‘তুই পাবলিক ভার্সিটিতে যাবিই ইনশাআল্লাহ।’ তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসটাই হয়তো আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছিল।” আরেকটি স্মৃতি আজো তীব্রভাবে নাড়া দেয় তাঁকে— “আব্বা আমার রান্না খুব পছন্দ করতেন, গর্বও করতেন। যখনই ভালো কিছু রান্না করি, আব্বাকে খুব মিস করি—খুব ইচ্ছে করে, একবার যদি আব্বাকে খাওয়াতে পারতাম!”
বাবা মানে দূরে থেকেও সবচেয়ে কাছের মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গাজী রামিশা রওশনের ভাষায় উঠে আসে তাঁর বাবার ত্যাগের কথা। তিনি বলেন, “আমার বাবা একজন প্রবাসী। আসলে বাবাকে সামনে থেকে খুব একটা পাইনি। কিন্তু অনেক দূরে থেকেও কীভাবে নিরলসভাবে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হয় তা শিখিয়েছেন তিনি, এবং এখনো শিখিয়ে যাচ্ছেন। এখানেই আমার জীবনে বাবার সবচেয়ে বড় ভূমিকা।”
“আমাদের তিন ভাইবোনকে মানুষ করার জন্য, আমাদের ভালো থাকার কথা ভেবে নিজের কথা ভুলে গিয়ে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর প্রবাসে থাকা—আমার চোখে এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় ত্যাগ।”
বিশ্ব বাবা দিবস প্রসঙ্গে রামিশা বলেন, “এই দিন নিয়ে হয়তো তেমন হইচই হয় না, কিন্তু বাবাদের ত্যাগের মহিমা কতটা অনন্য—সেটা প্রতিটি সন্তান জানে। বাবাদের এই ত্যাগকে সম্মান জানাতেই এমন একটি বিশেষ দিনের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।”
কুবি শিক্ষার্থী তাবাসসুম ইশা শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল এক সন্ধ্যায়। তখন খুব ছোট, অন্ধকারে ভয় পেয়েছিলেন। বাবা হারিকেন জ্বালিয়ে পাশে এসে বলেছিলেন, “আমি পড়ছি, তুমিও পড়ো। ভয় পাস না, আমি আছি।” সেই রাতে বাবার গল্প আর খেলাচ্ছলে শেখানো গুণের ছক এখনো তাঁর মনে গেঁথে আছে। এখন বুঝতে পারেন—বাবা শুধু আলো জ্বালাননি, জ্বালিয়ে গেছেন তাঁর মনের ভিতর সাহস, আশ্রয় আর নির্ভরতার এক চিরন্তন প্রদীপ।
ইশা বলেন এখনও মনে পড়ে বাবার সেই কথাগুলো। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি না পারলেও চাই তুমি পারো। আমি না জিতলেও চাই তুমি জেতো।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন রাব্বি তাঁর বাবাকে দেখেছেন একেবারে মাটির কাছাকাছি থেকে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার আগমন ঘটে বিদেশ থেকে। তারপর তাঁর পড়াশোনা, হাতের লেখা, রুটিন—সবকিছু গুছিয়ে দেন বাবা নিজ হাতে। যখন করোনার দীর্ঘ ছুটিতে মন ভেঙে যাচ্ছিল, তখন বাবার একটি কথাই তাঁকে দাঁড় করিয়ে দেয়: “জীবনে টাকা কামাইতে পারবি, কিন্তু পড়ার সুযোগ আর ফিরবে না।” সেই মানুষটি সংসারের অভাব নিজে বয়ে নিয়েছেন, কিন্তু সন্তানদের বুঝতে দেননি একটুও। ঠিক একজায়গা থেকে বাবাকে হিরো মনে হয়। এখন মারুফের স্বপ্ন, “বাবা-মাকে হজে পাঠাতে পারলে মনে হবে কিছু একটা দিতে পেরেছি।“
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ইউনুস বলেন,“আমার জীবনের সত্যিকারের পথপ্রদর্শক হলেন বাবা। তাঁর কঠোর পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে আমি শিখেছি কীভাবে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ধীরে ধীরে তা অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়।” তিনি বলেন, “বাবার মধ্যে যে গুণটি আমি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি, তা হলো তাঁর পরিশ্রম ও পরোপকারিতা। তিনি কখনো নিজের সুবিধার কথা ভাবেননি—সবসময় চেষ্টা করেছেন অন্যের উপকার করতে। আমি চাই, এই গুণগুলো যেন আমার মধ্যেও গড়ে ওঠে।”
এই গল্পগুলো একেকটি আলাদা পরিবার থেকে এলেও, এগুলো এক অভিন্ন সুরে বাঁধা—কারণ, প্রতিটি বাবা এক একজন নিঃশব্দ যোদ্ধা। তাঁরা বলেন না, তাঁরা বোঝান না, শুধু পাশে থাকেন। সন্তানের একেকটি হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে তাঁদের শতশত ত্যাগ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
বাবা দিবস তাই কেবল একদিনের ফুল-মেসেজ-পোস্ট নয়। এটি উপলব্ধি করার দিন—আমাদের জীবনের সেই মানুষের কথা, যাঁর প্রার্থনার ছায়া ছাড়া আমরা আজকের ‘আমি’ হয়ে উঠতে পারতাম না।
আমরা হয়তো তাঁকে প্রতিদিন বলি না, “ভালোবাসি”। বলি না, “তোমার ত্যাগগুলো আমরা জানি।” তবে অন্তত এই দিনে একটু কাছে যাওয়া যায়, একটু বলে ফেলা যায়—“ধন্যবাদ, বাবা। তুমি না থাকলে আমি এতদূর আসতে পারতাম না।”
/কাজী ফাহমিদা কানন