
সায়েমা হক, কিফায়াত উল হক
সকালের আলো থমকে দাঁড়ায় জানালার কাচে। ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি, তবু আঙুল যেন নিজে থেকেই এগিয়ে যায় ফোনের স্ক্রিনে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম খুললেই দেখা যায় রঙিন এক দুনিয়া—কারও ছবি সমুদ্রপাড়ে, কারওটা পাহাড়ের কোলে, আবার কেউবা বিয়ের সাজে ঝলমলে। এসব দেখে হঠাৎ করেই নিজের জীবনটা কিছুটা সাদামাটা, কিছুটা নিস্তরঙ্গ মনে হয়।
এই অনুভব আজকাল অনেক তরুণের কাছেই নতুন নয়। অনলাইনের এ ঝলমলে জগতে ঢুকে দিন কেটে যায় স্ক্রলে স্ক্রলে। কিন্তু বাইরের এই চাকচিক্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া।
রেদওয়ান নামের এক তরুণ বলেন, “রিলগুলো দেখে মনে হয়, চারপাশে সবার জীবন যেন উৎসবে ভরা। নিজেরটা তখন ফিকে লাগে। পরে ভাবি, ওগুলো তো বাস্তবের সামান্য কিছু অংশ—ফিল্টারে মোড়া, মুহূর্তে বাঁধা। ভেতরে কতটা শূন্যতা লুকিয়ে থাকে, তা তো দেখা যায় না।”
তাহলে কি কখনও সব কিছু ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা জাগে না? হেসে বললেন, “অনেকবার অ্যাপগুলো ডিলিট করেছি। শুরুতে অস্বস্তি লাগত, মনে হতো কিছু মিস করছি। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, ফোনের বাইরে একটা সত্যিকারের জীবন আছে। বিকেলের রোদে একটা বই, ছোট্ট কোনো দোকানে বন্ধুর সঙ্গে চা এগুলোই আসলে শান্তি। সোশ্যাল মিডিয়ার অনুপস্থিতি আমাকে শূন্য করেনি, বরং ভরিয়ে দিয়েছে।”
নুসরাতও জানান একই অভিজ্ঞতার কথা। নিজেকে সময় দিতে ভালোবাসেন তিনি। তবু সোশ্যাল মিডিয়ার চুপচাপ টান মাঝেমধ্যে ছুঁয়ে যায়। “বিশেষ করে যখন কোনো ট্রাভেল ব্লগ দেখি—বরফে ঢাকা শহর বা সাজানো কোনো ক্যাফে—মনে হয়, একদিন আমিও যাব সে পথে,” বলেন তিনি।
প্রযুক্তি ছাড়া জীবন কেমন হতো এই প্রশ্নে তার চোখে ফুটে ওঠে শৈশবের চিত্র। “ছোটবেলায় আশপাশে কেউ না থাকলে বই নিয়ে বসে থাকতাম। শব্দ আর বাক্যের ভেতর সময় কেটে যেত। এখন ভাবি, প্রযুক্তি যদি একটু ধীর হতো—তাহলে হয়তো আমি এখনও হারিয়ে থাকতাম সেই শব্দের জগতে। নিঃশব্দ, অথচ গভীর।”
এই অভিজ্ঞতা আজ আমাদের সবার মাঝেই কমবেশি মিশে আছে। বাইরের জগতে যতই রঙিন রিল আর ছবির ভিড় থাকুক না কেন, জীবনের আসল গল্পগুলো জন্ম নেয় ফোনের বাইরের জগতে—যেখানে বিকেলের আলো ধীরে জানালায় পড়ে, আর চায়ের কাপে জমে থাকে নিঃশব্দ আলাপ।
গবেষণাও বলছে একই কথা। ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সাময়িক বিরতি মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই বিরতি শুধু প্রশান্তিই এনে দেয় না, বরং জীবনের সঙ্গে গড়ে তোলে নতুন এক সংযোগ।
/এএম