MCJ NEWS

জুলাইয়ে নারীর ব্যারিকেড ভাঙার গান

‘নারী’ কবিতায় প্রায় একশো বছর আগে নজরুল বলেছিলেন ‘আমার চক্ষে পুরুষ-রমনী কোনো ভেদাভেদ নাই’। যুগে যুগে লড়াইয়ের ইতিহাসে কেবলই পুরুষের কৃতিত্ব ছিলো না। ব্রিটিশবিরোধী থেকে ২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, ইতিহাসের পাতায় নারীর ভূমিকা পাওয়া যাবে। তবে মানুষ কী তা মনে রাখে? হয়তো রাখে আবার হয়তো না। কেননা ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে স্লোগান ছিলো ‘প্রীতিলতার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ বা ‘রোকেয়ার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’। আবার ৫ আগস্টের পরই রোকেয়া ও প্রীতিলতার নাম মুছে দেওয়ার পাঁয়তারা। নারীর ত্যাগ অস্বীকারে স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয় যুগে যুগে।

১১ জুলাই ২০২৪, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পুলিশি হামলা হয়। সেদিন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে কুমিল্লা শহর আর হল থেকে সেদিন নারীরা বুক পেতে সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে ভাইদের আগলে নিয়ে যায় কোটবাড়ি বিশ্বরোড। এ যেন তারা একাত্তরের জননী জাহানারা ইমাম। জননী জাহানারা যেমন শহীদ রুমিকে নিজে গাড়ি করে পৌঁছে দেন যুদ্ধের ময়দানে ঠিক তেমনি বোনেরা তাদের ভাইদের এগিয়ে দিচ্ছেন দেশকে রক্ষা করতে। কেবল এগিয়ে দেওয়াই? নাহ! ভাইদের সাথে পাঁয়ে পা মিলিয়ে, গলায় গলা মিলিয়ে, তালে তাল মিলিয়ে লড়াই। বজ্র কন্ঠে বলেছে ‘আমার ভাইকে মারলি কেন? জবাব চাই,জবাব দে’। এ যেন অনার অফ গার্ড দেওয়ার মতো এক মিছিল ছিলো। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যারিকেড ভাঙার সেদিন মেয়েরা গেয়েছিলো রণসংগীত, ভেঙেছিলো ব্যারিকেড।

১৪ জুলাই ২০২৪, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রাতে হলপাড়ায় চিৎকার শোনা গেলো। ভেসে এলো মেয়েদের হলগেটের তালা ভাঙার শব্দ সাথে স্লোগানে মুখরিত গান। দুপুরেও একই দৃশ্য। অনার অফ গার্ড দিয়ে ভাইদের ঢাল হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায় মেয়েরা। সেদিনের দৃশ্য মনে করলে আজও বুকের ভেতর কাঁপুনি জাগে। রক্তাক্ত হয়েছিল ঢাবি। যে মেয়েরা বুক আগলে দাঁড়িয়েছে তাদেরকে পশুর মতো পিটিয়েছিলো সেদিন। দিনভর ইডেন মহিলা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের ওপর হামলা হয়। চোখ আটকে যায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ওপর। পুলিশের হাতে তুলে না দিতে আগলে রেখেছিল বড় ভাইকে। রোধ করেছিল পুলিশের গাড়ির গতি। সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একই দৃশ্য। ছিনিয়ে নিতে চাওয়া ভাইদের তারা জড়িয়ে রেখেছিল। কোথাও নিতে দেবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্বরোচিতভাবে সারারাত চলে একের পর এক হামলা। তবু মেয়েরা ব্যারিকেড ভাঙার গান গেয়ে ভেঙেছিল ব্যারিকেড।

জুলাইয়ের স্মৃতিচারন করে ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী শাহিনুর সুমি বলেন, “২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফলের পেছনে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিলো। আমার দেখা কোনো আন্দোলনে নারীদের এত পরিমাণে মাঠে নামতে দেখিনি। নারীরা প্রীতিলতার মতো ভাইদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। আহত হয়েও পিছু হটেনি, দ্বিগুণ তেজে সামনে এগিয়েছিল। তাদের সাহসিকতা আমরা সর্বত্র দেখেছি। বেগম রোকেয়া বলেছিলেন একটি গরুর গাড়ির দুটো চাকা, তার একটি নারী অন্যটা পুরুষ হলে এক চাকা ছোট আর এক চাকা বড় হলে গাড়ি একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে। দুটো চাকা সমান হলেই গাড়ি সমান তালে এগিয়ে যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও তাই ঘটেছে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণে আমরা ১৫ বছরের জগদ্দল পাথর সরাতে পেরেছি।”

মনে পড়ে কুমিল্লার বাগিচাগাওয়ে ড্রেনে ফেলে মেয়েদের পেটানোর চিত্র কিংবা চট্টগ্রাম শহরে মেয়েদের মিছিলে হামলার চিত্র। সারা দেশব্যাপী মেয়েদের ওপর নির্মম হামলা হয় জুলাই-আগস্ট জুড়ে। শিক্ষার্থীদের বাইরেও আমাদের মায়েরা সেদিন সন্তানদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সাংস্কৃতিক কর্মীরা এসে দাঁড়িয়েছিল মিছিলে। শিক্ষকরা দাঁড়িয়েছিল শিক্ষার্থীদের পাশে। আমরা কান্নারত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ভিডিও দেখেছি। দেখেছি শহীদ রিয়া গোপের মায়ের আহাজারি। গুলির সামনে বুক পেতে দিয়ে শহীদ সামিয়া এবং অসংখ্য মেয়েদের বীরত্বগাঁথা এ জুলাই। এ জুলাই কোন একক দলের না, একক গোষ্ঠীর না, একক মতের না, একক লিঙ্গের না। এ জুলাই যতটুকু পুরুষের তার থেকেও অধিক নারীদের।

সেসময়ের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে চট্টগ্রাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী পুষ্পিতা নাথ বলেন, “ জুলাই গণ আন্দোলনে নারীদের অকুতোভয় দুঃসাহসী সংগ্রামের গল্প। তারা ভাইয়ের লাশ কাধে নিয়ে মিছিল করেছিল, তারা প্রিজন ভ্যান থেকে ভাইদের ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিল,ছাত্রলীগের ভয়াবহ আক্রোশের মুখে পরেও তারা পিছপা হয়নি, নেতৃত্ব দিয়েছে, আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এমনকি স্লোগান দিয়ে রাজপথ উত্তাল করেছিল। মসজিদের ছাদে অপেক্ষা করেছে কবে ভাইদের মিছিল আসবে। জুলাইয়ে নারীর অবদান পুরুষের তুলনায় কোন অংশে কম নয়।”

অথচ বিজয়ের পর এসব ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বারবার ছিলো। ইতিহাস যেমন গৌরবোজ্জ্বল তেমনি সেটাকে বিকৃতি করারও চেষ্টা ছিলো। জুলাইয়ের পর নারীর ওপর মব, নারীর ওপর হেনস্তা, নারীকে গৃহবন্দী করা থেকে শুরু করে এহেন নিচ কাজ বাদ যায়নি যা দিয়ে নারীর এই ইতিহাসকে বিলীন করা যায়। প্রতিটি ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে চলেছে এই ঘৃণ্য কাজ। শুধু কি ক্যাম্পাস? বাদ যায়নি রাষ্ট্রও। আর আমরা যাদের হাতে রাষ্ট্র তুলে দিয়েছিলাম তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে অবাকও হয়েছি। গদিতে বসে তাদের বিবিধ বিষয়ে আস্ফালন অথচ নারীর হেনস্তায় টুঁ-শব্দটিও করেনি। জুলাইয়ে যাদের বুক আগলে রক্ষা করলো নারীরা তাদের থেকে প্রতিবাদ ছাড় হতে হয়েছে হেনস্তা। তবু নারীরা লড়ছে,লড়বে। যতদিন প্রীতিলতা ও রোকেয়ার বাংলা তৈরি না হবে নারীরা লড়াই করেই যাবে। নারীদের কখনো আটকে রাখা যায়নি, গৃহবন্দী করা যায়নি, পায়ে শেকল পড়ানো যায়নি। নারীরা শেকল ভাঙার গান গাইবে আর বারবার ব্যারিকেড ভাঙবে। সমস্বরে গেয়ে উঠবে মিছিলের গান।

আই/মারুফ শেখ

শেয়ার করুন -