গান হচ্ছে এমন এক অদৃশ্য শক্তি যা মানুষকে হাসায়, কাঁদায়, অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত করে। জে জি বাইডেন বলেন, সংগীত হলো এমন শাশ্বত ভাষা যার আবেদন দেশ, কাল, পাত্রভেদে অভিন্ন। পৃথিবীতে যখনই তৈরি হয়েছে বিপ্লব, সঙ্কট কিংবা যুদ্ধ তখনই মানুষের মনোবল শক্তিশালী করতে অবদান রেখেছে গান।
বাঙালি জাতির চিরন্তন সঙ্গী গান। ঈদের খুশি হোক বা পূজার আনন্দ, বৈশাখের রঙ হোক বা বিজয়ের গৌরব, প্রতিটি অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি গান। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে জাতীয় চেতনার প্রতিটি উত্থানে প্রতিবাদে সংগ্রামে গান হয়ে উঠেছে হাতিয়ার। ১৯৭১-এ গান জ্বালিয়ে দিল মুক্তির আগুন “মুক্তিরও মন্দিরে সোপান তলে” কিংবা “জয় বাংলা, বাংলার জয়” গানের আওয়াজে কেঁপে উঠেছিল শত্রুর হৃদয়। সেই গান, সুর আজও থেমে নেই। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন বাংলার মানুষ আবারও রাস্তায় নামে অন্যায়ের বিরুদ্ধে , তখনও গান অনুপ্রেরণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। গান হয়ে ওঠে আন্দোলনের হৃদস্পন্দন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মিছিলের স্লোগান, দেয়ালের গ্রাফিতি থেকে প্রতিবাদের মঞ্চ সব জায়গায় গানের লাইনগুলো জ্বলে উঠে স্ফুলিঙ্গের মতো। আন্দোলন চলাকালীন প্রকাশিত “কথা ক, আউয়াজ উঠা বাংলাদেশ” এর মতো র্যাপ গানগুলো দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। গানের প্রতিটি লাইন নাড়িয়ে দিয়েছে স্বৈরশাসকের গদি। পূর্বে প্রকাশিত কিছু গানও আন্দোলনের সময় যেন নতুন জীবন পায়। “আমার বিচার তুমি করো, তোমার বিচার করবে কে?” কিংবা “দেশটা তোমার বাপের নাকি”—এই গানগুলোর লাইন নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে প্রতিবাদে।
গান আন্দোলনে প্রাণ সঞ্চার করে। বিপ্লবে গানের ভূমিকা ও স্মৃতিচারণ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া সুলতানা বলেন, “আমার নিয়মিত গান শোনা হয়। জুলাইয়ের ওই সময়টাতে যখন চারদিকে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তখন আমিসহ সবারই মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। সে সময়টায় ‘ শোন মহাজন’, ‘কথা ক’ এই গানগুলো মনে বিদ্রোহের সঞ্চার করত। হতাশা থেকে নতুন উদ্যম পেতাম। গানেরও যে নিজস্ব শক্তি আছে তখন বুঝেছিলাম।”
শুধুমাত্র র্যাপ কিংবা আধুনিক গান নয় শতাব্দী পুরোনো নজরুলের বিদ্রোহ আর দ্বিজেন্দ্রলালের দেশপ্রেম—দুইয়ের সুর যেন একসূত্রে গেঁথে এক হয়ে ওঠে আন্দোলনের দিনগুলোতে। একদিকে নজরুলের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গর্জে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’-র মতো গান মানুষকে মনে করিয়ে দেয় তাদের শিকড়, তাদের দেশকে। প্রতিবাদের মঞ্চে, মিছিলে, দেয়ালের গ্রাফিতি থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার হ্যাশট্যাগে এসব গানের লাইনই তারুণ্যের সাহসের জ্বালানি।
গান মানুষের মনে বিদ্রোহ তৈরি করে। জুলাইয়ে গানের অবদান কতটুকু সেটা উঠে আসে বাংলাদেশ তরুণ লেখক ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাদিয়া আফরোজ গল্পে,“২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতা আন্দোলন জুলাই মাস হলো স্বৈরাচারী শাসণ থেকে দেশকে মুক্ত করার মাস। ‘আমার বিচার তুমি করো, তোমার বিচার করবে কে’, ‘ভুলে যাও তুমি ভুলে যাক পুরো জাতি’ এই গানগুলো ছাত্র জনতার কাছে জুলাইয়ের স্ফূলিঙ্গ। ১১ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হামলা হয়। ১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যার পর থেকে এই গানগুলো আন্দোলনে যোগদানে অনুপ্রাণিত করেছে। ১৮ জুলাই কুমিল্লা কোটবাড়ি বিশ্বরোডে ছাত্রলীগের হামলা, পুলিশের গুলি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট কোনোকিছু দমিয়ে রাখতে পারেনি। এই গানগুলো যেন একটা বিকল্প বেতার তরঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে পুরো জাতির কাছে।এই গানগুলো আজও রক্তাক্ত জুলাইয়ের দিনগুলোকে স্মরণ করায় ।
ইতিহাসে পাওয়া যায় যতবার বিপ্লব হয়েছে পৃথিবীতে ততবারই শক্তি জুগিয়েছে গান। মানুষের মনে ভাষা গানে প্রতিফলিত হয়। ২৪-এর বিপ্লবের অনুপ্রেরণার বাতিঘর গান। যতবার কোনো শাসক নিপীড়নের হাত বাড়াবে, ততবারই আন্দোলনের এই গানগুলো মানুষের কণ্ঠে বেজে উঠবে নতুন শক্তি হয়ে।
এফকে/জারিন তাসলিম