MCJ NEWS

পরিবহন সেবা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ, লিখিত অভিযোগ না পাওয়ার দাবি প্রশাসনের

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) পরিবহন সেবাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। যাত্রী ওঠানামার সময় ঝুঁকিপূর্ণ চালনা, চলন্ত অবস্থায় ফ্যান বন্ধ রাখা, বেপরোয়া ড্রাইভিং, চালক সংকট, আসনের স্বল্পতা, বৃষ্টিতে বাসের ভিতর পানি ঢুকে পড়া, মাঝপথে বাস বিকল হওয়া কিংবা সময়ের আগেই বাস ছেড়ে দেওয়া—এইসব অভিযোগ প্রায় নিয়মিতই উঠছে চালক ও সহকারীদের বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে সাত হাজার নিয়মিত শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ১৬টি বাস রয়েছে। এর মধ্যে আটটি নীল বাস এবং বাকি আটটি লাল (বিআরটিসি) বাস। এই বাসগুলোর বেশিরভাগই বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত।

শিক্ষার্থীরা জানান, লাল রঙের বাসগুলোর ছাদ থেকে হালকা বৃষ্টি হলেই পানি ঢুকে পড়ে, ফলে ভেতরে বসে যাতায়াত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। আবার অনেক বাসে ফ্যান নষ্ট থাকায় গরমের সময় যাতায়াত একপ্রকার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। অন্যদিকে, নীল বাসের চালকদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে বাস চলন্ত অবস্থায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্লাস কিংবা পরীক্ষায় দেরি হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী মিরাজ বলেন, “একদিন বিশ্বরোড থেকে আলেখার চড়ের দিকে বাসে উঠছিলাম। তখন বাসে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি ওঠেনি, এমন অবস্থাতেই চালক হঠাৎ টান দেন। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, ‘বাস ছেড়ে দিলে ভিতরে এমনিতেই জায়গা হবে।’ এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য।”তিনি আরও বলেন, “চালক ও হেলপাররা বাস চলন্ত অবস্থায়ও ফ্যান চালাতে চান না। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে শিক্ষার্থীরা বারবার বললেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আবার বাসগুলো অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগেই ছেড়ে দেয়, ফলে অনেকে টিউশন শেষে দৌড়ে এসেও বাস মিস করেন।”

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া রহমান তামান্না বলেন, “চালক ও হেলপারদের আচরণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বাড়ছে। অনেক সময় তারা স্টপেজ ছাড়া থামতে চান না এবং খারাপ ব্যবহার করেন। অবশ্য শিক্ষার্থীদেরও উচিত ভদ্রভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা।”

ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া বলেন, “বাসসেবার সমস্যাগুলো নতুন না। বহুবার বলা হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাস ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সচেতনতামূলক আলোচনা সভা বা সেমিনার আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েও কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালক বলেন, “কেউ বলেন, ‘মামা জোরে চালান’, আবার কেউ বলেন, ‘আস্তে চালান’। একটা বাসে ৭০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী থাকে—সবার কথা শোনা সম্ভব হয় না। অনেকেই স্টপেজ মিস করেন, তখন জায়গায় জায়গায় থামতে হলে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা তো শিক্ষার্থীদেরই ভাই-বোন মনে করি। কিন্তু অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি হয়। কেউ আমাদের সঙ্গে রাগ করে কথা বলেন, কেউ নম্রভাবে। শিক্ষার্থীরা যদি আমাদের আরেকটু সহয়োগিতা করে তাহলে আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

পরিবহন পুলের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “বাসসংক্রান্ত অভিযোগ থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে বাস্তবতা হলো, আমাদের গাড়ির সংখ্যা ও জনবল—দুটোই সীমিত। অথচ শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী ২০ শতাংশ যানবাহন রিজার্ভ থাকার কথা থাকলেও, আমাদের মোট যানবাহনই যথেষ্ট নয়।”

পরিবহন পুলের অভিযোগ ও পরামর্শ বই

তিনি জানান, “শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করলেও, লিখিতভাবে তা আমাদের কাছে পৌঁছায় না। অথচ সমস্যা সমাধানে লিখিত অভিযোগ বেশি কার্যকরী। আমি প্রতিদিন অভিযোগ বই দেখি, কিন্তু সেখানে শিক্ষার্থীদের সরাসরি অভিযোগ থাকে না বললেই চলে। তাই আমি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানাই, যেকোনো অভিযোগ যেন সরাসরি আমাদের কাছে জানান।

”বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলী বলেন, “সমস্যাগুলোর কথা আমাদের কানে এসেছে। আমরা খুব শিগগিরই পরিবহন পুলের সংশ্লিষ্টদের ডেকে আলোচনা করব। সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলে একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করব।”

/আসিফ মাহমুদ

শেয়ার করুন -