“কলমের ধার তলোয়ারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী” এই পুরনো প্রবাদটি আবারও সত্য প্রমাণিত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। যখন বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এক অভিনব সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিটি পরতে তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও সাহসী অবস্থান তুলে ধরে জাতিকে এক নতুন আলোচনার মুখোমুখি করে তোলে। সংবাদের ফ্ল্যাশ, রিপোর্টারের কণ্ঠ, টিভি টকশোর বিশ্লেষণ, এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ স্ট্রিম, সব মিলিয়ে জুলাই বিপ্লব শুধু রাজপথেই নয়, ছড়িয়ে পড়ে পর্দার দুই প্রান্তেও।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ধরনের তরঙ্গ তৈরি হয়, তা ইতিহাসের পাতায় বিশেষ স্থান পাওয়ার দাবি রাখে। এই আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে গণমাধ্যম যেমন জনমত গঠন করেছে, তেমনি সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনার চেষ্টাও করেছে। একদিকে কিছু চ্যানেল যেখানে নিরপেক্ষ সংবাদ প্রচার করে পরিস্থিতির সত্য চিত্র তুলে ধরেছে, অন্যদিকে কিছু গণমাধ্যম পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করায় সমালোচিতও হয়েছে। সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, এবং সোশ্যাল মিডিয়া সবগুলো মিলিয়ে গণমাধ্যম হয়ে উঠেছিল একটি ‘দ্বৈত ভূমিকার’ ক্ষেত্র। যার ভূমিকা গুলো এভাবে উল্লেখ করা যায়- প্রতিবেদন ও প্রভাব, দৃষ্টিভঙ্গি ও দিকনির্দেশনা, প্রশ্ন ও জবাব।
জুলাই বিপ্লবকে ক্যামেরা বন্দী করতে গিয়ে সাংবাদিকরা নানা ধরনের সেন্সরশিপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। সরকার পক্ষের চাপ, মিডিয়াহাউজের পলিসি ও ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে নিউজ করতে গিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিলেন অনেকেই।
মিডিয়া কভারেজে গিয়ে যে সকল বাঁধার মুখোমুখি হয়েছেন সাংবাদিকরা সেটির বিবরণ ওঠে এসেছে নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক ‘সময় টেলিভিশন’ এর এক প্রতিবেদকের বর্ণনায়। তিনি বলেন, নিউজ কভারেজের ক্ষেত্রে নানা ধরণের বিধিনিষেধ মেনে চলতে হতো। প্রত্যেকটা ফুটেজ চেক করা লাগতো ভালো ভাবে, কোনো শব্দ বা বাক্যে যদি একটু কিছু ভুল হয় তাহলে বড় ধরণের খেসারত দিতে হতো সবাইকে। লাইভের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়া হতো, কেউ যেন সংঘর্ষের দিকে ক্যামেরা ফোকাস না করে। গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সব সময়ই মিডিয়াতে ফোন আসে। মূলত মিডিয়ার অন্দরমহল অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে গোয়েন্দা সংস্থা। প্রতিটি নিউজের খুঁটিনাটি দেখার জন্য তাদের মিডিয়া পার্সন রয়েছে, একটু ভুল কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কিছু হলে তারা মিডিয়াতে ফোন দেয়। আর কন্টেন্ট সরানোর মতো ঘটনা খুব কম! কারণ ঐ রিস্কটাই কেউ নিতে চাইতো না। সরকারের পক্ষে গেলে টিকে থাকা সহজ, জনগণের পক্ষে গেলে সবাই বাহবা দেয় ঠিকই কিন্তু চাপ নিজেদেরই সামলাতে হয়। তাই সব মিডিয়া সহজ পলিসি হিসেবে সরকারের পক্ষেই থাকার চেষ্টা করতো। সরকার নির্দেশ দিলে একদিনের ভেতরই লাইসেন্স বন্ধ তাই কেউই রিস্ক নিতো না।
আন্দোলনে সাংবাদিকরা যেমন শারিরীক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল ঠিক তেমনি নৈতিক দায়ও তাদের ছিলো। মহাসঙ্কটে সত্য তুলে ধরতে গিয়ে নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়া ছিলো তখন নিত্যদিনের ঘটনা।
জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করে ‘ডেইলি সান’ এর মাল্টিমিডিয়ার রিপোর্টার আবু বকর রায়হান বলেন, জুলাই আন্দোলনের শুরুটা যখন হয়, তখন আমি ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ পত্রিকায় ডিজিটাল মিডিয়ায় লিড মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আমাদের আন্দোলন কাভার করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি দুটি সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করতে হয়েছে তারপর অফিস এসে রিপোর্ট প্রচার করার জন্য ছিলো না ইন্টারনেট। মাঝে মাঝে কিছু সময়ের জন্য নেট পেয়েছি তার মাধ্যমে কাজ চালিয়ে গেছি। আন্দোলনের শুরু থেকে প্রতিদিনের বাংলাদেশের ডিজিটাল ভার্সনে ‘সাংবাদিকতা’ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রচার করতে গিয়ে গভীর রাতে র্যাব অফিসে হানা দেয়৷ আমাদের একজন সংবাদকর্মীকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে। পুরো দেশ জুড়ে থাকা ফ্যাসিবাদের থাবা থেকে মুক্ত ছিলো না গণমাধ্যম। ১৭ জুলাইয়ের পর ফ্যাসিবাদের নির্দেশে গণমাধ্যম আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্ত শব্দ ব্যবহার শুরু করে৷ এ বিষয়টা পত্রিকা গুলোতে ব্যবহার হলেও আমরা ডিজিটাল মাধ্যমে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা হিসেবেই উল্লেখ করেছি। এর জন্য অফিসকে অনেক চাপও নিতে হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যম কিংবা স্বাধীন সাংবাদিকতা অত্যাচারী শাসকের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই শেখ হাসিনার শাসনামলে বিভিন্ন রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ২৪ এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে অনেক শক্তভাবে সাংবাদিতকতার টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিলো, অনেক সাংবাদিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছিলেন। আমরাও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না৷ প্রশাসন থেকে ভয়-ভীতি কিংবা কখন ডিবি অফিসের ডাক পড়ে, এমন একটা আশঙ্কা নিয়েই থাকতে হয়েছে পুরোটা সময়। তবে এত চাপ থাকার পরও আমরা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করেছি। যার প্রমাণ রয়েছে কিছু প্রতিবেদনে, যা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলো আন্দোলনের সময়ে।
দেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সংবাদ প্লাটফর্ম এর সাংবাদিক নাজমুস সাকিব জুলাইয়ে নিউজ কভারেজের বর্ণনা করে বলেন, যখন কোনো দেশে একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে দেশের জনগণ ও দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যেতে হয়। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং দেশের ভাবমূর্তি যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু আমরা সাংবাদিক হলেও আমাদের আরেকটি পরিচয় আমরা মানুষ। গত বছরের জুলাই আন্দোলনে যখন আমাদের চোখের সামনে শত শত ভাই ফ্যাসিস্ট সরকারের বাহিনী দ্বারা আহত হতে দেখেছি তখন একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে তাদের যতটুকু সাহায্য করা সম্ভব তা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে দেশের বিভিন্ন বাহিনী যেমন তার কাছে জিম্মি ছিল, তেমনি অনেক গণমাধ্যমও বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ইশারায় চলতো।
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, গণমাধ্যম কেবল তথ্যপ্রবাহ নয় বরং এটি সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশক। যখন সংবাদপত্র সাহস দেখায়, তখন ইতিহাস গড়ে ওঠে। আর নীরবতা সমাজে সন্দেহের জন্ম দেয়। গণমাধ্যমের অবস্থানই বলে দেয় তারা জনগণের পক্ষে না শাসকের পাশে। তথ্যের স্বাধীনতা রক্ষা করেই গণমাধ্যম হয়ে উঠতে পারে প্রকৃত জনগণের কণ্ঠস্বর।
এফকে/ অঙ্কিতা, পলি, তুহিব