দিনপঞ্জি অনুসারে ৩০ দিনে এক মাস হলেও ২০২৪ সালের জুলাই মাস যেন সময়ের সেই নিয়ম মানতে অস্বীকৃতি জানায়। সময় চলছিলো স্বাভাবিক নিয়মে ৩১ জুলাই পেরিয়ে ১ আগস্ট, ২ আগস্ট… কিন্তু আন্দোলনের উত্তাপ ও শহীদদের অকালমৃত্যু তখন এতটাই গভীর ছিলো যে দিনপঞ্জিকার তারিখ যেন মানুষের অনুভূতির সাথে তাল মেলাতে পারছিলো না। পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, আর গগনবিদারী স্লোগানে ঢেকে গিয়েছিলো শহরের দেয়াল।যেখানে উচ্চারিত হচ্ছিলো
“সারা বাংলা খবর দে,কোটাপ্রথার কবর দে”
“দফা এক দাবি এক,স্বৈরাচারের পদত্যাগ”।
৩১ জুলাই হয়ে উঠেছিল ৩৬ জুলাই! কিভাবে পেল মানুষ এই অনুপ্রেরণা তারই বর্ণনা উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব নন্দীর কথায়। তিনি বলেন, “জুলাই ৩৬ দিনের গল্প”টি একটি প্রতীকি ভাষ্য। যেখানে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করে একটি বিক্ষোভ, একটি রাজনৈতিক চেতনা, একটি নাগরিক অবস্থান আত্মপ্রকাশ করে। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের অতিরিক্ত দিন নয় বরং সময় ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নাগরিক প্রতিরোধের রূপক।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দ্বৈত বার্তা দেয়। প্রথমত, তারা দেখে প্রতিরোধ সম্ভব, রাষ্ট্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। কিন্তু একসঙ্গে তারা এটাও শিখে আদর্শহীন রাজনীতিতে সেই প্রতিরোধের ফলাফলও নিয়ন্ত্রিত হয় ক্ষমতার কারবারিদের হাতে। তাই তরুণেরা হয়তো ভবিষ্যতে রাজনীতি থেকে আরও সরে যাবে, কিংবা শিখে নেবে প্রতিরোধের ভাষা থাকলেও, ফল নির্ধারণ করে দেয় সিস্টেম, প্রতিষ্ঠান এবং এলিট শ্রেণি।
প্রতিটি দিনেই নতুন কিছু ঘটছিলো। নতুন গ্রেপ্তার, নতুন হামলা, নতুন প্রতিরোধ। সময় থেমে গিয়েছিলো কিংবা বলা যায় একটি দীর্ঘ জুলাইয়ের ভেতরে আটকে গিয়েছিলো বাংলাদেশ। এ যেন এক প্রতীকী সময় ‘৩৬ জুলাই’। এই ৩৬ জুলাই ছিলো না কোনো ক্যালেন্ডারে, ছিলো মানুষের হৃদয়ে। এই সময়টাকে অনেকে বলছেন, শোক ও প্রতিরোধের সময়। কেউ কেউ বলছেন, এটা ছিলো এক নতুন রাজনৈতিক চেতনার জন্মকাল। যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, তারা শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে নয়,তারা নেমেছিলেন একটি অসুস্থ ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফ ভূইয়া বলেন, ‘৩৬ জুলাই’ এর সূচনা হয়েছিলো সরকারের মৌলিক অধিকার খর্ব করার কারনে। যেখানে চাকরির মতো মৌলিক বিষয়ে দুর্নীতি এবং দল দাশদের নিয়োগ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে লীগ পন্থী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এটার কারনেই সকল শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। এই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিলো দীর্ঘদিনের। পতিত খুনী হাসিনা সরকারের অপশাসন , দুঃশাসন এবং গুম, খুনের কারনে এদেশের মানুষ বিক্ষুব্ধ ছিলো। তাদের ক্ষোভ সুনামির রূপে আবির্ভূত হয় যখন নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছিলো। যার কারনে ৩৬ জুলাই বাংলার বুকে নেমে আসে। এ সময়ের মধ্যেই আমরা হারিয়েছি আবু সাইদ,মুগ্ধসহ আরও অনেকজনকে।যাদের জীবনপ্রবাহ থেমে গেছে, কিন্তু যারা আমাদের অন্তরে অমর হয়ে আছেন। শহীদদের জন্য শোকের পাশাপাশি ছিলো রাগ, বেদনা ও ভবিষ্যত নিয়ে সংশয়।
জুলাই-বর্ষার বিপ্লবের স্মৃতিচারণ করে কুবির শিক্ষার্থী পাবেল রানা জানান – “এখনো গায়ের লোম দাড়িয়ে যায়!আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমি যেকোনো সময় শহীদ হয়ে যাব এবং এর জন্য আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। সেই সময়ের প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত আমাদের আতঙ্কে কেটেছে। আমরা যখন শুনতাম কুমিল্লা মহানগর থেকে ২৫০+ বাইক, গাড়ি ও আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগ আসছে আমাদের হলে হামলা করতে তখন স্বাভাবিকভাবেই ভয় গ্রাস করেছিল। কিন্তু আমরা সাহস হারাইনি। হল ত্যাগ করিনি। সেই আতঙ্কেও আমরা স্লোগানে সমগ্র হল কেঁপেছিল! ‘হল আমরা ছাড়ছি না, হল কারো বাপের না!’
তিনি আরো বলেন, “২০২৪ সালের সেই আন্দোলন শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সচেতনতা, ঐক্যের চেতনা ও দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেম গড়ে তুলে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থীরাও বুঝতে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতি তাদের জীবনকে কেমনভাবে প্রভাবিত করে। এই অভ্যুত্থান তাদের শিখিয়েছে সংগ্রাম মানে শুধু স্লোগান নয়, এটা আত্মত্যাগ ও আদর্শে অবিচল থাকার নাম। অনেকে নিজেদের জীবনের লক্ষ্যই পুনর্বিন্যাস করেছেন সেই অভিজ্ঞতা থেকে। মূলত জেন-জি’রা জীবনের মায়া ত্যাগ করে আন্দোলন করেছে দেশপ্রেমের কারণেই। “
এইভাবে দিনগুলো কেটেছে, কিন্তু তারিখ বদলায়নি হৃদয়ে। তাই সময়ের হিসেব একপাশে সরিয়ে রেখে মানুষ বলছে এখনো “৩৬ জুলাই” চলছে। এই ‘৩৬ জুলাই’ এই জাতিকে শিখিয়ে দিয়েছে, প্রতিবাদ একদিনের নয়, শোক একমাসের নয়, আর ইতিহাস কোনো তারিখের গণ্ডিতে আটকে থাকে না।
এফকে/ মৌ, হাসিন