MCJ NEWS

হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিনে পাঠকদের ভাবনা

বাংলা সাহিত্য, টেলিভিশন ও সিনেমার ইতিহাসে এমন একজন মানুষ আছেন, যাঁকে আলাদা করে চেনাতে হয় না। যার নাম উচ্চারিত হলেই শীতের বিকেলে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে থাকা আর হাতে হিমু কিংবা মিসির আলী বই, তিনি সবার প্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ। তিনি শুধু একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সময়ের প্রতিচ্ছবি। তাঁর লেখায় যেমন হাসি আছে, তেমনি আছে কান্না, বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন আর সাধারণ মানুষের মায়া। তাঁর সৃষ্টি যেন এক আয়না, যেখানে মানুষ নিজেদের গল্প খুঁজে পায়।

যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ তখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। মানুষ ক্লান্ত, অবসন্ন, তবুও বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা নিয়ে আবার হাসতে শিখছিল। ঠিক সেই সময়েই তিনি এলেন আশার আলো হয়ে। ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘কোথাও কেউ নেই’ কিংবা ‘এই শৃঙ্খল’ প্রতিটি গল্পে তিনি যেন নতুন করে চিনিয়েছেন মানুষকে, সম্পর্ককে, জীবনকে।

আজ ১৩ই নভেম্বর সেই মহান কথাসাহিত্যিকের জন্মদিন। তিনি নেই কিন্তু তাঁর শব্দ, সংলাপ আর চরিত্রগুলো আজও তাঁর পাঠকের জীবনের অংশ। স্মৃতিতে লুকিয়ে আছে তার শ্রেষ্ঠ সব সৃষ্টি। যেখানে এখনো বেঁচে আছে হুমায়ুন আহমেদের জাদু, মায়া আর অবিচল মানবিকতা। এই বিশেষ দিনে অনেকে ফিরে দেখেছেন তাঁদের প্রিয় লেখককে। জানিয়েছেন, তাঁদের স্মৃতির ভেতর কেমন করে বেঁচে আছেন হুমায়ুন আহমেদ।

প্রিয় লেখকের স্মৃতিচারণ করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আলভিন আইমা বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ’ নামটাই যেন সাহিত্যপ্রেমী মানুষের মনের ভূখণ্ডে এক টুকরো আবেগ হয়ে আছে। বাংলা সাহিত্য পড়েন কিন্তু হুমায়ূন পড়েননি, এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া যাবে কি-না ঢের সন্দেহ আছে আমার। তিনি শুধু গল্পের জাদুকর ছিলেন না, তাঁর লেখার মতো নাটক-সিনেমাও সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল মানুষের মনে। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘বহুব্রীহি’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘আজ রবিবার’-এর মতো অমর সৃষ্টির স্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদ। গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের ৭৮তম জন্মদিন। অবশ্য হুমায়ূনকে মনে রাখতে জন্মদিবসের প্রয়োজন নেই। তিনি আছেন কোটি কোটি পাঠকের মনে। যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে, ততদিন ঠিক একইভাবে থেকে যাবেন হুমায়ূন।

হিমু, মিসির আলী কিংবা রূপা এই চরিত্র গুলো গেঁথে আছে তাঁর পাঠকদের মনে। তবে তার গতানুগতিক লেখা থেকে কিছুটা ব্যাতিক্রমধর্মী লেখা নিয়ে কথা বললেন আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জাফ্রিনা আলম জ্যোতি। তিনি বলেন, হুমায়ুন আহমেদের সিংহভাগ জনপ্রিয়তা বলা যায় তার কাল্পনিক রচনাসমূহের জন্য। কিন্তু ‘বাদশাহ নামদার’ এই বইটি সেই ধারার একদম ভিন্নতর সৃষ্টি। এখানে হুমায়ুন নিজের লেখার আদলে বাদশাহ হুমায়ুনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। যেখানে তাঁর রাজনৈতিক অযোগ্যতা দিয়ে ইতিহাসে তাঁকে চিত্রায়ণ করা হয় , সেখানে তাঁর ধর্মসহিষ্ণু-মানবিক আর অত্যন্ত ধৈর্যশীল সত্ত্বাকে চিত্রায়িত করেন লেখক হুমায়ূন! ইতিহাস তাকে পরাজিত সম্রাট হিসেবে চিনে থাকলেও, এখানে তাকে দেখানো হয় বিশ্বাসঘাতকতায় নির্বিকারচিত্তের শীতল নদীসম ব্যাক্তিত্ব হিসেবে। আমি হুমায়ুন আহমেদ এর জন্মদিনে তাঁর রচিত এমন সব বিরল সৃষ্টি পড়ার ইচ্ছা পোষণ করছি।

রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী অদ্রিতা রায়ের জীবন দর্শনে জড়িয়ে গেছেন হুমায়ূন আহমেদের আরেক সৃষ্টি ‘শুভ্র’। তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদের শুভ্র চরিত্র আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। শুভ্র’র কয়েকটা গুণ আমার ভালো লাগে, তার মধ্যে একটা হলো – মিথ্যা কথা না বলা, বলতে না পারা। আমি নিজেও মিথ্যা বলতে পারি না, পারলেও ভেতরে এক অস্থিরতা কাজ করে । শুভ্র আমাকে শিখিয়েছে—সত্য বলার জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। সে জানে, মানুষ ভুল করবে, তবুও সে মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারায় না। একসময় শুভ্রর সরলতাগুলো আমার কাছে বোকামি মনে হতো। মনে হতো, এতটা সহজ হওয়া যায়? এতটা নির্ভেজাল? কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছি যে এই সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক সৌন্দর্য , যা আজকের সমাজে প্রায় বিলুপ্ত। তার জীবনদর্শনগুলো আমার জীবনে এখন এতই প্রভাব ফেলছে যে আমি এটা প্রায় সময়ই প্রয়োগ করার চেষ্টা করি।

নব্বই দশকেও শাসন করেছেন, হুমায়ুন আহমেদ এখনো পাঠক প্রিয়। ইন্টারনেটের যুগে এসেও তার বইয়ের জনপ্রিয়তার কমতি নেই। তাঁর এই তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে তাঁরই পাঠক লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার শিমু বলেন, একজন পাঠক হিসেবে আমি এতটুকু বলতে পারি যে হুমায়ুন আহমেদ পাঠক মহলে এখনো জনপ্রিয় থাকার একটাই কারণ, তা হলো তিনি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। তাঁর লেখার ভাষা ছিল খুবই সহজ এবং প্রানবন্ত। খেয়াল করলে দেখা যায়,হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসের মূল ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের সুখ, দুঃখ, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সম্পর্কের টানাপোড়নের গল্প।পাঠক মহল এসব গল্পের সাথে খুব সহজে ই নিজের জীবনপর বিভিন্ন দিক মিলাতে পারে। তার রচনায় ছিল সহজ ও অদ্ভুত এক আবেগের মিল। হুমায়ুন আহমেদ তার লেখনী দ্বারা পাঠকের আকর্ষণ ধরে রাখার এক অদ্ভুত মায়া জানতেন। সেই মায়ার কারণেই হয়তো পাঠক মহলে এখনো এত জনপ্রিয়।

হুমায়ুন আহমেদ প্রমাণ করছেন গভীর সাহিত্য মানেই কঠিন ভাষা নয়। তিনি দেখিয়েছেন সহজ, সরল শব্দের মধ্যেও কত গভীর অনুভূতি লুকিয়ে থাকতে পারে। তিনি এমনভাবে লিখেন, যেন গল্প নয় আমাদেরই জীবনের অংশ বইয়ের পাতায় উঠে এসেছে। তাঁর গল্পে হাসি আছে, আছে অশ্রুও;আছে জীবনের আলো, আছে মৃত্যুর ছায়া। এই ভারসাম্যই তাঁকে সময়ের সীমানা পেরিয়ে এক চিরকালীন লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সময় বদলাচ্ছে, পাঠকের রুচি পাল্টাচ্ছে, কিন্তু হুমায়ুন আহমেদের লেখা আজও আগের মতোই জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কারণ তিনি যে বিষয়গুলোকে লেখালেখি করে গেছেন সেগুলো কখনো পুরোনো হয় না। হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্য আয়না, সেখানে পাঠকরা নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়। তাই তাঁর গল্প শুধু পড়ে শেষ হয় না, মনে রয়ে যায়।

এফকে/ কাঁকন, অন্তু

শেয়ার করুন -