MCJ NEWS

বরফ মানব

হারুকি মুরাকামির পরাবাস্তব ছোটগল্প ‘আইসু ওতোকো’ (আইস ম্যান) হিমশীতল রূপকের মধ্য দিয়ে একাকীত্ব, স্মৃতি আর বিষণ্ন দাম্পত্যের গল্প বলে। জাপানি ভাষায় লেখা এই গল্পটি রিচার্ড এল. পিটারসনের ইংরেজি অনুবাদে ২০০৩ সালে দ্য নিউ ইয়র্কার-এ প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে পাঠকের মনে জায়গা করে নেয়, এবং পরে ‘ব্লাইন্ড উইলো, স্লিপিং ওম্যান’ সংকলনে স্থান পায়। বরফে ঢাকা সম্পর্কের মতোই গল্পটির আবহ নিথর ও ম্লান—যেখানে অতীতের ভার বর্তমানকে ধীরে ধীরে জমাট বাঁধিয়ে দেয়।

প্রথম পর্ব।

আমি বিয়ে করেছিলাম একজন বরফ মানবকে। ​তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল একটি স্কি রিসোর্টের হোটেলে। বরফ-মানবের সাথে দেখা করার জন্য হয়তো সেটাই ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে জুতসই জায়গা। হোটেলের লবি তখন একঝাঁক প্রাণোচ্ছ্বল তরুণ-তরুণীর ভিড়ে পরিপূর্ণ, কিন্তু সেই বরফ-মানবটি আগুনের কুন্ডলী থেকে সবচেয়ে দূরের কোণটায় একাকী একটা চেয়ারে বসে নিবিষ্ট মনে বই পড়ছিল। যদিও ঘড়িতে তখন প্রায় দুপুর, কিন্তু ভোরের সেই কনকনে হিমশীতল আলোটা যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল।

​“দেখো দেখো, ওটা একটা বরফ-মানব,” আমার বান্ধবী ফিসফিস করে বলেছিল।​কিন্তু সেই মুহূর্তে বরফ-মানব আসলে কী, সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। আমার বান্ধবীরও ছিল না। “ও নিশ্চয়ই বরফ দিয়ে তৈরি। সেইজন্যই বোধহয় ওকে বরফ-মানব বলে,” সে খুব গম্ভীর মুখে কথাগুলো আমাকে বলল, যেন কোনো ভূত কিংবা ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত কোনো মানুষের কথা বলছে।

​মানুষটা ছিল দীর্ঘকায় এবং তাকে দেখে যুবক বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু তার খাড়া খাড়া তারের মতো চুলে সাদা সাদা ছোপ ছিল, যেন জমে থাকা তুষারপুঞ্জ। তার চোয়ালের হাড়গুলো পাথরের মতো তীক্ষ্ণভাবে বেরিয়ে ছিল, আর তার আঙুলগুলোতে জমে ছিল সাদা বরফ যা দেখে মনে হচ্ছিল কোনোদিন গলবে না। এছাড়া অবশ্য তাকে একজন সাধারণ মানুষের মতোই মনে হচ্ছিল। তাকে ঠিক সুদর্শন বলা যায় না, তবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে তাকে বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। যাইহোক, তার কোনো একটা ব্যাপার আমার হৃদয়ে বিঁধে গেল, আর আমি সেটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করলাম তার দু’চোখে। তার দৃষ্টি ছিল শীতের সকালে বরফকুচির ভেতর দিয়ে আসা আলোকচ্ছটার মতোই নিস্তব্ধ আর স্বচ্ছ। মনে হচ্ছিল যেন এক কৃত্রিম শরীরের ভেতর প্রাণের একমাত্র স্ফুলিঙ্গ।
​আমি সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দূর থেকে বরফ-মানবটিকে পর্যবেক্ষণ করলাম। সে একবারও মাথা তুলে তাকাল না। সে শুধু নড়াচড়া না করে বসে ছিল, নিজের বই পড়ছিল যেন তার আশেপাশে কেউ নেই।

​পরের দিন সকালেও বরফ-মানবটিকে ঠিক একই জায়গায় একইভাবে বই পড়তে দেখা গেল। দুপুরে যখন আমি ডাইনিং রুমে লাঞ্চ করতে গেলাম, কিংবা সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে স্কি করে ফিরে এলাম—সে তখনও সেখানেই ছিল, তার সেই একই চাউনি দিয়ে একই বইয়ের পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে। এর পরের দিনও একই ঘটনা ঘটল। এমনকি যখন সূর্য হেলে পড়ল আর রাত ঘনিয়ে এল, সে তার চেয়ারেই বসে রইল; জানলার বাইরের নিথর শীতকালীন দৃশ্যের মতোই নিস্তব্ধ হয়ে।

​চতুর্থ দিন বিকেলে আমি কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে স্কি করতে বাইরে গেলাম না। আমি একাই হোটেলে রয়ে গেলাম এবং লবিতে কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে পায়চারি করলাম, যা তখন ভুতুড়ে শহরের মতো জনশূন্য ছিল। সেখানকার বাতাস ছিল উষ্ণ আর আর্দ্র, আর পুরো ঘরে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণ গন্ধ লেগে ছিল—মানুষের জুতোর তলায় বয়ে নিয়ে আসা তুষার যা আগুনের কুন্ডলীর সামনে এখন গলে যাচ্ছে, তারই গন্ধ। আমি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম, দু-একটা খবরের কাগজের পাতা ওল্টালাম, তারপর বরফ-মানবটির কাছে গিয়ে সাহস সঞ্চয় করে কথা বললাম।অপরিচিতদের সাথে কথা বলতে আমি সাধারণত খুব লজ্জা পাই এবং আহামরি জোরালো কারণ না থাকলে সচরাচর আগ বাড়িয়ে কথা বলি না। কিন্তু কেন জানি এই বরফ-মানবের সাথে যেভাবেই হোক কথা বলার জন্য আমি তীব্র টান অনুভব করছিলাম। হোটেলে এটাই ছিল আমার শেষ রাত, আর আমার ভয় হচ্ছিল যে এই সুযোগটা যদি হাতছাড়া করি, তবে কোনোদিন আর কোনো বরফ-মানবের সাথে কথা বলার সুযোগ পাব না।

​”আপনি কী স্কি করেন না?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে।
​সে খুব ধীরে তার মুখটা আমার দিকে ফেরাল, যেন সে অনেক দূর থেকে কোনো শব্দ শুনতে পেয়েছে, এবং তার সেই চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। তারপর সে শান্তভাবে মাথা নাড়ল। “আমি স্কি করি না,” সে বলল। “আমি শুধু এখানে বসে থাকতে, বই পড়তে আর তুষারপাত দেখতে পছন্দ করি।” তার কথাগুলো তার মাথার ওপর সাদা মেঘের মতো তৈরি হচ্ছিল, যেন কমিক বইয়ের কোনো ক্যাপশন। আমি সত্যি সত্যিই বাতাসে শব্দগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম, যতক্ষণ না সে তার তুষার-জমা আঙুল দিয়ে সেগুলো মুছে দিল।
​আমি এরপর কী বলব বুঝতে পারলাম না। লজ্জায় লাল হয়ে শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম। বরফ-মানবটি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল বলে মনে হলো।
​”আপনি কি বসতে চান?” সে জিজ্ঞেস করল। “আপনি আমাকে নিয়ে আগ্রহী, তাই না? আপনি জানতে চান বরফ-মানব আসলে কী।” তারপর সে একটু হাসল। “রিলেক্স, চিন্তার কিছু নেই। বরফ মানবের সাথে কথা বললে আপনার সর্দি লেগে যাবে না।”

​আমরা লবির কোণায় একটা সোফায় পাশাপাশি বসলাম এবং জানলার বাইরে তুষারকণাদের নাচ দেখতে লাগলাম। আমি এক কাপ হট কোকো অর্ডার করে সেটা পান করলাম, কিন্তু বরফ-মানবটি কিছুই খেল না। আমার মনে হলো সে-ও আমার মতোই কথাবার্তায় খুব একটা পটু নয়। শুধু তাই নয়, আমাদের মধ্যে কথা বলার মতো কোনো বিষয়ও ছিল না। প্রথমে আমরা আবহাওয়া নিয়ে কথা বললাম। তারপর হোটেল নিয়ে। “আপনি কি এখানে একাই এসেছেন?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম। “হ্যাঁ,” সে উত্তর দিল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি স্কি করতে পছন্দ করি কি না। “খুব একটা না,” আমি বললাম। “আমি শুধু আমার বন্ধুদের জোরাজুরিতে এসেছি। সত্যি বলতে আমি খুব কমই স্কি করি।”
​আমার অনেক কিছু জানার ছিল। তার শরীর কি সত্যিই বরফ দিয়ে তৈরি? সে কী খায়? গ্রীষ্মকালে সে কোথায় থাকে? তার কি পরিবার আছে? এই জাতীয় প্রশ্ন। কিন্তু বরফ-মানবটি নিজের সম্পর্কে কিছুই বলল না, আর আমিও ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম।

​বরং বরফ-মানবটিই আমার সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করল। আমি জানি এটা বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু সে অদ্ভুতভাবে আমার সম্পর্কে সবকিছুই জানত। সে আমার পরিবারের সদস্যদের কথা জানত; সে আমার বয়স, আমার পছন্দ-অপছন্দ, আমার স্বাস্থ্যের অবস্থা, আমি কোন স্কুলে পড়ছি আর কোন বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করছি—সবই জানত। এমনকি সে আমার অতীতের এমন সব ঘটনার কথা জানত যা অনেক আগেই ঘটেছিল এবং আমি নিজেও ভুলে গিয়েছিলাম।
​”আমি বুঝতে পারছি না,” আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বললাম। মনে হচ্ছিল যেন একজন অপরিচিত মানুষের সামনে আমি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। “আপনি আমার সম্পর্কে এত কিছু কীভাবে জানেন? আপনি কি মানুষের মন পড়তে পারেন?”
​”না, আমি মন পড়তে বা ওরকম কিছুই করতে পারি না। আমি শুধু জানি,” বরফ-মানবটি বলল। “আমি শুধু জানি। এটা অনেকটা এমন যেন আমি গভীর বরফের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে আছি, আর যখন আমি তোমার দিকে এভাবে তাকাই, তোমার সম্পর্কে সবকিছু আমার কাছে স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।”
​আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি আমার ভবিষ্যৎ দেখতে পান?”
​”আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না,” সে ধীরে ধীরে বলল। “ভবিষ্যতের ওপর আমি কোনো আগ্রহই নেই। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। কারণ বরফের কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। এর মধ্যে যা থাকে তা হলো এর ভেতরে আবদ্ধ থাকা অতীত। বরফ এভাবেই জিনিসগুলোকে সংরক্ষণ করতে পারে—খুব পরিষ্কারভাবে, স্পষ্টভাবে এবং সজীবভাবে, যেন সেগুলো এখনও বেঁচে আছে। এটাই বরফের সারসত্তা।”

​”সে তো বেশ ভালো,” আমি বললাম এবং হাসলাম। “এটা শুনে স্বস্তি পেলাম। সত্যি বলতে, আমার ভবিষ্যৎ কী হবে তা আমি নিজেও জানতে চাই না।”

শহরে ফিরে আসার পর আমাদের আরও বেশ কয়েকবার দেখা হলো। শেষ পর্যন্ত আমরা ডেট করতে শুরু করলাম। তবে আমরা কখনো মুভি দেখতে বা কফি শপে যেতাম না। এমনকি রেস্তোরাঁতেও যেতাম না। সে বলতে গেলে কিছুই খেতো না। এর বদলে, আমরা সবসময় পার্কের কোনো এক বেঞ্চে বসে কথা বলতাম—বরফ-মানব নিজের সম্পর্কে ছাড়া আর যেকোনো বিষয়ে কথা বলত।​”এরকম কেন?” আমি তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। “কেন তুমি নিজের সম্পর্কে কিছু বলো না? আমি তোমার সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানতে চাই। তোমার জন্ম কোথায়? তোমার বাবা-মা কেমন? তুমি বরফ-মানবই বা হলে কীভাবে?”
​বরফ-মানব কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর মাথা নাড়ল। “আমি জানি না,” সে খুব শান্ত ও স্পষ্টভাবে বলল, তার মুখ থেকে একগুচ্ছ সাদা মেঘের মতো কথা বাতাসে বের হয়ে এল। “আমি অন্য সবকিছুর অতীত জানি। কিন্তু আমার নিজের কোনো অতীত নেই। আমি জানি না আমার জন্ম কোথায় হয়েছে, কিংবা আমার বাবা-মা দেখতে কেমন ছিলেন। এমনকি আমার কোনো বাবা-মা ছিল কি না তাও জানি না। আমার বয়স কত সে সম্পর্কেও আমার কোনো ধারণা নেই। আসলেই আমার কোনো বয়স আছে কি না তাও জানি না।”

​বরফ-মানবটি ছিল অন্ধকার রাতের আইসবার্গের মতোই একেবারে একা।
​আমি এই বরফ-মানবের প্রেমে গভীরভাবে হাবুডুবু খেতে লাগলাম…(চলবে..)

শেয়ার করুন -