
বরফ-মানব আমাকে ঠিক যেমনটি আমি, সেভাবেই ভালোবাসত—বর্তমানে, কোনো ভবিষ্যৎ ছাড়াই। বিনিময়ে, আমিও বরফ-মানবকে ঠিক যেমনটি সে, সেভাবেই ভালোবাসলাম—বর্তমানে, কোনো অতীত ছাড়াই। এমনকি আমরা বিয়ের কথাও বলতে শুরু করলাম।আমি তখন সবে বিশ বছরে পা দিয়েছি, আর বরফ-মানবই ছিল প্রথম মানুষ যাকে আমি সত্যি সত্যিই ভালোবেসেছিলাম। সেই সময়ে, একজন বরফ-মানবকে ভালোবাসার অর্থ কী হতে পারে তা কল্পনা করার ক্ষমতাও আমার ছিল না। কিন্তু যদি আমি কোনো সাধারণ মানুষের প্রেমেও পড়তাম, আমার সন্দেহ হয় যে ভালোবাসা আসলে কী তা নিয়ে আমার এর চেয়ে সচ্ছ কোনো ধারণা থাকত কি না।
আমার মা এবং বড় বোন আমার সাথে বরফ-মানবের বিয়ের ঘোর বিরোধিতা করলেন। “তোমার বিয়ের জন্য এখনও বয়স হয়নি,” তারা বললেন। “তাছাড়া তুমি তার বংশ-পরিচয় সম্পর্কে কিছুই জানো না। এমনকি সে কোথায় বা কখন জন্মেছে তাও জানো না। আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের আমরা কীভাবে মুখ দেখাব, এ কাকে বিয়ে করতে চলেছো? ভেবে দেখো সে একজন বরফ মানব; যদি সে হঠাৎ গলে যায় তখন তুমি কী করবে? তুমি বোধহয় বুঝতে পারছ না যে বিয়ের জন্য একটা বাস্তব অঙ্গীকারের প্রয়োজন হয়।”
তাদের দুশ্চিন্তাগুলো অবশ্য ছিল ভিত্তিহীন। কারণ, একজন বরফ-মানব আসলে বরফ দিয়ে তৈরি নয়। আবহাওয়া যত গরমই হোক না কেন, সে গলে যাওয়ার পাত্র নয়। তাকে বরফ-মানব বলা হয় কারণ তার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু সে যা দিয়ে তৈরি তা বরফ থেকে আলাদা; এবং তার সেই ঠান্ডা ভাব অন্য মানুষের শরীরের উত্তাপ কেড়ে নেওয়ার মতো নয়।
তাই আমরা বিয়ে করলাম। কেউ আমাদের বিয়েতে আশীর্বাদ করেনি, কোনো বন্ধু বা আত্মীয় আমাদের জন্য খুশি ছিল না। আমরা কোনো অনুষ্ঠান করিনি। আর যখন তার ফ্যামিলি রেজিস্টারে আমার নাম তোলার কথা এল—কী আর বলব, বরফ-মানবের তো কোনো রেজিস্টারই ছিল না। আমরা স্রেফ দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা বিবাহিত। আমরা একটা ছোট কেক কিনলাম এবং দুজনে মিলে খেলাম; ওইটুকুই ছিল আমাদের অনাড়ম্বর বিয়ে।
আমরা ছোট্ট একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করলাম, আর বরফ-মানব একটা মাংসের কোল্ড স্টোরেজে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে লাগল। সে যেকোনো মাত্রার ঠান্ডা সহ্য করতে পারত এবং যতই পরিশ্রম করুক না কেন, কখনো ক্লান্ত বোধ করত না। তাই বরফ-মানবের মালিক তাকে খুব পছন্দ করতেন এবং অন্য কর্মচারীদের তুলনায় ভালো বেতন দিতেন। আমরা দুজনে একসাথে সুখী জীবন কাটাতে লাগলাম, কাউকে বিরক্ত না করে কিংবা কারো দ্বারা বিরক্ত না হয়ে।
বরফ-মানব যখন আমাকে ভালোবাসত, আমার মনের পটে এমন এক খণ্ড বরফের ছবি ভেসে উঠত যার অস্তিত্ব আমি নিশ্চিত জানতাম কোথাও না কোথাও নিভৃত নির্জনতায় টিকে আছে। আমার মনে হতো, বরফ-মানব সম্ভবত জানে সেই বরফখণ্ডটি কোথায়। ওটা ছিল জমে থাকা কঠিন পাথর, এতই শক্ত যে আমার মনে হতো এর চেয়ে শক্ত আর কিছু হতে পারে না। ওটাই ছিল বিশ্বের বৃহত্তম বরফখণ্ড। ওটা ছিল খুব দূরের কোনো এক জায়গায়, আর বরফ-মানব সেই বরফের স্মৃতিগুলোই আমার কাছে এবং এই বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল। শুরুতে বরফ-মানবের সাথে শারীরিক সম্পর্কের সময় আমি কিছুটা বিভ্রান্ত বোধ করতাম। কিন্তু কিছুকাল পর আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এমনকি বরফ-মানবের সাথে যৌনমিলন আমি ভালোবাসতে শুরু করলাম। রাতের বেলা আমরা নিঃশব্দে সেই বিশাল বরফখণ্ডটির ভাগীদার হতাম, যার ভেতরে কোটি কোটি বছর—অর্থাৎ বিশ্বের সমস্ত অতীত—সঞ্চিত ছিল।
আমাদের বিবাহিত জীবনে উল্লেখ করার মতো কোনো সমস্যা ছিল না। আমরা একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসতাম এবং আমাদের মাঝে কোনো কিছুর বাধা ছিল না। আমরা একটি সন্তান চেয়েছিলাম, কিন্তু তা সম্ভব বলে মনে হলো না। হতে পারে মানুষের জিন আর বরফ-মানবের জিন সহজে মিশতে পারছিল না। যাই হোক, সন্তান ছিল না বলেই আমার হাতে প্রচুর সময় জমে যেত। আমি সকালের মধ্যেই ঘরের সব কাজ শেষ করে ফেলতাম এবং তারপর করার মতো আর কিছুই থাকত না। আমার কথা বলার বা বাইরে যাওয়ার মতো কোনো বন্ধু ছিল না, এমনকি প্রতিবেশীদের সাথেও আমার খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। মা আর বোন তখনও আমার ওপর রাগে ফুঁসছিলেন এবং আমাকে দেখার কোনো লক্ষণই তাদের মধ্যে ছিল না। যদিও মাস গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আশেপাশের মানুষজন মাঝে মাঝে বরফ মানবের সাথে কথা বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু মনের গভীরে তারা এখনও বরফ-মানবকে কিংবা আমাকে মেনে নিতে পারেনি,আমাদের বিয়েকে মেনে নিতে পারেনি। আমরা তাদের থেকে আলাদা ছিলাম, এবং কোনো কিছু দিয়ে আমাদের মধ্যকার সেই ব্যবধান ঘুচানো সম্ভব ছিল না।
তাই বরফ-মানব যখন কাজে থাকত, আমি বাড়িতে একা থাকতাম, বই পড়তাম আর গান শুনতাম। আমি বরাবরই ঘরে থাকতেই বেশি পছন্দ করি, আর একা থাকতেও আমার বিশেষ কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমি তখনও তরুণী ছিলাম, আর দিনের পর দিন একই কাজ বারবার করাটা শেষ পর্যন্ত আমাকে মানসিকভাবে পীড়া দিতে শুরু করল। একঘেয়েমি আমাকে কষ্ট দিচ্ছিল না; কষ্ট দিচ্ছিল এর পুনরাবৃত্তি।
সেই কারণেই একদিন আমি আমার স্বামীকে বললাম, “কেমন হয় যদি আমরা দুজনে মিলে কোথাও ভ্রমণে যাই, শুধু একটু পরিবর্তনের জন্য?”
”ভ্রমণ?” বরফ-মানব বলল। সে তার চোখ সরু করে আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকাল। “ভ্রমণে যাওয়ার কী এমন প্রয়োজন পড়ল? তুমি কি আমার সাথে এখানে সুখী নও?”
”তা নয়,” আমি বললাম। “আমি সুখী। কিন্তু আমি বিরক্ত হয়ে গেছি। আমার মনে হচ্ছে অনেক দূরে কোথাও ঘুরে আসি আর এমন সব জিনিস দেখি যা আমি আগে কখনো দেখিনি। আমি নতুন বাতাসে শ্বাস নিতে চাই। তুমি কি বুঝতে পারছ? তাছাড়া আমাদের তো এখনও হানিমুনই হয়নি। আমাদের কিছু সঞ্চয় আছে, আর তোমারও বেশ কয়েকটা ছুটি পাওনা আছে। এটাই কি উপযুক্ত সময় নয় যে আমরা কোথাও গিয়ে কিছুদিন আরাম করে কাটাই?”
বরফ-মানব একটা দীর্ঘ হিমশীতল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সেটা বাতাসের মধ্যেই টুংটাং শব্দ করে মিলিয়ে গেল। সে তার লম্বা আঙুলগুলো হাঁটুর ওপর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াল। “আচ্ছা, তুমি যদি সত্যিই এতটা ব্যাকুল হয়ে ভ্রমণে যেতে চাও, তবে আমার কোনো আপত্তি নেই। তোমাকে খুশি করার জন্য আমি যেকোনো জায়গায় যাব। কিন্তু তুমি কোথায় যেতে চাও?”
”দক্ষিণ মেরুতে গেলে কেমন হয়?” আমি বললাম। আমি দক্ষিণ মেরু বেছে নিয়েছিলাম কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম যে বরফ-মানব কোনো ঠান্ডা জায়গায় যেতে আগ্রহী হবে। আর সত্যি বলতে, আমার নিজেরও সবসময় ওখানে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। আমি হুড দেওয়া একটা পশমি কোট পরতে চেয়েছিলাম এবং আমি ‘অরোরা অস্ট্রালিস’ আর একঝাঁক পেঙ্গুইন দেখতে চেয়েছিলাম।
যখন এ কথা বললাম, আমার স্বামী চোখের পলক না ফেলে সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাল। আমার মনে হলো একটা ধারালো বরফকুচি আমার মাথা ফুঁড়ে পেছনের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, এবং সবশেষে বলল, “ঠিক আছে, যদি এটাই তোমার চাওয়া হয়, তবে চলো দক্ষিণ মেরুতেই যাই। তুমি কি সত্যিই নিশ্চিত যে এটাই তুমি চাও?”আমি সাথে সাথে উত্তর দিতে পারলাম না। বরফ-মানবের চাউনি আমার ওপর এতক্ষণ ধরে নিবদ্ধ ছিল যে আমার মাথার ভেতরটা অবশ হয়ে আসছিল। তারপর আমি মাথা নাড়লাম।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে দক্ষিণ মেরু যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার জন্য আমি অনুশোচনা করতে লাগলাম। আমি জানি না কেন, কিন্তু যেই মুহূর্তে আমি আমার স্বামীকে “দক্ষিণ মেরু” শব্দটি বললাম, তার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেল। তার চোখগুলো আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, তার নিঃশ্বাস আরও ধবধবে সাদা হয়ে বের হতে লাগল এবং তার আঙুলগুলো হয়ে উঠল আরও হিমশীতল। সে আমার সাথে প্রায় কথা বলাই বন্ধ করে দিল এবং পুরোপুরি খাওয়া ছেড়ে দিল। এই সব কিছু আমাকে ভীষণ অনিরাপদ বোধ করাতে লাগল।
আমাদের রওনা হওয়ার পাঁচ দিন আগে আমি সাহস সঞ্চয় করে বললাম, “চলো দক্ষিণ মেরু যাওয়ার চিন্তা বাদ দেই। এখন ভাবছি ওখানটা ভয়াবহ রকমের ঠান্ডা হবে, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নাও হতে পারে। আমার মনে হচ্ছে আমাদের বরং আরও সাধারণ কোনো জায়গায় যাওয়া উচিত। ইউরোপ কেমন হয়? চলো স্পেনে গিয়ে সত্যিকারের ছুটি কাটাই। আমরা সেখানে ওয়াইন খাব, পায়েলা খাব আর ষাঁড়ের লড়াই দেখব।”
কিন্তু আমার স্বামী আমার কথায় কোনো পাত্তাই দিল না। সে কয়েক মিনিটের জন্য শূন্যে তাকিয়ে থাকল। তারপর ঘোষণা করল, “না, স্পেনে যাওয়ার আমার বিশেষ কোনো ইচ্ছে নেই। স্পেন আমার জন্য বড্ড বেশি গরম। ওখানটা খুব ধুলোবালি আর খাবারগুলো বড্ড বেশি ঝাল। তাছাড়া আমি ইতিমধ্যে দক্ষিণ মেরুর টিকিট কেটে ফেলেছি। আর তোমার জন্য একটা পশমি কোট আর পশম দেওয়া বুটও কেনা হয়ে গেছে। আমরা তো এসব অপচয় করতে পারি না। এখন যখন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছি, তখন আর না গিয়ে উপায় নেই।”
সত্যি কথা বলতে আমি ভয় পাচ্ছিলাম। আমার এক অদ্ভুত পূর্বাভাস হচ্ছিল যে, যদি আমরা দক্ষিণ মেরু যাই তবে আমাদের সাথে এমন কিছু ঘটবে যা আমরা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারব না। আমি বারবার একই দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্নটা সবসময় একই রকম ছিল। আমি বাইরে হাঁটছি আর হঠাৎ মাটির নিচে এক গভীর ফাটলে পড়ে গেলাম। কেউ আমাকে খুঁজে পেল না আর আমি ওখানেই জমে বরফ হয়ে গেলাম। বরফের ভেতরে আটকা পড়ে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি সচেতন, কিন্তু নড়াচড়া করতে পারছি না, এমনকি একটা আঙুলও নয়। আমি বুঝতে পারছি যে প্রতি মুহূর্তে আমি অতীতে পরিণত হচ্ছি। মানুষ যখন আমার দিকে তাকাচ্ছে,আমি যা হয়ে গেছি ঠিক সেই আমির দিকে, তারা আসলে তাকাচ্ছে অতীতের দিকে । আমি এক দৃশ্য যা উল্টোদিকে সরে যাচ্ছে, তাদের থেকে দূরে।
তারপর আমার ঘুম ভেঙে যেত এবং দেখতাম আমার পাশে বরফ-মানব ঘুমাচ্ছে। সে সবসময় নিঃশ্বাস না নিয়ে ঘুমাত, ঠিক এক মৃত মানুষের মতো।
কিন্তু আমি বরফ-মানবকে ভালোবাসতাম। আমি কাঁদতাম, আর আমার চোখের জল তার গালে টপটপ করে পড়ত। সে জেগে উঠত এবং আমাকে তার দুহাতে জড়িয়ে ধরত। “আমি একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি,” আমি তাকে বলতাম।”ওটা স্রেফ একটা স্বপ্ন ছিল,” সে উত্তরে বলত। “স্বপ্ন আসে অতীত থেকে, ভবিষ্যৎ থেকে নয়। তুমি স্বপ্নে বন্দি নও, স্বপ্ন তোমার মধ্যে বন্দি। তুমি কি তা বুঝতে পারছ?””হ্যাঁ,” আমি বলতাম, যদিও আমি আস্বস্ত হতে পারতাম না।
ভ্রমণ বাতিল করার মতো কোনো যুৎসই কারণ আমি খুঁজে পেলাম না, তাই শেষ পর্যন্ত আমার স্বামী আর আমি দক্ষিণ মেরুর বিমানে চড়লাম। বিমানে বিমানবালাদের সবাই ছিল একদম স্বল্পভাষী। আমি জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু মেঘ এত ঘন ছিল যে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর জানলাটা একস্তর বরফে ঢেকে গেল। আমার স্বামী চুপচাপ বসে একটা বই পড়ছিল। ছুটিতে যাওয়ার কোনো উত্তেজনা আমি অনুভব করছিলাম না। আমি শুধু যন্ত্রের মতো কাজগুলো করে যাচ্ছিলাম যা আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে ছিল।যখন আমরা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম এবং দক্ষিণ মেরুর মাটিতে পা রাখলাম, আমি অনুভব করলাম আমার স্বামীর শরীরটা কেঁপে উঠল। ওটা এক পলকের চেয়েও কম সময় স্থায়ী হয়েছিল, মাত্র আধ সেকেন্ড, এবং তার অভিব্যক্তির কোনো পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু আমি তা ঘটতে দেখেছি। বরফ-মানবের ভেতরে কিছু একটা গোপনে এবং প্রবলভাবে কেঁপে উঠেছে। সে থামল এবং আকাশের দিকে তাকাল, তারপর তার হাতগুলোর দিকে। সে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, “এই সেই জায়গা যেখানে তুমি আসতে চেয়েছিলে?”
”হ্যাঁ,” আমি বললাম। “এটাই।”
দক্ষিণ মেরু আমার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি নিঃসঙ্গ ছিল। সেখানে প্রায় কেউই বাস করত না। সেখানে শুধু ছোট একটা বৈশিষ্ট্যহীন শহর ছিল, আর সেই শহরে একটা হোটেল, যা অবশ্যই ছোট এবং অনাড়ম্বর। দক্ষিণ মেরু কোনো পর্যটন কেন্দ্র ছিল না। সেখানে একটাও পেঙ্গুইন ছিল না। আর অরোরা অস্ট্রালিসও দেখা যাচ্ছিল না। সেখানে কোনো গাছ, ফুল, নদী বা পুকুর ছিল না। যেখানেই আমি যেতাম, সেখানে শুধু বরফ আর বরফ। যতদূর চোখ যায়, বরফের মরুভূমি দিগন্তের পর দিগন্ত বিস্তৃত ছিল।
আমার স্বামী অবশ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দারুণ উৎসাহের সাথে হাঁটত, যেন তার আশ মিটছে না। সে দ্রুত স্থানীয় ভাষা শিখে ফেলল এবং শহরবাসীদের সাথে এমন এক স্বরে কথা বলতে শুরু করল যাতে তুষারধসের মতো গম্ভীর গর্জন ছিল। সে তাদের সাথে গম্ভীর মুখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত, কিন্তু তারা কী নিয়ে আলাপ করত তা বোঝার কোনো উপায় আমার ছিল না। আমার মনে হতো আমার স্বামী আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং আমাকে নিজের ভাগ্যের ওপর একা ফেলে চলে গেছে।
সেখানে, সেই পুরু বরফে ঘেরা শব্দহীন পৃথিবীতে, এক সময় আমি আমার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেললাম। বিন্দু বিন্দু করে, ধীরে ধীরে। শেষ পর্যন্ত আমার বিরক্ত হওয়ার মতো শক্তিটুকুও অবশিষ্ট রইল না। মনে হচ্ছিল আমি আমার অনুভবের কম্পাসটি কোথাও হারিয়ে ফেলেছি। আমি কোথায় যাচ্ছি সেই পথ হারিয়ে ফেলেছি, সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলেছি, আর নিজের অস্তিত্বের বোধটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। আমি জানি না এটা কখন শুরু হয়েছিল বা কখন শেষ হয়েছিল, কিন্তু যখন আমার অনুভব ফিরে এল, আমি দেখলাম আমি বরফের এক জগতে রয়েছি—এক অন্তহীন শীতকাল যার সমস্ত রঙ মুছে গেছে, যেখানে আমি একা বন্দি।
এমনকি আমার বেশিরভাগ অনুভূতি চলে যাওয়ার পরেও আমি এটুকু বুঝতে পারছিলাম—দক্ষিণ মেরুর আমার এই স্বামী আগের সেই মানুষটি নয়। সে আগের মতোই আমার যত্ন নিত এবং আমার সাথে সদয়ভাবে কথা বলত। আমি বুঝতে পারতাম সে যা বলত তা সত্যিই মন থেকে বলত। কিন্তু আমি এটাও জানতাম যে, সে আর সেই বরফ-মানব নেই যার সাথে আমার স্কি রিসোর্টের হোটেলে দেখা হয়েছিল।
তবে এই বিষয়টি কারও নজরে আনার কোনো উপায় আমার ছিল না। দক্ষিণ মেরুর সবাই তাকে পছন্দ করত, আর যাই হোক, তারা আমার একটা কথাও বুঝতে পারত না। সাদা নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে তারা নিজেদের ভাষায় কৌতুক করত, তর্ক করত আর গান গাইত; যখন আমি একা আমাদের রুমে বসে ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম যা আগামী কয়েক মাস পরিষ্কার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। যে বিমানটি আমাদের নিয়ে এসেছিল সেটি অনেক আগেই চলে গেছে, আর কিছুকাল পর রানওয়েটি এক কঠিন বরফের স্তরে ঢেকে গেছে—ঠিক আমার হৃদয়ের মতোই।
”শীত এসে গেছে,” আমার স্বামী বলল। “এটা অনেক দীর্ঘ এক শীত হতে যাচ্ছে, এবং এখানে আর কোনো বিমান আসবে না, জাহাজও আসবে না। সবকিছু জমে শক্ত হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আগামী বসন্ত পর্যন্ত আমাদের এখানেই থাকতে হবে।”
দক্ষিণ মেরু পৌঁছানোর প্রায় তিন মাস পর আমি বুঝতে পারলাম আমি গর্ভবতী। যে সন্তানটি জন্ম নেবে সে হবে একটি ছোট বরফ-মানব—আমি তা জানতাম। আমার জরায়ু জমে বরফ হয়ে গেছে, আর আমার গর্ভফুল ছিল তুষারমিশ্রিত কাদার মতো। আমি আমার ভেতরে সেই শীতলতা অনুভব করতে পারতাম। আমার সন্তান হবে ঠিক তার বাবার মতো, বরফকুচির মতো চোখ আর তুষার-জমা আঙুল নিয়ে। আর আমাদের নতুন এই পরিবার আর কোনোদিন দক্ষিণ মেরুর বাইরে পা রাখতে পারবে না। এক চিরন্তন অতীত, যা সমস্ত কল্পনার চেয়েও ভারী, আমাদের আঁকড়ে ধরেছে। আমরা কখনোই একে ঝেড়ে ফেলতে পারব না।এখন আমার ভেতরে হৃদপিণ্ড বলতে আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমার উষ্ণতা অনেক দূরে হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে আমি ভুলেই যাই যে উষ্ণতা বলে কোনো কিছুর আদৌও অস্তিত্ব ছিল। এই জায়গায়, আমি পৃথিবীর অন্য যে কারো চেয়ে বেশি নিঃসঙ্গ। যখন আমি কাঁদি, বরফ-মানব আমার গালে চুমু খায়, আর আমার চোখের জল বরফে পরিণত হয়। সে সেই জমে যাওয়া অশ্রুবিন্দুগুলো তার হাতে তুলে নেয় এবং নিজের জিভে রাখে। “দেখো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি,” সে বলে। সে সত্যি কথাই বলছে। কিন্তু কোথাও থেকে ধেয়ে আসা এক দমকা হাওয়া তার সেই শুদ্ধ কথাগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যায়—পেছনে, সুদূর অতীতের গহ্বরে।