MCJ NEWS

সিলেট নয়, এ যেন কুমিল্লার মৌলভীবাজারের চা বাগান!

লালমাই পাহাড় বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রুক্ষ লাল মাটি আর অনাবাদি টিলার ছবি। কিন্তু সেই চেনা ছবিটা এখন আমূল বদলে গেছে। কুমিল্লার বড় ধর্মপুর এলাকায় সড়কের পূর্ব পাশের সরু পথ ধরে মাত্র দুইশত গজ এগোলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। পাহাড়ের ঢালু গায়ে সারিবদ্ধ চা-গাছগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো নিপুণ শিল্পীর আঁকা সবুজ আলপনা। প্রথম দেখায় বিভ্রমও হতে পারে। এটি কি কুমিল্লা, নাকি মৌলভীবাজারের কোনো গহীন বাগান?রুক্ষ মাটির বুক চিরে বের হওয়া এই সতেজ চা-পাতার আভা যেন লালমাইয়ের নতুন পরিচয়।

প্রকৃতির এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে মাটির এক গোপন রসায়ন। ভূতাত্ত্বিকভাবে লালমাই পাহাড়ের মাটি লেটারাইট বা আয়রন অক্সাইড সমৃদ্ধ, যাকে কৃষিবিজ্ঞানীরা ভালোবেসে ডাকেন ‘টেরা রোসা’। এই অম্লীয় মাটি আর পাহাড়ের ঢালু শরীর চা-গাছ বা ‘ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস’-এর বেড়ে ওঠার জন্য দারুণ এক আঁতুড়ঘর। প্রকৃতির এই দানই কুমিল্লাকে নতুন করে চা উৎপাদনের মানচিত্রে ঠাঁই করে দিয়েছে। তবে এই অঞ্চলে আকাশের মেঘ সিলেটের মতো অঝোরে ঝরে না। তাই তৃষ্ণার্ত মাটির বুক ভেজাতে, প্রকৃতির বৃষ্টির অপেক্ষায় বসে না থেকে কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে মেটানো হচ্ছে চারাদের পানির তৃষ্ণা।

এই অসম্ভবকে সম্ভব করার কারিগর মো: তারিকুল ইসলাম মজুমদার। যেখানে পাহাড়ের রুক্ষতা দেখে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিত, সেখানে তিনি বুনেছিলেন স্বপ্নের বীজ। পাহাড়ের টিলায় গড়ে তুলেছেন ‘মজুমদার টি গার্ডেন’। চারা রোপণ করেছেন উন্নত বিটি-২ জাতের। শুরুতে অনেকেই বাঁকা চোখে তাকিয়েছিল।কুমিল্লার এই গরমে কি আদৌ চায়ের কুঁড়ি হাসবে? কম বৃষ্টিপাতকে মনে করা হয়েছিল দুর্ভেদ্য দেয়াল। উদ্যোক্তা তারিকুল ইসলাম মজুমদার সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, “শুরুতে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে, কুমিল্লার এই আবহাওয়ায় আদৌ চা চাষ সম্ভব কি না। বিশেষ করে কম বৃষ্টিপাতকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছিল।” কিন্তু সেই সংশয় আজ বাস্তবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।এখন এই বাগান থেকে প্রতিবছর কয়েক হাজার কেজি চা পাতা উত্তোলিত হচ্ছে।

সবুজের এই বিস্তার এখন কেবল পাহাড়ের সৌন্দর্য নয়, বরং একদল মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। এই বাগান ঘিরেই ডালপালা মেলছে অনেক শ্রমজীবী পরিবারের স্বপ্ন। রুক্ষ পাহাড়ে এখন আর হাহাকার নেই, আছে কর্মসংস্থানের কর্মব্যস্ততা। পাশাপাশি এই ছোট চা বাগানটি হয়ে উঠেছে পর্যটকদের প্রিয় এক গন্তব্য। বিকেলের মায়াবী আলোয় চায়ের পাতার ঝিলিক দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এখানে। পর্যটকদের এই আনাগোনা স্থানীয় অর্থনীতিতেও এক নতুন প্রাণের স্পন্দন নিয়ে এসেছে। ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের চোখেমুখে এখন আশার আলো, যার মূলে রয়েছে লালমাই পাহাড়ের সবুজ এক ফালি দিগন্ত।

বিকেলের নরম সোনালী রোদ যখন চায়ের কচি পাতায় পড়ে চিকচিক করে ওঠে, তখন মনে হয় যেন পাহাড় নিজেই তার একাকিত্ব ঘোচানোর গল্প বলছে। এই গল্পের পূর্ণতা পেতে প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতার হাত বাড়ানো। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা আর উন্নত সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই বাগান কেবল ব্যক্তিগত শখ হয়ে থাকবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির অংশীদার হয়ে উঠবে। লাল মাটির বুক চিরে জেগে ওঠা এই সবুজ কুঁড়িগুলো যেন আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ইশতেহার লিখে যাচ্ছে। যে মাটি একসময় অবহেলায় পড়ে ছিল, আজ সেখানে সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন বাগানের তত্ত্বাবধায়ক রাজু সিংও। তাঁর চোখেমুখে আজ অদ্ভুত এক তৃপ্তির ছাপ। রাজু সিং আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “একদিন লালমাই পাহাড়েও সিলেটের মতো বিস্তৃত চা বাগান গড়ে উঠবে, যা বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকেও নতুন মাত্রা দেবে।” রুক্ষতা জয় করে সবুজের এই যে জয়যাত্রা, তা যেমন আশার, তেমনি এক প্রবল লড়াইয়ের গল্প। লালমাই পাহাড় আজ আর কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং আগামীর উজ্জ্বল ও রঙিন স্বপ্নের নাম।

কেএইচ/ আবিদুর রহমান

শেয়ার করুন -