
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রচারণার তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। জনসভা, লিফলেট ও পোস্টারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব রাজনৈতিক দলগুলো। এর বাইরে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে তারা বেছে নিয়েছে ভিন্নধর্মী এক মাধ্যম- থিম সং।
নির্বাচনী প্রতীককে কেন্দ্র করে তৈরি এসব গানে সুর ও কথার মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে দলীয় আদর্শ, অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা। সঙ্গীতের ভাষা নজর কাড়ছে সাধারণ মানুষের। কারণ প্রতিটি গানই বুদ্ধিদীপ্ত, ঘটেছে সময়ের প্রতিফলন। ফলে নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা, মাঠ হয়ে উঠেছে আরও প্রাণবন্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচর্নী প্রতীক ধানের শীষকে কেন্দ্র করে তৈরি করে থিম সং। গানের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ “ভোট দিব কিসে, ধানের শীষে।” গানটিতে এইদেশের শ্রমজীবী মানুষ ও নারী পুরুষের অংশগ্রহণকে ফুটিয়ে তোলা হয়। এমনকি সকল ধর্মের প্রতিনিধিদের দেখানোর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেওয়া হয়। এছাড়া গনতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা দেওয়া হয়। গানটির কথায় ও চিত্রায়ণে উঠে এসেছে দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং জনগণের ক্ষমতা। বিএনপির নেতাকর্মীদের মতে, ধানের শীষের প্রতীকী অর্থের সঙ্গে থিম সংয়ের বার্তা ভোটারদের আবেগকে স্পর্শ করছে এবং মাঠপর্যায়ের প্রচারণায় ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়েত ইসলামী তাদের নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে কেন্দ্র করে থিম সংয়ে গুরুত্ব দিয়েছে ন্যায়বিচার, ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ও নৈতিকতার বার্তা। গানে গুলোর কথায় আর্দশভিত্তিক রাজনীতি, সৎ নেতৃত্ব ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রধান একটি থিম সংয়ের বিশেষ অংশ- “ভালো লোকে হোক এবার পাল্লা, মানুষের বুকে দাঁড়িপাল্লা।” এই গানের কথায় উঠে এসেছে অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতি বাস্তবতা। প্রতিটি দলের অপকর্মের কথা বিবেচনা করে দাঁড়িপাল্লাকে নির্বাচিত করার আহ্বান করা হয়। দলটির দাবি, দাঁড়িপাল্লার প্রতীক যেমন ন্যায় ও ভারসাম্যের প্রতীক, তেমনি তাদের থিম সং সেই দর্শনকেই সহজভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরছে।
নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ও থিম সং তৈরিতে পিছিয়ে নেই। তারুণ্যের পছন্দকে বিবেচনায় রেখে মিউজিককে গুরুত্ব দিয়ে বানানো গানটিকে যোগ করেছে অনন্য মাত্রা। কিন্তু অন্য একটি গানের কথাও সুর বাংলার লোক সঙ্গীতের প্রতিনিধিত্ব করে৷ যেটা এদেশের বয়স্ক মানুষদের রুচিবোধের সাথে মিলে যায়। তাদের নির্বাচনী প্রতীক শাপলা কলিকে কেন্দ্র করে তৈরি থিম সং গুলোতে তুলে ধরছে নাগরিক অধিকার, স্বচ্ছতা ও নতুন ধারার রাজনীতির প্রত্যয়। তাছাড়াও এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জুলাইয়ের মূলবোধ ও তারুণ্যের হাত ধরে পরিবর্তনের বার্তা। আধুনিক সুর ও সহজ ভাষায় নির্মিত গানগুলো বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রচার করা হচ্ছে। এনসিপির ভাষ্য অনুযায়ী, শাপলা কলি দেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকী ভাবনার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের আশা ও সম্ভাবনার কথা প্রকাশ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ডিজিটাল ও গণমাধ্যমনির্ভর যুগে থিম সং নির্বাচনী প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। গান অল্পসময়ের মধ্যেই মানুষের মনে প্রভাব ফেলতে পারে এবং দলীয় বার্তাকে সহজ ও আকর্ষনীয়ভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম। তবে তারা মনে করেন, থিম সংয়ের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত কর্মসূচি, নীতিগত অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতা ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মুখ্য ভূমিকা রাখে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রচারণায় ব্যবহৃত থিম সংসহ সব ধরনের প্রচার সামগ্রী অবশ্যই প্রচলিত আইন ও আচরণবিধির মধ্যে থাকতে হবে। বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও শাপলা কলিকে ঘিরে তৈরি থিম সংগুলো রাজনীতির প্রচলিত প্রচারণার গণ্ডি পেরিয়ে ভোটারদের অনুভূতির জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। সুর, কথা ও প্রতীকের সমন্বয়ে এসব গান ভোটের রাজনীতিকে দিয়েছে নতুন ভাষা, যেখানে বার্তার পাশাপাশি আবেগও হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এফকে/ নুসরাত জাহান অনু