
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বইছে উৎসবের হাওয়া তবে সেই হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বইছে শব্দের ‘লু-হাওয়া’। প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয়ের মিশনে নেমেছেন কিন্তু ভোটাররা এখন মন বাঁচানোর চেয়ে নিজের ‘কান’ বাঁচাতে বেশি ব্যস্ত। পাড়া-মহল্লায় এখন পাখির কিচিরমিচির নয়, বরং প্রার্থীর গুণের কীর্তন গাওয়া কোনো এক ‘কণ্ঠশিল্পীর’ চিৎকারে নাগরিকদের নাভিশ্বাস উঠছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি বলছে, দুপুর ২টার আগে এবং রাত ৮টার পরে মাইক হাতে নেওয়া বারণ। আর শব্দের মাত্রা? ৬০ ডেসিবেল। কিন্তু আমাদের ডিজিটাল প্রার্থীদের সমর্থকরা সম্ভবত ৬০ ডেসিবেলকে ‘মশা তাড়ানোর শব্দ’ মনে করেন। তাই তারা মাঠে নামিয়েছেন ১১০ ডেসিবেলের ‘সাউন্ড কামান’।
একই অলিগলিতে যখন ৩-৪টি প্রার্থীর মাইক একে অপরকে টেক্কা দেয়, তখন মনে হয় পাড়ার ভেতরেই ‘শব্দের অলিম্পিক’ শুরু হয়েছে। কোনো প্রার্থীর কথাই আর বোঝা যায় না। কেবল একটা জগাখিচুড়ি আওয়াজ তৈরি হয়, যা শুনে মনে হতে পারে ভোট নয়, যেন কানের পর্দা ফাটানোর কোনো জাতীয় মহড়া চলছে!
শিক্ষার্থীরা এখন বইয়ের পাতার চেয়ে প্রার্থীর প্রতীকের নাম বেশি মুখস্থ করে ফেলেছে। স্কুল শিক্ষার্থী নাহিম বলেন, “পরীক্ষার খাতায় না আবার উত্তরের বদলে স্লোগান লিখে দিয়ে আসি!” অভিভাবকরা এখন বাসার জানালায় কষ কষ করে পর্দা টেনেও শব্দের দাপট আটকাতে পারছেন না।
হাসপাতাল জোনগুলোও থরথর করে কাঁপে উচ্চ শব্দে। চিকিৎসকরা বলছেন, ৮০-৯০ ডেসিবেল শব্দ হার্টের রোগীদের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর। কিন্তু রোগীদের হার্টবিট এখন ডাক্তারের স্টেথোস্কোপে নয়, মাইকের উচ্চ শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে লাফায়।
প্রার্থীরা মনে করছেন, যত জোরে আওয়াজ, তত বেশি ভোট। কিন্তু ভোটাররা বলছেন অন্য কথা। এক সচেতন ভোটার হাসতে হাসতে বললেন, “যে প্রার্থীর মাইক যত বেশি আওয়াজ করে আমার কান ফাটাচ্ছে, ভোটের বাক্সে তার কথা তত বেশি করে মনে রাখব, তবে ভোট দেওয়ার জন্য নয়, ‘না’ দেওয়ার জন্য!”
আসলে এই ডিজিটাল যুগেও যখন প্রার্থীরা ‘মান্ধাতা আমলের’ এই শব্দ-সন্ত্রাস নিয়ে পড়ে থাকেন, তখন ভোটাররা ভাবেন, যে প্রার্থী প্রচারণাতেই নাগরিকের শান্তির কথা ভাবে না, সে জেতার পর শান্তির নদী বইয়ে দেবে তো?
ভোট মানেই উৎসব। কিন্তু সেই আনন্দ যদি নাগরিকের কান পচানোর কারণ হয় তবে সেই ‘উৎসব’ কেবল বিরক্তিই বাড়ায়। দেশবাসী এখন চায় চিন্তার লড়াই, যুক্তির লড়াই, স্রেফ মাইকের হর্নের উচ্চতা দিয়ে জয়ী হওয়ার মহড়া নয়।
এফকে/ আবিদুর রহমান