MCJ NEWS

দুই বছর যুদ্ধের পরও গাজায় রমজান: ঐতিহ্যবাহী খাবারের টিকে থাকার লড়াই

ধ্বংসস্তূপের মাঝে আর জীর্ণ তাঁবুর ভিড়ে গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা আবারও পবিত্র রমজান মাসকে স্বাগত জানাচ্ছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এটি তাদের টানা তৃতীয় রমজান।

তবে এই বছর তারা আশা করছে যে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই বরকতময় মাসে কল্যাণ ও শান্তি বিরাজ করবে, যদিও ইসরায়েলি অবরোধ এবং পর্যাপ্ত সাহায্য প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে মানবিক দুর্ভোগ অব্যাহত থাকায় মাঠপর্যায়ে তেমন পরিবর্তন নেই।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মুসলমানদের মতো, গাজার মানুষও প্রার্থনা, ইবাদত এবং পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে রমজান পালন করছেন। একই সময়ে, ফিলিস্তিনি নারীরা ইফতারের টেবিলকে নানা ঐতিহ্যে সাজিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তারা একদিকে যেমন ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী খাবার, পানীয় এবং মিষ্টি তৈরির চেষ্টা করছেন, তেমনি দৈনন্দিন একঘেয়েমি কাটাতে কিছু নতুন খাবারও যোগ করছেন।

গাজাবাসীদের কাছে তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো কেবল আহার নয়, বরং পবিত্র রমজান মাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে যুদ্ধের প্রভাব, খাদ্য সংকট এবং আকাশচুম্বী দাম-বিশেষ করে মাংস, মুরগি ও মাছের মতো প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব-গাজার রমজানের খাদ্যাভ্যাসকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার তো উপকরণের অভাবে বা আকাশচুম্বী দামের কারণে তালিকা থেকে পুরোপুরি হারিয়েই গেছে।

গাজা শহরের একটি তাঁবুর প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে ৫০ বছর বয়সী উম্মে বিলাল মুহাইসেন জানান, “অনেক ফিলিস্তিনি পরিবারই ঐতিহ্যগতভাবে রমজানের প্রথম দিন মলোখিয়া (এক ধরণের শাকের স্যুপ), সাদা ভাত এবং স্টাফড চিকেন (পুরভরা মুরগি) দিয়ে শুরু করতে পছন্দ করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “যাযাবর জীবন,দারিদ্র্য আর মানুষের সীমিত আয়ের কারণে এই ঐতিহ্য এখন ম্লান হয়ে গেছে।”

তিনি আরও জানান, “আগে গাজার ইফতারি টেবিলে মাকলুবা, সাজ রুটি দিয়ে তৈরি গাজা-স্টাইল ফাত্তাহ, এবং বিভিন্ন ধরণের সবজি ভরা খাবার থাকতো। এছাড়া মাফতুল, ঢ্যাঁড়স, ফুলকপি, শিম এবং ঐতিহ্যবাহী সুমাকিয়া ছিল রমজানের প্রধান আকর্ষণ।”

মুহাইসেন আরও উল্লেখ করেন মুসাখান-এর কথা (জলপাই তেল, পেঁয়াজ ও সুমাক দিয়ে তৈরি রোস্টেড চিকেন), যা রমজানের একটি অপরিহার্য খাবার মনে করা হয়। এছাড়া গাজার অন্যতম বিশিষ্ট ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো কিদরা। এটি মাটির পাত্রে বা আগুনের ওপর রান্না করা হলুদ মশলাযুক্ত চালের ভাত, যাতে ছোলার ডাল, মাংস এবং প্রচুর পরিমাণে ঘি ব্যবহার করা হয়।

তবে তিনি দুঃখের করে বলেন, “যুদ্ধের কারণে সৃষ্টি হওয়া অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই সব ঐতিহ্য আজ হুমকির মুখে। পরিবারগুলো এখন কোনোমতে বেঁচে থাকার মতো সামান্য খাবারের ওপর নির্ভর করছে।”

গাজা শহরের একজন জনপ্রিয় শেফ মোয়াতাজ আবদো বলেন, “যুদ্ধ গাজার সামাজিক বন্ধন এবং রমজানের খাবারের রীতিকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। আগে তার রেস্টুরেন্টে বড় বড় ইফতার মাহফিল ও পারিবারিক গেট-টুগেদার হতো। এখন অভাব ও আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ রেস্টুরেন্টের খাবারের বদলে বাড়িতে থাকা সামান্য খাবার বা ত্রাণের ওপর নির্ভর করছে।”

তিনি আরও জানান, “আগে রমজানে গ্রিলড চিকেন, কাবাব, সালাদ, কিব্বাহ, তাবুলাহ, হুমুস এবং বিভিন্ন ফলের রসের সমারোহ থাকতো। ঐতিহ্যবাহী পানীয় যেমন ক্যারোব, হিবিস্কাস, তেঁতুল এবং কামার আল-দিন ছিল সাধারণ চিত্র। মিষ্টির মধ্যে কাতায়েফ, নাবুলসি কুনাফাহ, বাসবুসা এবং নামমুরা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছে হুমুস, ফুল (মটরশুঁটি), ফালাফেল ও মানাকীশ-এর মতো সাশ্রয়ী খাবারই ভরসা।”

মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী নোহা ওদেহ বলেন, “গত দুই বছর ধরে হত্যা, উচ্ছেদ, ক্ষুধা ও ভয়ের মধ্যে রমজান কাটানোর ফলে ফিলিস্তিনিদের উৎসবের আমেজ হারিয়ে গেছে। আগে যেখানে বড় বড় পারিবারিক ইফতার আয়োজন হতো, এখন ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোনোমতে সেহরি ও ইফতারের জন্য একবেলা খাবার জোগাড় করা।”

পরিশেষে ওদেহ বলেন, গাজার রমজান আর আগের মতো নেই। আনন্দ এখন কষ্টে পরিণত হয়েছে। তবুও প্রতিকূলতার মাঝেও ফিলিস্তিনিরা তাদের বিশ্বাস ও ধৈর্যের মাধ্যমে রমজানের এই ঐতিহ্যগুলোকে যতটুকু সম্ভব আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।(QNA)

তথ্যসূত্র : কাতার নিউজ এজেন্সি

এফকে/ সামিয়া বৃষ্টি

শেয়ার করুন -