
মাগরিবের আজানের ঠিক আগমুহূর্ত, মক্কার মরুপ্রান্তর থেকে ইস্তাম্বুলের নীল মসজিদ কিংবা কায়রোর অলিগলি থেকে জাকার্তার সুউচ্চ ভবন সবখানেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর অপেক্ষার প্রহর। ঘড়ির কাঁটা ছোঁয়ামাত্রই সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে যায় ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দের গুঞ্জনে। রমজান কেবল সংযমের মাস নয়, এটি বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর রন্ধনশৈলী আর ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য প্রদর্শনীও বটে। ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে ইফতারের দস্তরখান একেক দেশে সেজে ওঠে একেক রূপ আর স্বাদে।
আরব ভূখণ্ডের আভিজাত্য: খেজুর ও গাহওয়া ইসলামের পুণ্যভূমি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইফতারের সূচনা হয় অত্যন্ত সাদাসিধে অথচ রাজকীয় আভিজাত্যে। সুন্নাহ অনুসরণে এখানে ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ হলো বিভিন্ন জাতের উৎকৃষ্ট মানের খেজুর ও জমজমের পানি। তবে তাদের বিশেষত্ব ফুটে ওঠে ‘গাহওয়া’য়। এলাচ ও জাফরান মিশ্রিত এই বিশেষ কফি শুধু পানীয় নয়, বরং আরবীয় আতিথেয়তার এক প্রাচীন প্রতীক। ইফতারের মূল পর্বে থাকে ‘কাবসা’ (মাংস ও চালের তৈরি বিশেষ পোলাও) এবং ‘শোরবা’ বা ল্যাম্ব স্যুপ। মসজিদে নববীর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত দস্তরখান বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক মিলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
তুরস্কের ঐতিহ্য: ‘রমজান পিতে’ ও বাকলাভা
ইউরোপ আর এশিয়ার মোহনায় অবস্থিত তুরস্কে ইফতার মানেই এক রাজকীয় উৎসব। তুর্কিরা ইফতারিতে ভাজা-পোড়ার চেয়ে বেক করা খাবার বেশি পছন্দ করে। তাদের দস্তরখানের মধ্যমণি হলো ‘রমজান পিতে’ (Ramazan Pidesi)। এটি গোল আকৃতির এক বিশেষ পাউরুটি যা কেবল রমজান মাসেই তৈরি হয়। এর সাথে থাকে বিভিন্ন পদের পনির, জলপাই এবং সবশেষে বিশ্ববিখ্যাত ‘বাকলাভা’। তুরস্কের নীল মসজিদের সামনে খোলা ময়দানে হাজারো মানুষের একসাথে ইফতার করার দৃশ্যটি যেন অটোমান আমলের সেই জৌলুসকেই মনে করিয়ে দেয়।
মরক্কোর প্রাণ: হারিরা স্যুপের সুবাস
উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো কিংবা তিউনিসিয়ার ইফতার মানেই মৌরি আর দারুচিনির ঘ্রাণ। এখানকার ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘হারিরা’ (Harira)। টমেটো, ডাল, ছোলা এবং মাংস দিয়ে তৈরি এই ঘন স্যুপটি যেমন পুষ্টিকর, তেমনি সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে অতুলনীয়। হারিরা খাওয়ার পর তারা সাধারণত ‘চেবাকিয়া’ (তিল ও মধু দিয়ে ভাজা এক ধরনের বিশেষ কুকিজ) এবং সতেজ পুদিনা পাতার চা পান করে। মরক্কোর ইফতার আয়োজন যেন ঐতিহ্যের এক সুশৃঙ্খল পরিবেশনা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: মিষ্টি আর নারকেলের দুধের জাদু
ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ায় ইফতার শুরু হয় প্রচণ্ড মিষ্টি জাতীয় খাবার দিয়ে। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘তাজিল’। ইন্দোনেশিয়ায় ‘কোলাক’ (নারকেলের দুধ, পাম চিনি এবং কলা দিয়ে তৈরি মিষ্টি ডেজার্ট) ছাড়া ইফতার কল্পনা করা যায় না। অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় মসজিদে মসজিদে তৈরি হয় ‘বুবুর লাম্বুক’—মাংস ও মশলা দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরনের জাউ। প্রতিবেশীদের মধ্যে এই খাবার বিতরণ করা সেখানে রমজানের এক আবশ্যিক সামাজিক রীতি।
ইরান ও মধ্য এশিয়া: রুটি আর ‘আশ রেশতেহ’
ইরানিদের ইফতার আয়োজন বেশ পরিমিত ও স্বাস্থ্যসম্মত। তারা সাধারণত গরম চা, পনির এবং বিশেষ ধরনের নান রুটি দিয়ে রোজা ভাঙে। তবে তাদের মূল আকর্ষণ হলো ‘আশ রেশতেহ’—নুডলস, ডাল ও ভেষজ সবজি দিয়ে তৈরি এক বিশেষ স্যুপ। খাবারের পর জাফরান দেওয়া মিষ্টি বা হালুয়া তাদের দস্তরখানে আভিজাত্যের ছোঁয়া আনে।
দেশভেদে খাবারের স্বাদ ভিন্ন, পরিবেশনার ঢং আলাদা। কোথাও টেবিল ভর্তি বাহারি আয়োজন, কোথাও বা সামান্য খেজুর আর জল। কিন্তু এই বৈচিত্র্যের মাঝেও বিশ্বজুড়ে ইফতারের মূল সুরটি কিন্তু একই সহমর্মিতা, কৃতজ্ঞতা আর স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। মাগরিবের আজানের সেই এক লহমায় পুরো পৃথিবী যেন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়, যেখানে কোনো কাঁটাতার বা সীমান্ত নেই, আছে শুধু ভ্রাতৃত্বের অকৃত্রিম স্বাদ।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ইন্টারন্যাশনাল
এফকে/ সুমাইয়া রিক্তি