MCJ NEWS

রূপালি আঁশের ভারে নুয়ে পড়া শৈশব

​বিকেলের তপ্ত রোদ সন্দ্বীপের উপকূলে এসে কিছুটা নরম হয়ে আসে। মেঘনার নোনা বাতাসে তখন তাজা মাছের ঘ্রাণ। নদীর চরে অস্থায়ী আড়তগুলোতে শুরু হয় নিলামের হাঁকডাক আর দরদামের তুমুল হট্টগোল। এই ব্যস্ততার মধ্যে, ভিড়ের খানিকটা দূরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে সাত-আট বছরের এক শিশু। দুই পা তার কাদায় ডোবা, কোমরে হাত দিয়ে সে অপলক তাকিয়ে থাকে রুপালি মাছের স্তূপের দিকে। তার গামছার ভাঁজে ঝুলে থাকা একটা নোংরা পলিথিন—তাতে কয়েকটা আধমরা মাছ। এই সামান্য মাছের ভারেই যেন নুয়ে পড়েছে তার গোটা শৈশব।

​রমজানের মতো শিশুদের কাছে বিকেল মানে খেলার মাঠ নয়, বরং এক মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা। যখন সমবয়সী শিশুরা গ্রামের মেঠোপথে কানামাছি বা ক্রিকেটে মেতে ওঠে, তখন রমজানদের প্রিয় খেলার সময়টুকু বিক্রি হয়ে যায় কুড়ানো মাছের বিনিময়ে। জেলেরা যখন মাছ বাছাই শেষ করে অবহেলায় কিছু ছোট মাছ, কাঁটা ভাঙা বা রক্তমাখা পুটি-টেংরা ফেলে দেয়, তখনই শুরু হয় এই শিশুদের উৎসব। নর্দমায় পড়ে থাকা সেই উচ্ছিষ্টই তাদের কাছে অমূল্য সম্পদ, যা দিয়ে রাত্রে জ্বলবে ঘরের চুলা।

​এই এক পলিথিন মাছ মানে কয়েকটা প্রাণী নয়, বরং একটি পরিবারের বেঁচে থাকার রসদ। রমজান জানে, এই মাছগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরলে তবেই মা হাঁড়ি চড়াবেন। পাতলা ঝোলে রান্না হওয়া সেই মাছের গন্ধে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফুটবে। এই হাসিটুকুর জন্যই তারা তীর্থের কাকের মতো আড়তের পাশে ঘুরে বেড়ায়। কারো চোখ নীল ত্রিপলে পড়ে থাকা মাছের দিকে, কেউ বা বড়দের ঝুড়ির দিকে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। তাদের এই অপলক চাহনিতে কোনো শৈশব নেই, আছে টিকে থাকার এক আদিম লড়াই।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মাছ ধরার ভরা মৌসুমে এই শিশুদের পদচিহ্ন আর স্কুলের বারান্দায় পড়ে না। প্রথমে কয়েক দিন, তারপর কয়েক সপ্তাহ—ধীরে ধীরে তারা ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ড থেকে অনেক দূরে ছিটকে যায়। সন্দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন জনপদে দারিদ্র্য এখানে কোনো সাময়িক দুর্যোগ নয়, বরং নিয়তিই বলা চলে। নদীনির্ভর জীবনে যখন অভাব দরজায় এসে দাঁড়ায়, তখন বাবার হাত ধরতে শিশুদের বইয়ের বদলে তুলে নিতে হয় মাছের পলিথিন। এভাবেই ঝরে পড়ার খাতার তালিকায় একেকটি প্রাণ কেবল সংখ্যা হয়ে টিকে থাকে।

​জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যানও এই প্রেক্ষাপটকে সমর্থন করছে। ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারির (এপিএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ঝরে পড়ার হার আবারও ঊর্ধ্বমুখী, যা ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সন্দ্বীপের স্থানীয় চিত্র আরও ভয়াবহ। ২০১২ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছে আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় নাম থাকলেও বাস্তবে তারা এখন জীবিকার গোলকধাঁধায় বন্দি।

​স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব তাপস মুস্তাফার কণ্ঠে ঝরে পড়ে একরাশ দীর্ঘশ্বাস। তিনি বলেন, “সন্দ্বীপে শিক্ষার প্রধান সমস্যা এই চরম দারিদ্র্য। অনিশ্চিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো টিকে থাকার চাপে শিশুদের উপার্জনের হাতিয়ার বানাতে বাধ্য হয়। মাছ ধরার মৌসুম এলে বেঞ্চগুলো খালি হয়ে যায়। আমরা জানি, অনেক শিক্ষার্থী আর কোনোদিনও ফিরবে না।”

​রমজানের চোখেমুখে অবশ্য কোনো অভিযোগ নেই, নেই ক্লান্তির ছাপ। সে জানে না যে সে বঞ্চিত। তার কাছে স্বাভাবিকতা মানেই হলো কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে মাছের জন্য অপেক্ষা করা। তার স্বপ্ন খুব ছোট—বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে মাছগুলো তুলে দেওয়া। মা সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করবেন, নষ্টগুলো ফেলে দিয়ে ঝোল রান্না করবেন। চার-পাঁচজন মানুষের সেই ভোজের তৃপ্তিতেই রমজানের সার্থকতা। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার ফুরসত বা সামর্থ্য কোনোটিই এই শিশুদের নেই।

​সন্ধ্যা নামলে আড়তের হাঁকডাক স্তিমিত হয়, মানুষের ভিড় কমে আসে। রমজানও তার কুড়ানো সম্পদ বুকে চেপে বাড়ির পথ ধরে। তার পায়ের কাদা হয়তো শুকিয়ে একসময় ঝরে যাবে, কিন্তু দারিদ্র্যের যে আঠালো কাদা তার জীবনে লেগেছে, তা হয়তো সহজে মোছার নয়। নদীর তীরে দাঁড়ালে বোঝা যায়, এখানে শৈশবগুলো রূপালি আঁশের নিচে চাপা পড়ে হারিয়ে যায় চিরতরে। এক পলিথিন মাছের বিনিময়ে তারা বিসর্জন দেয় তাদের সম্ভাবনা, তাদের রঙিন আগামীকাল।

কেএইচ/ হাসান উদ্দিন সাগর

শেয়ার করুন -