
কখনও কখনও একটি ছোট্ট প্রাণীর গল্প গোটা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিতে পারে। জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানায় জন্ম নেওয়া জাপানি ম্যাকাক শাবক ‘পাঞ্চি-কুন’ তেমনই এক নাম।
একটি কমলা রঙের ওরাংওটাং পুতুলকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা সেই ক্ষুদ্র বানর শিশুটি যেন চার্লি চ্যাপলিন এর- “দ্য কিড”-এর নীরব বেদনাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। পাঞ্চি-কুন কেবল একটি বানরশিশু নয়, সে যেন হয়ে উঠেছে একাকীত্ব, আকাঙ্ক্ষা ও টিকে থাকার সংগ্রামের জীবন্ত প্রতীক।
২০২৫ সালের ২৬ জুলাই তার জন্ম। কয়েক দিনের মধ্যেই মা তাকে দুধ খাওয়াতে অস্বীকার করে, যাকে প্রাণিবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ম্যাটারনাল রিজেকশন’ বলা হয়। পাঞ্চির মা ছিলেন প্রথমবার মা হওয়া ‘প্রাইমিপারাস’। গবেষণা বলছে, অনভিজ্ঞতার কারণে প্রথমবার মা হওয়া জাপানি ম্যাকাকদের মধ্যে শাবক ত্যাগের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। তার ওপর তীব্র তাপদাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। প্রকৃতির কঠোর অঙ্কে তখন আত্মরক্ষাই মুখ্য হয়ে ওঠে, সন্তানের ভাগ্যে জোটে কেবল অবহেলা।
পাঞ্চির শৈশব তাই শুরু হয় অনাহার, অনিশ্চয়তা আর নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে। চিড়িয়াখানার কর্মী কোসুকে শিকানো ও শুম্পেই মিয়াকোশি দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন। কম্বলে মুড়িয়ে কৃত্রিম দুধ খাইয়ে শুরু হয় ‘হ্যান্ড রিয়ারিং’। শরীরের পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলেও, হৃদয়ের শূন্যতা কি লাঘব করা সম্ভব আর হয়ে উঠে না। সামাজিক প্রাণী হিসেবে তার বেঁচে থাকাটাই হয়ে পড়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঠিক তখনই পাঞ্চির জীবনে আসে নতুন সঙ্গী, একটি কমলা রঙের আইকেইএ ওরাংওটাং পুতুল। বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেওয়া হয়তো প্রকৃতি প্রদত্ত সহজাত ক্ষমতা। ছোট্ট পাঞ্চির অবচেতন মন বুঝে গিয়েছিল, টিকে থাকতে হলে তাকে কোনো না কোনো সঙ্গী খুঁজে নিতেই হবে।
ধীরে ধীরে পুতুলটি হয়ে ওঠে তার প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী। সে খেলার সময়, ঘুমের সময়, এমনকি ভয় পেলেও পুতুলটিকে জড়িয়ে থাকে। কখনও পিঠে করে বয়ে নিয়ে যায়, কখনও মুখ গুঁজে দেয় তার বুকে। প্রাণহীন তুলোর শরীরে সে খুঁজে নেয় নিজের ‘ছদ্ম মা’কে।
১৯৫০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী হ্যারি হার্লো দেখিয়েছিলেন, খাদ্যের চেয়ে স্পর্শ ও উষ্ণতার প্রয়োজনীয়তা বেশি। পাঞ্চির ওরা-মামা যেন সেই গবেষণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তাদের অফিসিয়াল এক্স (X) অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, ছয় মাস বয়সী পাঞ্চি একা ঘুমোতে গিয়ে পুতুল আঁকড়ে আছে। ভয় পেলে সেটিকেই আশ্রয় বানাচ্ছে। মুহূর্তেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়। জাপানে #HangInTherePunch ট্রেন্ডিং শুরু হয়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের প্রাণীপ্রেমীদের এই দৃশ্য আবেগাপ্লুত করে তোলে। ধীরে ধীরে পাঞ্চি হয়ে ওঠে মানুষ ও প্রাণীজগতের এক নতুন মিলবন্ধন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয় পাঞ্চির সামাজিকীকরণের কঠিন পর্ব। তবে মায়ের হাত ধরে শেখার সুযোগ না থাকায় সে সামাজিক সংকেত বুঝতে ব্যর্থ হয়। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, অন্য বানরদের কাছে গেলে সে ধাক্কা খাচ্ছে, শাসিত হচ্ছে। এক পূর্ণবয়স্ক বানর তাকে ঘাড় ধরে সরিয়ে নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিল আচরণ সংশোধন যা বানরসমাজে টিকে থাকার শিক্ষা। মানুষের চোখে যা নির্মম, প্রকৃতির চোখে তা প্রয়োজনীয়।
পাঞ্চির গল্প ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে সহানুভূতির জোয়ার আসে। কেউ তাকে দত্তক নিতে চান, কেউ চিড়িয়াখানার সমালোচনা করেন। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ট্রিস্টান টেট ২,৫০,০০০ ডলার অনুদানের ঘোষণা দেন। অন্যদিকে, পাঞ্চির ব্যবহৃত আইকেইএ ওরাংওটাং পুতুলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। ২০ ডলারের খেলনা রিসেল বাজারে ৩৫০ ডলারে বিক্রি হতে থাকে। এমনকি আইকেইএ জাপানের প্রেসিডেন্ট নিজে চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করে নতুন পুতুল উপহার দেন। একটি বানরশিশুর গল্পও যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঢেউ তুলতে পারে, এমনটি হয়তো কেউ ভাবেনি।
তারপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘অনসিং’ নামের এক পূর্ণবয়স্ক মাদি বানর পাঞ্চিকে জড়িয়ে ধরে, তার শরীর গ্রুমিং করে। বানরসমাজে গ্রুমিং মানে সামাজিক স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও সম্পর্কের বন্ধন। সেই মুহূর্তে পাঞ্চির জীবনে যেন নতুন সূর্য ওঠে। সে ধীরে ধীরে অন্য কিশোর বানরদের সঙ্গে খেলতে শুরু করে। সাম্প্রতিক ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, কখনও কখনও পুতুল ছাড়াই সে খেলছে। এ যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘরর’এর অমলের মতো, বন্ধ জানালার ঘরে একদিন হাওয়া ঢোকে, আলো আসে।
আজ পাঞ্চিকে দেখতে চিড়িয়াখানায় দীর্ঘ লাইন পড়ে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ তাকে দেখতে আসে। একটি নির্জীব পুতুল তাকে সাহস ফিরিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি একটি আলিঙ্গন তাকে সমাজে ফিরিয়ে এনেছে। পাঞ্চি-কুন যেন নীরবে বলে, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।”
এফকে/ হাসান উদ্দিন সাগর