
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বিকেলের রোদ মৃদু হয়ে আসে, তখন ক্যাম্পাস জুড়ে এক অন্যরকম ব্যস্ততা শুরু হয়। কারো হাতে ইফতারের ব্যাগ, কেউবা দ্রুত পায়ে হেঁটে ছুটছেন হলের দিকে। কিন্তু এই ব্যস্ততার ভিড়ে আড়ালে থেকে যান একদল মানুষ, যারা নিজেদের ইফতারের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে শিক্ষার্থীদের মুখে খাবার তুলে দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তারা ক্যাম্পাসের ক্যাফে আর হোটেলের সেই কারিগর, যাদের কাছে শিক্ষার্থীরা ক্রেতাই নয়, পরিবারের সদস্যের মতো।
ক্যাফের ম্যানেজার ফরিদ বলেন বলেন, “এখানে কারো সাথে রক্ত বা বংশের পরিচয় নেই, আছে কেবল ভালোবাসার টান। শিক্ষার্থীরাই এখন আমাদের পরিবার। আমরা তাদের জন্য খাবার তৈরি করি খুশিমনেই। আমরা শুধু খাবার বানাই না, একটু করে সম্পর্কও বানাই। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা বাড়ি থেকে দূরে থাকে, পরিবারের সঙ্গে ইফতার করতে পারে না। তাদের জন্য রমজান মাস এই ক্যাফেই নিজের ঘরের মতো।”
হোটেলের রাঁধুনি হাসানের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও কণ্ঠে এক ধরনের প্রশান্তি। কাজের চাপে ঘামতে ঘামতে তিনি বলেন, “ইফতার বা সেহরি নিয়ে আমাদের কোনো কষ্ট নেই। এই রমজানে সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে পেরে আলহামদুলিল্লাহ ভালোই লাগে। এই রান্না কেবল পেশা নয়, বরং ইবাদতের পরম উপায়।”
ক্যাফের নারী ম্যানেজারের কথাগুলো যেন হলের নিঃসঙ্গ ডাইনিংয়ে বসে থাকা কোনো শিক্ষার্থীর বুকে এসে আছড়ে পড়ে। তিনি বিনয়ের সাথে স্বীকার করে নিলেন এক কঠিন সত্য। তিনি বলেন, “আপনারা বাসা ছেড়ে হলে থাকেন। আমরা হয়তো আপনাদের মায়ের হাতের রান্নার মতো স্বাদ দিতে পারব না, কিন্তু আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।”
শুধু ইফতার নয়, এই ক্যাম্পাসে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের কথাও ভুলে যাননি তারা। তাদের সুবিধার্থে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২:৩০টা পর্যন্ত ক্যাফে খোলা রাখা হয়। কারণ তারাও এই পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ক্যাফের বয়োজ্যেষ্ঠ রাঁধুনি আব্দুল বারেক। বার্ধক্যে নত হয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার তৈরি করতে তার ভালোই লাগে। যখন সবাই একসাথে ইফতারের দোয়ায় শামিল হয়, আব্দুল বারেক তখন ব্যস্ত থাকেন শেষ মুহূর্তের পরিবেশনায়। তিনি বলেন, “আপনারা মা-বাবা থেকে দূরে আছেন। তারা থাকলে যে কাজটা করতেন, সেই কাজটাই এখন আমরা করার চেষ্টা করছি, এটাই শুকরিয়া।”
পবিত্র রমজানের ত্যাগের কথায় হোটেল কর্মী ফয়সাল বলেন, “আগুনের তাপ সহ্য করে রোজা রাখা কতটা কষ্টের, তা কেবল একজন রাঁধুনিই জানেন। রমজানে রোজা রেখে এতগুলো খাবার রান্না করতে কষ্ট হয়, তবুও চাই শিক্ষার্থীরা একটু ভালো খাবার পাক, তারা সুস্থ থাকুক।”
এই বিশাল ব্যস্ততার মাঝে নিজেদের ইফতারের খাবার গুছিয়ে নিতে ক্যাফে কর্মীদের করতে হয় সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। ১৩ জনের মধ্যে ২ জন ১০ মিনিট আগে থেকে তৈরি করেন নিজেদের যৎসামান্য ইফতার।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ক্যাফে আর হোটেলগুলো কেবল খাওয়ার জায়গা নয়, বরং এক একটি ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে হাসান, আব্দুল বারেক কিংবা ফরিদেরা শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজেদের ক্লান্তি ভুলে যান। মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ হয়তো শতভাগ মেলে না, কিন্তু সেই রান্নায় মেশানো মমতাটুকু ঠিকই অনুভব করে লাল পাহাড়ের শিক্ষার্থীরা। দিনশেষে এই নিঃস্বার্থ মানুষগুলোই হয়ে ওঠেন ক্যাম্পাসের ‘অঘোষিত অভিভাবক’।
এফকে/ সাগর, সাথী