MCJ NEWS

বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতির এক বাস্তব উদাহরণ ‘ইফতার’

মুসলমানদের কাছে রমজান হল আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাসে সবাই যেমন আত্মসংযম বজায় রাখে পাশাপাশি মাগরিবের আযানের পরেই সেরে নেয় ইফতার। সেই ইফতার বানানোর কাজ চলতে থাকে দিনভর। আল্লাহর ইবাদত ও সন্ধ্যায় বাহারি খাবারের ইফতারে স্বস্তি মিলে তাদের।

শুধু যে মুসলিমরাই ইফতার করে এমন না, অন্যান্য ধর্মের মানুষদের কাছেও ইফতারের একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। রমজান মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গুলোতে দেখা মেলে এক অসাম্প্রদায়িক দৃশ্য। যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান সবাই এক কাতারে বসে ইফতারের আয়োজন করে ও ইফতার করে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও রমজান মানেই এমন এক পরিবর্তিত পরিবেশ। সন্ধ্যা নামার আগেই ক্যাম্পাসে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। হলের বারান্দায় পানি ভর্তি বোতল, খেজুর সাজানো, ইফতারের প্যাকেট হাতে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি আযানের মুহূর্তে সবকিছু থেমে গিয়ে একসঙ্গে ইফতার।

তবে এই বদলে যাওয়া ছন্দ সবার জীবনে একইভাবে ধরা দেয় না। মুসলিম শিক্ষার্থীরা রোজা রাখলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা কিছু অসুবিধাতেই পড়েন খাবার দাবারে। যে বিষয়ে কথা বলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থী বিজয় কুমার। তিনি বলেন, “রমজান মাসে খাবারসংক্রান্ত অসুবিধাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হয়। দিনের বেলায় অধিকাংশ দোকান বন্ধ থাকায় দুপুরের খাবারের জন্য দূরে যেতে হয়। রোজাদারদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে প্রকাশ্যে খাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হয়, যা মাঝে মাঝে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।”

তিনি আরও বলেন, “পরিবর্তিত কর্মঘণ্টা ও সময়সূচির কারণে ব্যক্তিগত রুটিন ও পড়াশোনার পরিকল্পনায়ও প্রভাব পড়ে। তারপরও মুসলিম শিক্ষার্থী ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য এতোটুকু ত্যাগ স্বীকার করে নিই। তাদের সাথে একসাথে ইফতার করি। এই বিষয় গুলো ভালোই লাগে। বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতির এক বাস্তব উদাহরণ ‘ইফতার’।”

একই বিভাগের বৌদ্ধ ধর্মামবলম্বী শিক্ষার্থী অডিথও জানান রমজানের মাহাত্ম্যের কথা। কিন্তু দুষ্টু ব্যবসায়ীদের লোভে দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি পায়। ফলে জীবনযাপন হয়ে উঠে কিছুটা কঠিন। তিনি বলেন,“রমজান মাস আমাকে মিশ্র অভিজ্ঞতা দেয়। রোজা না রেখেও মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নেওয়া আনন্দের। বন্ধুরা ইফতারের দাওয়াত দেয়। একসাথে বসে ইফাতার ও আড্ডা বেশ ভালো সময় কাটে। তবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও দিনের বেলা দোকানপাট বন্ধ থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে।”

রমজান মাস অত্যন্ত মহিমান্বীত ও গৌরবের। এরপরও সবকিছু ছাপিয়ে উঠে আসে কিছু সমস্যার কথাও। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সুকন্যা দ্রং বলেন, “ইফতারের আয়োজন ও ঈদের উৎসবমুখর পরিবেশ তার ভালো লাগে। ছোট বেলা থেকে মুসলমানদের মধ্যে রমজানের উৎসব ও ঈদের আমেজ দেখে এসেছি যেটা আরো বেশি অনুধাবন করার সুযোগ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় এসে। এর বাইরে একটা সমস্যাই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা অনুভব করে সেটা হল খাবারের সমস্যা। দিনের বেলা খাবার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভর্তি পরীক্ষার সময় আগত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এই সমস্যা লাগবে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ সুদৃষ্টি দিতে পারে।”

অন্যদিকে লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী ফিদাল, একজন মুসলিম শিক্ষার্থী রমজানকে আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, “রোজা কেবল না খেয়ে থাকা নয়, এটি ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সহযোগিতা ও সম্মান রমজানের আবহকে আরও সুন্দর করে তোলে।”

সব মিলিয়ে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজান এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার সময়। কারও জন্য এটি ধর্মীয় সাধনার মাস, কারও জন্য পরিবর্তিত রুটিন ও বাস্তব চ্যালেঞ্জের সময়, তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই ক্যাম্পাসে তৈরি হয় সম্প্রীতির এক ইতিবাচক চিত্র।

এফকে/ জান্নাতুল নাঈমা সম্পা

শেয়ার করুন -