MCJ NEWS

কেন পড়বেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা?

ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মেধাক্রম, পছন্দের বিষয় আর ভবিষ্যৎ স্বপ্নের টানাপোড়েনে কেটে যায় অনেক শিক্ষার্থীর নির্ঘুম রাত। পছন্দের তালিকায় ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা’ নামটি বারবার এলেও মনে উঁকি দেয় এক চিরচেনা প্রশ্ন—“সাংবাদিকতা ছাড়া আর কী করা যায়?” কিংবা “ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?” অনেকে আবার দুই-এক বছর পড়াশোনার পরও ক্যারিয়ারের মানচিত্র আঁকতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন।

আসলে এই বিভাগ কোনোভাবেই সংবাদপত্রের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বহুমুখী সম্ভাবনার এক বিস্তৃত ক্যানভাস—যেখানে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং নেতৃত্বগুণ মিলেমিশে তৈরি করে ভিন্নধর্মী পেশাজীবনের পথ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের মতে, এই বিষয়টি ভবিষ্যতের যোগাযোগবিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার এক অনন্য প্রস্তুতিমঞ্চ।চলুন দেখে নেওয়া যাক, এই বিভাগের পেশার বৈচিত্র্যময় কিছু দিগন্ত—

জনসংযোগ: ভাবমূর্তির কৌশলী স্থপতি

অনেকের ধারণা, এ বিভাগে পড়লে একমাত্র পথ সাংবাদিকতা—এটি নিছক ভ্রান্ত ধারণা। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা খ্যাতিমান ব্যক্তিদের ভাবমূর্তি রক্ষা ও সংকট ব্যবস্থাপনায় জনসংযোগ (Public Relations) কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখা, মিডিয়া ব্রিফিং, প্রেস কনফারেন্স আয়োজন—এসব দক্ষতা পাঠ্যক্রমেই হাতে-কলমে শেখানো হয়। ফলে এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা জনসংযোগ পেশায় স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকেন।

আন্তর্জাতিক সংস্থায় কমিউনিকেশন অফিসার

UNICEF, UNDP কিংবা BRAC–এর মতো সংস্থায় ‘কমিউনিকেশন অফিসার’ পদটি যেমন সম্মানজনক, তেমনি চ্যালেঞ্জিং। উন্নয়ন প্রকল্পের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, জনসচেতনতা তৈরি, কিংবা মাঠপর্যায়ের কাজকে নীতিনির্ধারণী আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা—এসব ক্ষেত্রেই যোগাযোগবিদদের প্রয়োজন হয়। সামাজিক পরিবর্তনের অংশীদার হতে চাইলে এটি হতে পারে স্বপ্নের পেশা।

সাংবাদিকতা: রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভে নিজের অবস্থান

সত্যকে সামনে আনার সাহস যাঁদের আছে, তাঁদের জন্য সাংবাদিকতা এক অনন্য ক্ষেত্র। রিপোর্টার, সম্পাদক, সংবাদ উপস্থাপক কিংবা প্রুফরিডার—প্রতিটি ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সুযোগ শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবস্থাতেই নিজেদের কলম ও ক্যামেরাকে শানিত করতে সহায়তা করে। গণমাধ্যম কেবল পেশা নয়, এটি দায়বদ্ধতার এক প্রতিশ্রুতি।

ফ্যাক্ট-চেকিং: তথ্যযুদ্ধের নতুন ফ্রন্টলাইন

ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ও এআই-এর (AI) ব্যাপক প্রসারের ফলে বর্তমানে ভুয়া তথ্য খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে খবরের সত্যতা যাচাই বা ফ্যাক্ট চেকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ফ্যাক্ট চেকার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার আগ্রহও এখন অনেকের। ফ্যাক্টওয়াচের (FactWatch) ফ্যাক্ট চেকার রিদওয়ানুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফ্যাক্ট চেকিং বিষয়টি তুলনামূলক নতুন হলেও এর ব্যাপ্তি দিন দিন আরও বাড়বে। ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন করার জন্য এই সেক্টরে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মূলধারার মিডিয়া হাউজগুলোও পেশাদার ফ্যাক্ট চেকার নিয়োগ দিচ্ছে।”

গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করে বিদেশে মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যায়ে পড়ার দারুণ সুযোগ রয়েছে; বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পাওয়া যায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মশিউর রহমান জানান—”ডিজিটাল মিডিয়া, পাবলিক রিলেশনস, ডেটা জার্নালিজম, ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন ও মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়ে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থী যদি নিজের প্রোফাইল আগে থেকে গুছিয়ে রাখে এবং পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণার অভ্যাস গড়ে তোলে, তবে স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়”।

চলচ্চিত্র ও স্ক্রিপ্ট রাইটিং: গল্প বলার নতুন ভাষা

আপনার ভেতরে যদি একজন গল্পকার বাস করে, তবে এই বিভাগ হতে পারে তার উন্মোচনের জায়গা। ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, ভিডিও সম্পাদনা, গ্রাফিক ডিজাইন ও স্টোরিটেলিংয়ের প্রশিক্ষণ একজন শিক্ষার্থীকে দক্ষ চিত্রনাট্যকার বা নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি বিসিএস, গবেষণা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পথও উন্মুক্ত থাকে।

কী পড়ানো হয় এই বিভাগে?

নিউজ গ্যাদারিং, ব্রডকাস্ট জার্নালিজম, মোবাইল জার্নালিজম, পাবলিক রিলেশনস—এমন আধুনিক ও ব্যবহারিক কোর্সের পাশাপাশি ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগতত্ত্বের সমন্বিত পাঠ দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু পেশাগত দক্ষতাই নয়, সমাজ-রাষ্ট্র-সংস্কৃতির গভীর বোধও অর্জন করেন।

কারা পড়বেন?

যাঁরা গতানুগতিক ছক ভেঙে সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে চান, যাদের নেটওয়ার্কিং ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ আছে, এবং যারা প্রাণবন্ত ও গতিশীল পরিবেশে শিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন—গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা তাদের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। কেবল একজন পেশাজীবী তৈরি করা নয়; এই বিষয় গড়ে তোলে একজন সচেতন, বিশ্লেষণধর্মী ও বহুমাত্রিক মানুষ। প্রয়োজন শুধু স্পষ্ট লক্ষ্য, অবিচল প্রস্তুতি এবং শেখার প্রতি একাগ্রতা।

কেএইচ/সানজিদা সাথী, রুবায়েত হোসেন

শেয়ার করুন -