
রাত বাড়ে, ক্যাম্পাসের হলগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে থাকে। কারও ব্যাগ গুছানো শেষ, কেউ শেষ মুহূর্তে বাসের টিকিট খুঁজছে। করিডোরে ভেসে আসে একটাই প্রশ্ন,“কবে বাড়ি যাচ্ছিস?” ক্যাম্পাসের ঈদ যেন ঠিক এভাবেই আসে।ফেরার শব্দ হয়ে, একটু একটু করে বড় হয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়ে।
একসময় ঈদ মানেই ছিল সীমাহীন আনন্দ। নতুন জামা বিছানার পাশে রেখে ঘুমানো। সকালে সবার আগে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ানো। কোরবানির গরুর গলায় হাত রেখে ছবি তোলা। বাড়ি ভর্তি মানুষের শব্দ। রান্নাঘরে মায়ের ব্যস্ততা। আর উঠোনজুড়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের ছুটোছুটি। তখন আনন্দ খুব সহজ ছিল। অল্পতেই পূর্ণ হয়ে যেত মন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈদের রংও বদলে যায়। একসময় যে ঈদ ছিল নিজের জন্য, এখন তা হয়ে ওঠে পরিবারকে ঘিরে। দায়িত্ব ও ব্যস্ততা ভাড়ে ম্লান হয়ে আসে আনন্দে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো:মনযুরুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে ঈদ এখন এক ধরনের নস্টালজিয়া। তিনি বলেন, “ঈদ উল আযহা মানেই ছিলো ছোটবেলায় মনের মধ্যে বড় ঈদ। ১০ দিন আগে থেকেই চাচ্চুর সাথে হাটে যাওয়ার জন্য বসে থাকতাম, চাচ্চু ঢাকা থেকে এসেই আমাকে নিয়ে হাটে যেতেন। গরু কেনা শেষ হলে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত গরুকে গাছের পাতা খাওয়ানো, যত্ন নেওয়া দুষ্টামিতে কেটে যেত সময়। ঈদের দিন প্রত্যেকের বাড়িতে যেতাম কত আনন্দটাই করতাম। এখন বড় হয়েছি ব্যস্ততাও বেড়েছে। ঈদ আনন্দটাও কমেছে। আর এখন হাটে যাওয়ার অপেক্ষা নেই গরু কিনা হয় যদিও। তবে ঈদ আনন্দ টা ছোটদের মধ্যে দেখেই মনে প্রশান্তি কাজ করে।”
অনেকেই বলে থাকেন বড়দের ঈদ একদিন আর ছোটদের ঈদ ৭ দিন। সেই প্রসঙ্গে ঈদের দিন নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন কুবি’র শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা শান্তা। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল অন্যরকম এক আনন্দ। তখন ঈদের আনন্দ খুব সহজ কিছু জিনিসেই খুঁজে পাওয়া যেত।বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো আর সারাদিনের হৈচৈ ছিল ঈদের সবচেয়ে সুন্দর অংশ। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঈদের অনুভূতিও অনেক বদলে গেছে। এখন আগের মতো সেই নির্ভেজাল উত্তেজনা আর কাজ করে না। জীবনের ব্যস্ততা আর দায়িত্ব অনেক কিছু বদলে দেয়। তবুও ঈদের আনন্দ পুরোপুরি কমে যায় না, শুধু তার রূপ বদলায়। এখন আনন্দ লাগে পরিবারের সবাইকে একসাথে দেখতে পারলে।প্রিয় মানুষদের হাসিমুখ দেখলেও ঈদটা পূর্ণ মনে হয়। ছোটবেলার ঈদ ছিল উচ্ছ্বাসে ভরা, আর এখনকার ঈদ অনুভূতিতে ভরা। প্রতিটা বয়সেই ঈদ সুন্দর, শুধু আনন্দ প্রকাশের ধরনটা আলাদা।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী আনোয়ারুল হকের কাছে ঈদ আনন্দ চাপা পড়ে যায় দৈনন্দিন জীবনে ব্যস্ততার আড়ালে। তিনি বলেন, “এখন ঈদের দিনটা আট দশটা সাধারণ দিনের মতোই মনে হয়, দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা আর জীবনের কঠিন বাস্তবতার কারনে। ছোট বেলায় ঈদ আনন্দ ছিল সহজ সরল জিনিসে আর নতুন জামা কিনার অনুভূতিতে। এখন এমন হয় যে ঈদের দিন সবার সাথে এক হওয়াটাই বড় আনন্দের।”
বিশ্ববিদ্যালের অন্য শিক্ষার্থী ইমরান মোহাম্মদের কাছে ঈদ আনন্দ হল পরিবারের সবার সাথে সময় কাটানো। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় কুরবানির ঈদ মানেই ছিল নতুন জামা, সেলামি আর সারাদিনের উচ্ছ্বাস। বড় হওয়ার পর বুঝেছি ঈদের আসল আনন্দ নতুন কিছু পাওয়ায় নয়, পরিবারের সাথে সময় কাটানো আর সবার মুখে হাসি ফোটানোর মাঝে। সময় বদলেছে আমরাও বড় হয়েছি। কিন্তু ঈদের ভালোবাসা আর একসাথে থাকার আনন্দ আজও একই আছে।”
ক্যাম্পাসজীবন মানুষকে স্বাধীনতা শেখায়,আবার দূরত্বও শেখায়। হলের ছোট রুমে বসে অনেকেই বুঝতে শেখে ঈদ মানে শুধু উৎসব নয়, আপন মানুষদের কাছে ফিরে যাওয়ার নামও। কেউ কেউ অবশ্য ফিরতেও পারে না। ব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা টাকার হিসেব আটকে দেয় পথ। তখন ঈদের দিনেও ক্যাম্পাসের কিছু জানালায় আলো জ্বলে থাকে।
কুবি শিক্ষার্থী রাফি বলেন, “প্রথমবার হলে থেকে ঈদ করেছিলাম। সেদিন বুঝেছি, পরিবারের সঙ্গে ঈদের মূল্য আসলে কত বড়।”
তার কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য শিক্ষার্থীর একই অনুভূতি। বড় হওয়ার পর মানুষ হয়তো নতুন জামা নিয়ে আর উত্তেজিত হয় না। কিন্তু তবুও ঈদ এলেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত টান অনুভব হয়। শেষ পর্যন্ত ঈদ বদলায় না, বদলে যায় মানুষ। শৈশবের ঈদ ছিল নতুন জামার গন্ধ, সালামি আর সকালবেলার অস্থির আনন্দে ভরা। আর বড় হওয়ার পর ঈদ হয়ে ওঠে দায়িত্ব, ব্যস্ততা আর হিসাবের দিনের মাঝখানে একটু থেমে যাওয়ার উপলক্ষ। তবু কোথাও না কোথাও সেই পুরোনো শিশুটি রয়ে যায়। গরুর হাটের শব্দে, তাকবিরের ধ্বনিতে কিংবা পরিবারের সবাই একসাথে বসে খাবার খাওয়ার মুহূর্তে। হয়তো আনন্দের রং আগের মতো উজ্জ্বল নেই। কিন্তু ঈদের আসল সৌন্দর্য এখন নতুন জামায় নয়, প্রিয় মানুষগুলোর পাশে থাকার মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায়।
এফকে/ বিজয় কুমার