MCJ NEWS

এই পৃথিবীতে আদরেরও বাজারদর আছে

আমার নাম ময়না। সাধারণত এই নামটা মানুষের পোষা টিয়া কিংবা শালিকের সঙ্গে বেশি মানায়, গরুর সঙ্গে নয়। তবু আমার কর্তা আদর করেই নাম রেখেছিল ময়না। দেখতে আমি লালচে বর্ণের। আশপাশের মানুষজন বলে, কোরবানির পশুর মধ্যে এই রঙের কদর নাকি একটু বেশিই। আমার চোখ দুটোও বেশ ডাগর। গ্রামের ভাষায় যাকে বলে “মায়াভরা চোখ”।

জন্মের পর থেকে আমি ছিলাম কর্তার সংসারের একরকম সদস্য। নিজের খাওয়া দাওয়া ফেলে তিনি আমাকে গোসল করাতেন, খাইয়ে দিতেন। আমার থাকার জন্য তিনজন মানুষের ঘরসমান বড় একটি গোয়ালঘর বানানো হয়েছিল। ছোটবেলায় সেটাকেই আমার রাজপ্রাসাদ মনে হতো।

সময়ের সঙ্গে আমিও বড় হতে লাগলাম। কিন্তু এক ঈদুল আযহার আগে হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে যেতে শুরু করল। আশপাশের মানুষজন দলে দলে এসে আমাকে দেখে যেত। কেউ দাঁত দেখে, কেউ পিঠ চাপড়ে, কেউ আবার দাম হাঁকাত। কর্তা তখন শুধু হাসতেন। যেন আমাকে বিক্রি করার কথা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না।

শেষ পর্যন্ত এক সকালে আমাকেও হাটে তোলা হলো। সেখানে গিয়ে বুঝলাম, আমি একা নই। আমার মতো আরও শত শত প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে—কারও চোখে ভয়, কারও চোখে বিস্ময়, আর সবার গলায় একই দড়ি।> হাটে গিয়ে প্রথমবার বুঝলাম, মানুষ আসলে খুব অদ্ভুত প্রাণী। ছোটবেলায় যে হাত মাথায় বুলিয়ে আদর করে, বড় হলে সেই হাতই দাঁত দেখে দাম ঠিক করে। যে চোখে আমাকে পরিবারের সদস্য মনে হতো, ঈদ যত ঘনিয়ে এলো সেই চোখেই আমি ধীরে ধীরে “পশু” হয়ে উঠলাম।

হাটের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম, এখানে কারও নাম নেই। এখানে সবাই ওজন, দাম আর মাংসের হিসাব। কেউ বলছে আমি “মোটা”, কেউ বলছে “দাম একটু বেশি”, কেউ আবার আমার শরীরের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন আমি কোনো জীবন্ত প্রাণী নই, বরং কসাইখানার ঝুলন্ত ভবিষ্যৎ।

কর্তা অবশ্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার গলায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখেও কেমন যেন অস্বস্তি দেখেছিলাম। হয়তো মানুষ ভালোবাসে, কিন্তু প্রয়োজনের কাছে সেই ভালোবাসা খুব বেশিদিন টেকে না।

সন্ধ্যার পর হাটের বাতিগুলো জ্বলে উঠল। চারপাশে মানুষের চিৎকার, দরদাম, হাসাহাসি। অথচ আমাদের চোখে তখন শুধু একরাশ নীরবতা।
গভীর রাতে আমাকে ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো এক অপরিচিত বাড়িতে। নতুন উঠোন, নতুন মানুষ, নতুন গন্ধ—সবকিছুই কেমন অচেনা। সেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা জমতে লাগল। মনে হচ্ছিল, আমার জন্য নির্ধারিত সময়টা আর খুব বেশি বাকি নেই।

ঈদের সকাল এলো। শেষবারের মতো আমাকে গোসল করানো হলো, গলায় হাত বুলিয়ে আদর করা হলো। মানুষ বড় বিচিত্র—মৃত্যুর আগমুহূর্তেও তারা ভালোবাসার অভিনয় করতে ভোলে না।

তারপর একসময় আমার গলায় ছুরি চালানো হলো। চারপাশে তখন তাকবিরের ধ্বনি, মানুষের ব্যস্ততা, উৎসবের আনন্দ। আর আমি ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছিলাম।

আমি ময়না। একটা গরু। ঈদ আমাকে শিখিয়েছে, এই পৃথিবীতে আদরেরও বাজারদর আছে।

এফকে/ জান্নাতুল নাঈমা সম্পা

শেয়ার করুন -