
রাতে নখ কাটতে নেই, মাটিতে লিখলে বুদ্ধি কমে, গাছের নিচে রাতে ঘুমালে ভূতে ধরে। এই কথাগুলো আমাদের কানে পৌঁছেছে দাদির কন্ঠ বেয়ে কিংবা মায়ের আঁচল ছুঁয়ে। শুনেছি উঠোনের সন্ধ্যায় বা ঘুমের আগে কোনো রুপকথার গল্পের ফাঁকে। তখন প্রশ্ন করিনি। কারণ যিনি বলেছেন তার চোখে ছিল বিশ্বাস আর সেই বিশ্বাসই ছিল আমাদের প্রথম পৃথিবী।
এখন বড় হয়ে যুক্তি খুঁজি। কারণ এখন বিজ্ঞান এসেছে, এসেছে সংশয়। তখন মনে হয় এসব কেবলই অন্ধকার কিংবা কুসংস্কারের গল্প। আলোহীন মানুষের অন্ধ বিশ্বাস। যে সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, না ছিল গণস্বাস্থ্যের গল্প সেই সমাজকে বাচঁতে হতো ভয় দিয়ে, গল্প দিয়ে, বিশ্বাসের অদৃশ্য বাঁধন দিয়ে।
এই যেমন “রাতে নক কাটলে অশুভ শক্তির আগমন ঘটে” এই ভয় হয়তো অনেক শিশুকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো রাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত থেকে কিংবা মারাত্মক কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে।
“মাটিতে দাগ কাটতে নেই” কারণ এতে ঘরে অভাব অনটন বা দারিদ্র্য নেমে আসে। আসলেই কি তাই? সেই সমাজে মাটিতে বসা বা ধুলোবালিতে নোংরা হওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হতো। এছাড়া অতীতে গুরুজনের নাম বা কোনো পবিত্র শব্দ মাটিতে লেখা বেয়াদবি বা অসম্মানজনক বলে মনে করা হতো। সেখান থেকেই হয়তো একসময় সামাজিক শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে “মাটিতে লেখা নিষেধ” বা “মাটিতে লিখলে বুদ্ধি কমে যায়” জাতীয় কথাগুলো প্রচলিত হয়েছে।
“পরীক্ষার আগে ডিম খেলে শূন্য পাওয়া যায়” এমন ধারণা আজও অনেকের মধ্যে আছে। মূলত প্রাচীনকালে ডিমকে ভারী খাবার মনে করা হতো। সকালে দীর্ঘসময় না খেয়ে ডিম খেয়ে পরীক্ষায় গেলে অনেকের অস্বস্তি বা মাথাব্যথা হতো। ধীরে ধীরে সেই অভিজ্ঞতাই “ডিম খেলে ডিম পাওয়া যায়” ধরনের লোকবিশ্বাসে রূপ নেয়।
“রাতে গাছের তলায় গেলে ভূতে ধরে” এই ভয় হয়তো মানুষকে দূরে রেখেছিল রাতের অন্ধকারে ভেঙে পড়া ডাল, বিষাক্ত পোকামাকড় কিংবা অক্সিজেনের স্বল্পতা থেকে। যা মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
“খাবার খেতে খেতে কথা বললে অমঙ্গল হয়” এই কথাটি হয়তো শিশুদের ধীরে সুস্থে খাবার খাওয়ার অভ্যাস শেখাতে কিংবা খাবার গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
আশেপাশে ঘটে যাওয়া লোককথা কিংবা এসব কুসংস্কারগুলো একটু বিশ্লেষণ করলে প্রচলিত ধারণাগুলো ৯০ শতাংশই জনমানবের কল্যাণে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তখনকার মানুষ হয়তো বিজ্ঞান কিংবা ব্যাখ্যা জানতেন না। কিন্তু জানতেন কার্বন ডাই-অক্সাইডের কথা। জানতেন রাতের গাছ মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। সেই জানাটুকু তারা ঢেলে দিয়েছেন ভূতের গল্পে, কিংবা পরিবারের অমঙ্গলে বা বড়কোনো বিপদের ভয়ে। কারণ যা বোঝানো যায় না তা ভয় দিয়ে ঠেকানো যায়। কুসংস্কার তাই কেবল অজ্ঞতার ফসল নয়। অনেক সময় এগুলো প্রাচীন মানুষের নিজস্ব ভাষায় লেখা সতর্কবার্তা। তখন বিজ্ঞানের পোশাক ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রয়োজনটুকু ঠিকই ছিল। ছিল ঠিকে থাকার নিখুঁত কৌশল।
এফকে/ বিজয় কুমার