সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে। ক্লাস আর কাজের ফাঁকে নিজের মতো সময়ও মাঝেমধ্যে জুটে যাচ্ছে। তবুও হঠাৎ করে মনে হয় সব যেন একটু বাড়াবাড়িই। ঘড়ি বলছে ছুটতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়া তাগাদা দিচ্ছে নিজেকে প্রমাণের। আশপাশের কণ্ঠস্বর বলছে, ‘আরও কিছু হও’। অথচ নিজের মন? সে চুপ করে থাকে। সে চায় যান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে । সে চায় সাহস, সহজে ‘না’ বলার সাহস। একটু নিজের মতো সময় কাটানোর ফুরসত।
১২ জুলাই— এমনই এক উপলক্ষ ‘সিমপ্লিসিটি ডে’। এ যেনো ক্যালেন্ডারের আর পাঁচটা দিন নয় বরং নিজেকে ফিরে পাওয়ার এক সুযোগ। এমন একটা দিন যেদিন আমরা ভাবার চেষ্টা করি- জীবন মানে অবিরত ছুটে চলা নয়, জীবন মানে কখনও একটু থামা। নিজের সত্ত্বাকে আরেকবার চিনে নেওয়া।
দিনটির সূচনা এক ব্যতিক্রমী মানুষের জীবনের অনুপ্রেরণা থেকে। তার নাম হেনরি ডেভিড থ্রেল, একাকী একটি কুঁড়েঘরে প্রকৃতির কোলে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক সহজ অথচ গভীর জীবন। তাঁর কাছে জীবন মানে বিলাসিতা বা প্রতিযোগিতা নয় বরং নিজেকে জানার, নিজের মতো করে বাঁচার এক স্বাধীনতা। তাঁর জন্মদিনেই তাই পালিত হয় দিনটি। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জটিলতার মাঝেও সহজ থাকা যায়।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম। ১৬ তম আবর্তনের হাসিখুশি, প্রাণচঞ্চল এই তরুণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনি কী নিজের ভেতরের শব্দ শুনতে পান এত কোলাহলের মাঝে?” কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলেছিল, “চাই। কিন্তু বাইরের চাপ, প্রত্যাশা আর সময়ের ঘূর্ণিতে নিজের জন্য সময়ই মেলে না। আমরা জানি না আসলে আমাদের পছন্দ কী, দুর্বলতা কী, আমরা নিজেকেই চিনতে ভুলে যাই।” “যদি একটি সিমপ্লিসিটি ডে সাজাতে বলা হয়, তাহলে সেটা কেমন হতো?” এর জবাবে তিনি বলেন, “স্মার্টফোন থাকবে না, থাকবেনা সোশ্যাল মিডিয়া। বন্ধুদের নিয়ে চলে যেতাম কোনো নদীর ধারে বা পাহাড়চূড়ায়। নিজেরা রাঁধতাম, গান গাইতাম, গল্প করতাম। শুধু প্রকৃতি আর আমরা।”
১৭তম আবর্তনের কানিজ ফাতেমা রিমি, পড়েন আইন বিভাগে। যিনি বিতর্কের মঞ্চে নিখুঁতভাবে যুক্তি সাজান, তিনিও খুঁজছেন নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ। এই দিবসের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন “কাছের মানুষজন বুঝলেও, বোঝেনা অন্যরা। একটু নিজের মতো থাকলেই মানুষ ভাবতে শুরু করে আমি পাল্টে গেছি, ইগো দেখাচ্ছি। অথচ প্রকৃতির কাছে, নিজের কাছে একটু ফিরে যাওয়াটা আমাদের সবারই দরকার।” তার কাছে সিমপ্লিসিটির মানে কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যতটুকু আছে তাতেই খুশি থাকা। বিলাসিতা নয়, সন্তুষ্টি। এই শান্তিটুকুই আমার কাছে সহজ জীবনের সুখ”
আমাদের চারপাশের সমাজ এমনভাবে গড়া যেখানে সহজ জীবনটাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে কঠিন। প্রতিদিনই নিজেকে প্রমাণের চাপ, প্রতিযোগিতার এক দমবন্ধকর পরিবেশ। তাই মাঝেমধ্যে দরকার হয় ফুরসত। নিজের জন্য, নিজের পাশে থাকার। প্রয়োজন হয় এমন একটি দিনের যেখানে— কেউ কোনো তাড়া দেবে না, বলবে না কাজের কথা, যান্ত্রিক সফলতার কথা।
সিমপ্লিসিটি ডে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিজেকে ভালোবাসতে হয় প্রতিদিন। তবে মাঝেমধ্যে একদিন একটু বাড়তি করে। যেখানে থাকবেনা তুলনা, না থাকবে প্রতিযোগিতা। কেবল থাকবে নিজের সঙ্গে নিজের বন্ধুত্ব। জীবন সহজ হলে তবেই হয় সুন্দর। তাই আজ ১২ জুলাই, একটু থামুন, নিজের পাশে দাঁড়ান। হয়তো এটাই সে-দিন, যেদিন আপনি নিজের সত্ত্বার মুখোমুখি হতে পারবেন।
আই/কিফায়াত উল হক