অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে মঞ্চে ফুল দিতে অনুমতি না দেওয়ায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) এক শিক্ষককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার (১১ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রথম প্রতিরোধ দিবস’ শীর্ষক আলোচনা সভার মঞ্চে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক। অভিযুক্ত ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হাসান কামরুল।
অভিযোগে বলা হয়, ওইদিন (১১জুলাই) আলোচনা সভায় উপস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহ এবং বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুমাইয়া আফরিন সানি। অনুষ্ঠানে চলাকালে ফুল দেওয়ার অনুরোধে অনুমতি না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে হাসান কামরুল শিক্ষক মুতাসিম বিল্লাহকে উচ্চ স্বরে তর্কে জড়ান এবং ‘প্রোভিসির খবর আছে’ বলে হুমকি দেন।
ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, “আমার এবং সানি ম্যাডামের উপস্থাপনার সময় হাসান কামরুল কয়েকবার এসে মঞ্চে ফুল দেওয়ার অনুরোধ জানান মুরাদনগর ছাত্রকল্যাণ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে। আমি তখন তাকে বলি, যেহেতু অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক উপ-উপাচার্য (প্রোভিসি) ম্যাডাম—তাঁর অনুমতি ছাড়া কাউকে মঞ্চে উঠতে দেওয়া যাবে না। প্রোভিসি ম্যাডামও তখন জানালেন, শেষের দিকে যদি সুযোগ হয় তবে দেখা যাবে।
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষদিকে আমি আবার তাকে বলি, আপাতত কাউকে স্টেজে উঠতে দেওয়া যাবে না। উপদেষ্টার সময় সংকীর্ণ, নিরাপত্তার দিকটাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। তখন সে হঠাৎ করে আমার দিকে ক্ষেপে গিয়ে এগিয়ে আসে এবং বলে—‘কেন ফুল দিতে দেওয়া হচ্ছে না?’ আমি বলি—প্রোভিসি ম্যাডাম নিষেধ করেছেন। তখন সে উল্টো আমাকে চিৎকার করে বলে, ‘প্রোভিসির খবর আছে।’
এ ঘটনায় আমি হতবিহ্বল হয়ে যাই, কারণ তার মুখভঙ্গি, শরীরী ভাষা এবং কণ্ঠস্বর অত্যন্ত আগ্রাসী ছিল। আমি বলি, ‘হু আর ইউ?’ তখন সে আমাকে স্পষ্ট হুমকি দেয়। এরপর চোখ রাঙিয়ে চলে যায়। এর মধ্যে দেখি, তাকে ঘিরে কিছু শিক্ষার্থী জড়ো হচ্ছে, কেউ কেউ ছবি-ভিডিও করছে—যাদের কেউ কেউ সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী বলেও ধারণা করি।
মঞ্চে উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করায় আমি সানি ম্যাডামকে অনুরোধ করি, যেন আমি আর উপস্থাপনা না করি। আমি চাইনি অনুষ্ঠানটি কোনোভাবে বিশৃঙ্খল হোক। শহীদ আব্দুল কাইয়ুমের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন না, তাই তাঁদের সম্মান জানানো সম্ভব হয়নি। সবদিক বিবেচনায় আমরা অনুষ্ঠানটি দ্রুত শেষ করার সিদ্ধান্ত নিই।”
তিনি আরও জানান, “পূর্ববর্তী সময়েও সামাজিক মাধ্যমে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে তাকে নিয়ে হাসান কামরুল কটূক্তি ও ট্রল করেছেন। ফলে ঘটনাটি তিনি পূর্বপরিকল্পিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন। ঘটনার পরপরই তিনি প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ দেন এবং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।”
অনুষ্ঠানের আরেক সঞ্চালক, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুমাইয়া আফরিন সানি বলেন, “প্রোগ্রাম শুরুর আগে ফার্মেসি বিভাগের নাঈম ও পরে হাসান কামরুল উপদেষ্টাকে ফুল দেওয়ার অনুরোধ করেন। আমরা জানাই প্রোভিসি ম্যাডাম অনুমতি না দিলে তা সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ পর নাঈমের ফোন থেকে আমার হোয়াটসঅ্যাপে প্রোভিসি ম্যাডামের নামে একটি বার্তা আসে—যেখানে বলা হয়, প্রোগ্রামের শেষ দিকে ফুল দেওয়ার ব্যবস্থা করতে।”
“এরপর কয়েকজন এসে বিষয়টি সরাসরিও জানান, তাই আমরা তা শিডিউলে যুক্ত করি। কিন্তু প্রধান অতিথির বক্তব্য শুরুর আগে প্রোভিসি ম্যাডাম আমাকে ডেকে বলেন অ্যাসোসিয়েশনের ছেলেদের বলো, ফুলটা যেন বাইরে দেয়। স্টেজের প্রোগ্রাম শেষ করে উপদেষ্টা বাইরে গেলে তখন যেন দেয়। এখানে যেন না দেয়।’ উপদেষ্টার সময় সংকীর্ণ এবং তাঁর শহরে আরেকটি অনুষ্ঠান থাকায় হয়তো এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর আমরা আর মঞ্চে ফুল দেওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করিনি।”
তিনি আরও বলেন, প্রোগ্রামের শেষদিকে আমি উপস্থাপনা করছিলাম এবং আমার একটু পেছনে ছিলেন মুতাসিম স্যার। তখন স্যারের কণ্ঠ থেকে জোরে শুনতে পাই—‘হু আর ইউ?’ আমি সঞ্চালনায় থাকায় পেছনের দিকের পরিস্থিতি পরিষ্কার বুঝতে না পারলেও বোঝা যাচ্ছিল ওদিকে কিছু একটা বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। আমি চাচ্ছিলাম অনুষ্ঠান দ্রুত শেষ হোক।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাসান কামরুল বলেন, “ঐখানে সেদিন এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেখানে সাংবাদিকরাও ছিলেন, তারপর পাশে সহ-উপস্থাপিকা সানি ম্যাডামও ছিলেন। আমি তাঁকে (মুতাসিম বিল্লাহ) বলেছি, ‘প্রোভিসি ম্যাডাম বলার পরও আপনি কেন ফুল দেওয়ার জন্য ডাকলেন না?’ তখন তিনি আমাকে বলেন, ‘প্রোভিসি ম্যাডাম নিষেধ করেছেন।’ তখন আমি বলি, ‘প্রোভিসি ম্যাডামকে প্লিজ আরেকবার জিজ্ঞেস করবেন?’—কারণ উনি তো মঞ্চেই বসা ছিলেন উপদেষ্টাসহ। তখন তিনি আমাকে বলেন, ‘তাহলে আপনিই জিজ্ঞেস করুন।’ তখন আমি বলি, ‘আপনি এভাবে কথা বলেন কেন?’ তখন তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘হু আর ইউ?’ আমি তখন বলি, ‘ইটস ওকে,’ বলে চলে আসি। এর বাইরে আর কোনো কথা হয়নি।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হালিম বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে অফিসিয়ালি যা করার দরকার ছিল, তা করা হয়েছে।”
সদর দক্ষিণ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সেলিম বলেন, “ঘটনার বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী বলেন, “বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাচ্ছে না।”
/নিলয় সরকার, আসিফ মাহমুদ