প্রিয় খাবার মানে কেবল কোনো নির্দিষ্ট রান্না নয়—এটা এক নিঃশব্দ আবেগের নাম, আত্মার প্রশান্তি, কখনো কখনো একটুকরো স্মৃতিও। আমাদের প্রতিদিনের খাওয়া-দাওয়া হরহামেশার ঘটনা। কিন্তু কিছু খাবার এমন আছে, যেগুলো শুধু স্বাদের জন্য নয়, হৃদয়ের একান্ত অনুভূতির সঙ্গী হয়ে ওঠে।
কারও কাছে প্রিয় খাবার মানে মায়ের হাতে রান্না করা গরুর মাংস, কারও কাছে শীতের সকালের খেজুর রসের পায়েস, আবার কারও কাছে ভাত-ডাল-আলুভর্তার সরল স্নিগ্ধতা। এই পছন্দ নির্ভর করে মানুষটার শৈশব, তার বেড়ে ওঠা, অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের ওপর।
প্রিয় খাবার তাই কখনো শুধু স্বাদে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা হয়ে ওঠে একজন প্রিয় মানুষের প্রতিচ্ছবি, মায়ের স্নেহমাখা হাতের ঘ্রাণ, বা শৈশবের কোনো ধূসর বিকেলের ঘরফেরা।
পাঁচমিশালি টকঝালে মায়ের স্মৃতি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রাতুল পিউল জানান, তার প্রিয় খাবার পাঁচমিশালি ছোট মাছের টকঝাল। “ছোট মাছ এমনিতেই আমার প্রিয়, তার ওপর টক আর ঝাল—সব প্রিয় স্বাদের একসঙ্গে মিশেল। এটা প্রথম খেয়েছিলাম বাসায়, মায়ের হাতের রান্নায়। সেই স্বাদ আজও ভুলতে পারিনি।”
রাতুলের ভাষায়, এটা শুধু খাবার নয়—মায়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলেই এতটা আপন। “দেশীয় খাবারের স্বাদ আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক রান্নায় মাতাল হয়ে আমরা হয়তো ভুলতে বসেছি এই ঐতিহ্য। আমি চাই, এই খাবারটাকে ধরে রাখতে।”
গরুর মাংস: এক অন্তহীন টান
চট্টগ্রামে বড় হওয়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাছিন মাহতাব মাহিনের প্রিয় খাবার গরুর মাংস। “গরুর মাংসকে হারানোর ক্ষমতা অন্য কোনো খাবারের নেই—ভুনা, কসা, ঝোলা যেভাবেই হোক না কেন। মাহিনের গরুর মাংসপ্রেম এতটাই বিখ্যাত ছিল যে, বন্ধুদের মধ্যে মজা করে প্রায়ই বলা হতো, “ওর হাত কাটলে রক্ত নয়, গরুর ঝোল বের হবে!”
মাহিন জানালেন, মেজবানি মাংসের টান তাকে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিয়ে গেছে। “রাজশাহীতে পেয়েছি কালাভুনার অন্য রকম স্বাদ, এবার টার্গেট দিনাজপুর। শুনেছি ওখানে গরুর মাংসের স্বাদ অন্যরকম।”
তিনি বলেন, প্রিয় খাবার তার কাছে শুধুই খাবার নয়—এটা ভ্রমণের অনুপ্রেরণা, ভালোবাসার এক রসায়ন।
“ভবিষ্যতে যদি রেস্টুরেন্ট খুলি, এটা আমার সিগনেচার ডিশ হবে। আমি চাই, যেই স্বাদের ফ্যান আমি, সেই স্বাদের ফ্যান হোক সবাই।”
মায়ের হাতের বিরিয়ানির
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা শান্তার প্রিয় খাবার বিরিয়ানি। “বিশেষ কোনো কারণ নেই, কিন্তু আমার আম্মু বিরিয়ানি খুব ভালো রান্না করেন। সেই স্বাদের টানেই এটা আমার প্রিয় খাবার হয়ে গেছে।”
শান্তা বলেন, “আম্মুর হাতের ছোঁয়া যেন বিরিয়ানির স্বাদ আরও বাড়িয়ে দেয়। বাইরে অনেকবার খেয়েছি, কিন্তু বাসার বিরিয়ানির মতো তৃপ্তি কোথাও পাইনি। যদি সম্ভব হতো, সবার সাথে শেয়ার করতাম মায়ের হাতের সেই স্বাদ।”
প্রিয় খাবার আমাদের কাছে হয়ে ওঠে স্মৃতির বাহক। বাবার পছন্দের তরকারির আলু, হয়তো তার নিজের প্রিয় নয়—কিন্তু সন্তানকে মাংস তুলে দিতে দিতে সেই আলুই হয়ে গেছে ভালোবাসার প্রতীক।
আমাদের পছন্দের তালিকায় থাকা খাবারগুলো তাই শুধু রেসিপির বিষয় নয়। এগুলো মিশে থাকে ভালোবাসা, স্মৃতি, আত্মত্যাগ আর অনুভবের সঙ্গে। শুধু খাওয়ার বিষয় নয়—এই খাবারগুলো নিঃশব্দে বলে যায় আমাদের জীবনের গল্প।
/হাসিন আরমান