“ঐ নূতনের কেতন ওড়ে, কালবোশেখির ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর”— নজরুলের এই আহ্বানের মতোই, ২০২৫ সালের ১লা জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বয়ে গিয়েছিল নবজাগরণের হাওয়া। সকালটা ছিল একেবারে নতুন দিনের মতো— রোদ ছুঁয়ে যাওয়া লালমাটি,সবুজে ঢাকা প্রান্তর। তার মাঝখানে ১৯তম আবর্তনের শিক্ষার্থীদের পদচারণা। কেউ নতুন জীবনের উত্তেজনায় মুগ্ধ, কেউ আবার চারপাশের বিশালতাকে দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত।
আইন বিভাগের আরিফুল ইসলাম আরিফও সেই দিনেরই একজন। আরিফ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই ভাবতাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় মানে এক জীবন্ত প্রেরণার জায়গা— যেখানে প্রতিটি সকাল নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে। এখানে এসে বুঝেছি, এটি শুধু ডিগ্রির জায়গা নয়, জীবন শেখার জায়গা। সংগ্রামের ভেতর আলো খুঁজতে শেখায় এই বিশ্ববিদ্যালয়।” তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, যেন নিজের ভবিষ্যতের গল্প তিনি গড়ে তুলতে চলেছেন।
অন্যদিকে মার্কেটিং বিভাগের সাবিবা আফরোজ নিহার চোখে ধরা পড়ে এক মিশ্র বাস্তবতা। তিনি জানালেন, “এখানকার পরিবেশ সত্যিই সুন্দর, শিক্ষকরা আন্তরিক। তবে লাইব্রেরি ছোট, মেয়েদের জন্য আলাদা বিশ্রামের জায়গাও নেই— এটা কষ্ট দেয়। তবুও এখানে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ শেখার পরিবেশ আছে, যা সব সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে যায়।” তার কথায় ছিল এক পরিণত উপলব্ধি— যেখানে ভালোবাসা ও হতাশা দুটোই মিশে তৈরি হয়েছে বাস্তব জীবনের রঙ।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ফাউজিয়া ফারিহা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক অন্য ছবি আঁকলেন। মুখে প্রশান্ত হাসি, তিনি বললেন, “আমার সবচেয়ে আনন্দঘন অভিজ্ঞতা ছিল ‘এমসিজে উইক’। পুরো সপ্তাহজুড়ে সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণী— যেন পুরো ক্যাম্পাস জেগে উঠেছিল রঙে আর উৎসবে। সেই মিলনমেলায় নবীন-প্রবীণ সবাই এক পরিবারের মতো ছিল। সেখানে বুঝেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় মানেই একসাথে বেড়ে ওঠা।”
তবে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার গল্পও কম নয়। ইংরেজি বিভাগের মো. কবির হোসেন সম্রাট স্মৃতিচারণ করলেন প্রথম দিকের কঠিন দিনগুলোর। “বাড়িঘর, চেনা মুখ— সব ফেলে একা নতুন জায়গায় আসাটা সহজ ছিল না। প্রথম দিকে র্যাগিংয়ের ভয় পেতাম। কিন্তু অনেক সিনিয়র ভাইবোন পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহস দিয়েছেন। এখন মনে হয়, এই অভিজ্ঞতাগুলোই আমাকে শক্ত করেছে। কষ্টের মধ্যেই মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়।” তার কথার প্রতিটি শব্দে ছিল সেই সংগ্রামী বাস্তবতার উপলব্ধি।
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের খাদিজা আক্তার সুরাইয়া মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানেই আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠন।তিনি বলেন “ভর্তি হওয়ার আগে ভাবতাম— এখান থেকেই স্বাধীনতার শুরু। কিন্তু এখানে এসে বুঝেছি, স্বাধীনতা মানেই দায়িত্ব, পরিশ্রম আর প্রতিযোগিতা। এই জায়গা আমাকে নিজের সীমা চিনতে শিখিয়েছে, সাহসী হতে শিখিয়েছে।” তার চোখে সেই পরিণত বিশ্বাস— জীবন কখনও সহজ নয়, কিন্তু সবসময় শেখার মতো।
ফার্মেসি বিভাগের মো. জিহাদ হোসেনের চোখে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে চলার আরেক নাম। জিহাদ জানান, “এই ক্যাম্পাস আমার মনে প্রশান্তি আনে। পাহাড়, বাতাস আর এই লাল মাটি এক অদ্ভুত শক্তি দেয়। হয়তো শিক্ষার মান এখনো পুরোপুরি পরিপূর্ণ নয়, কিন্তু আমি আশাবাদী— এই বিশ্ববিদ্যালয় একদিন আমাদের গর্ব হয়ে উঠবে।”
সেদিনের সেই নবীনদের মুখে যত গল্প, তত অনুভূতি। কারও জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মানে নতুন সূচনা, কারও কাছে তা নিজেকে আবিষ্কারের এক যাত্রা। তাদের হাসি, আশা আর ভাবনার ভেতর লুকিয়ে আছে একটাই সত্য— কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এমন এক জায়গা, যেখানে মানুষ নিজের মধ্যকার আলো চিনতে শেখে।
কেএইচ/ উম্মে হাবিবা মৌ,মনিরা আক্তার শিলা।