MCJ NEWS

আমরা কি হার্জগের সেই পেঙ্গুইন হয়ে উঠছি?

জার্মান নির্মাতা ভের্নার হার্জগ ২০০৭ সালে তার তথ্যচিত্র “Encounters at the End of the World” নির্মাণের সময় অ্যান্টার্কটিকায় এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। সেখানে একটি আদেলি পেঙ্গুইন তার বিশাল দল ছেড়ে একাকী হাঁটতে শুরু করে। না, সে পথ ভুলে নয়; বরং অবিশ্বাস্য এক উদাসীনতায় সে হেঁটে যাচ্ছিল। কোথায়? কেউ জানে না। সে নিজেও কি জানত? হার্জগ তাকে বর্ণনা করেছেন ‘নিহিলিস্ট’ বা শূন্যতাবাদী হিসেবে। বলাই বাহুল্য, সেই পেঙ্গুইনের সাথে নিৎশের দর্শনের পরিচয় ঘটার কারণ ছিল না, কিন্তু তার আচরণে সেই অস্তিত্ববাদেরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল।

জীববিজ্ঞানীরা একে মূলত বলেন “Disoriented Penguin”। সাধারণত পেঙ্গুইনরা সূর্যের অবস্থান এবং পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে সাগরের দিকে খাবারের সন্ধানে যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে স্নায়বিক ত্রুটি বা জিনগত বিভ্রান্তির কারণে তারা দিক হারিয়ে ফেলে। তবে হার্জগের ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই পেঙ্গুইনটি লক্ষ্যহীন ছিল না; বরং সে সম্পূর্ণ এক ভুল পথে ছিল ভীষণ স্থির এবং সংকল্পবদ্ধ। যেন এক অজানা জেদ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।পেঙ্গুইনটি সব পিছুটান ফেলে একাকী চলেছে এক অনিশ্চিত পথে। একাকীত্বের ভয়ংকর পরিণতি এবং নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তার এই যাত্রা থামেনি। হার্জগ এই দৃশ্যটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘অ্যানথ্রোপোমোরফিজম’ বা প্রাণীর মধ্যে মানুষের বৈশিষ্ট্য আরোপের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি গবেষক গ্যারি মিলারকে প্রশ্ন করেছিলেন: “Is there such a thing as insanity among penguins?” অর্থাৎ, পেঙ্গুইনদের মধ্যেও কি পাগলামি বলে কিছু আছে? হার্জগ আসলে সেই পাখির মধ্য দিয়ে মানুষের একাকীত্ব আর অস্তিত্বের অর্থহীনতাকেই স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন।

আমি অবশ্য হার্জগের চেয়ে খানিকটা ভিন্নপথে হাঁটতে চাই—কিছুটা কল্পনা আর আশার আলো মিশিয়ে। হয়তো ওই দূরের পাহাড়ের পেছনে, যেদিকটায় সে যাচ্ছিল, সেখানে সে এমন কিছু শান্তি দেখেছিল যা অন্যদের চোখে পড়েনি। যেখানটা সবার কাছে শূন্য বা আত্মহননের শামিল মনে হচ্ছিল, সেই জায়গাটায় হয়তো সে একাকীত্বের অনাস্বাদিত আনন্দ খুঁজে পেয়েছিল। হয়তো কোনো গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, বরং এই নিজস্ব পথে একাকী হেঁটে চলাটাই ছিল তার জীবনের একমাত্র সার্থকতা।

গবেষক গ্যারি মিলার পেঙ্গুইনটিকে বাধা দেননি। এর পেছনে কাজ করে ‘অ্যান্টার্কটিক ট্রিটি’র কঠোর নিয়ম। নিয়ম অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক আচরণে মানুষ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি যদি দেখা যায় কোনো প্রাণী নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে, তবুও তাকে ফিরিয়ে আনা আইনত নিষিদ্ধ। এটি প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর কিন্তু শাশ্বত নিয়ম। তবে মানুষের জন্য বিষয়টি ভিন্ন। মানুষকে বিপথে যেতে দেখলে সমাজ বা রাষ্ট্র আটকাতে চায়; তাকে নিয়ম মেনে সংঘবদ্ধ ও ছকবাঁধা পথে চলতে বাধ্য করা হয়।

কিন্তু তবুও অনেক মানুষ হার্জগের সেই পেঙ্গুইন হয়ে ওঠে। তারা আরোপিত জীবনের সব কৃত্রিম অর্থকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। আলবেয়ার কামুর সিজিফাস যেমন অর্থহীন পাথর ঠেলার কাজটির মধ্যেই একঘেয়েমিকে জয় করে বিদ্রোহ আর সুখ খুঁজে নিয়েছিল, মানুষও তেমনি কখনও কখনও বিদ্রোহ করে। পেঙ্গুইনটি যেমন অনিশ্চিত জেনেও পাহাড়ের দিকে পাড়ি দিয়েছিল, তেমনি কিছু মানুষও প্রথাগত ভিড় থেকে দলছুট হয়ে ছুটে চলে নিজস্ব গহীনে।

তবে এই বিচ্যুতিকে গৌরবান্বিত করা আমার লক্ষ্য নয়।
আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ‘বার্ণআউট সিনড্রোম’-এর পরিত্রাণের উপায় খোঁজ করা। বর্তমান জীবনের যান্ত্রিকতা আর সফলতার একঘেয়েমি আমাদের মানসিকভাবে সেই দলছুট পেঙ্গুইনটির মতো করে তুলছে। যখন দেখা যায় জীবনের সব গন্তব্য সমাজ কর্তৃক আগে থেকেই নির্ধারিত, তখন আমাদের ভেতর এক তীব্র শূন্যতা তৈরি হয়। সফলতার নির্দিষ্ট কাঠামোতে মানিয়ে নিতে না পেরে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তখনই হার্জগের সেই পেঙ্গুইনের মতো আমাদের মন চায় সব ছেড়ে অজানায় হাঁটতে।

জীবনের এই বৈচিত্র্যহীনতা থেকে বাঁচার উপায় কী? হয়তো উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই। শৈশবে শিখে আসা গন্তব্যের পেছনে সর্বস্ব উজাড় করে না দিয়ে, যদি আমরা পথে চলতে থাকার অভিজ্ঞতাকেই আপন করে নিতে শিখি, তবেই হয়তো মুক্তি। গন্তব্যের উন্মাদনা ছেড়ে যাত্রাপথের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করতে পারলে আমরা আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হব না। তবেই হয়তো আমরা সকলে হার্জগের সেই নিহিলিস্ট পেঙ্গুইনে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা পাব।

/কিফায়াত উল হক

শেয়ার করুন -